আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের একটি ফোনালাপের রেকর্ড উপস্থাপন করেছে প্রসিকিউশন। তাদের দাবি, ২০২৪ সালের ১১ জুলাই ওবায়দুল কাদের সরাসরি ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনকে ফোন করে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার নির্দেশ দেন।
প্রসিকিউটর জানান, কল রেকর্ডে শিক্ষার্থীদের কর্মসূচির কথা শুনে ওবায়দুল কাদেরকে বলতে শোনা যায়, ‘তোমরা কিছু করো না কেন? মারো না কেন ওদের? চড়াও হতে দাও কেন ওদের?’
জবাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি সাদ্দাম হোসেন তাদের ‘নিষেধ করা হয়েছে’ জানালে, ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘তোমরা বললা আজকে থেকে হালকা হয়ে যাবে সব। কই হালকা হইল? জমায়েত মানে এখানে জামায়াত আর বিএনপি যোগ হইছে।’
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেলে এটি প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের দাবি, এটি তৎকালীন সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের মধ্যকার কথোপকথন।
আদালতে উপস্থাপিত অডিও রেকর্ডে শোনা যায়, সাদ্দাম হোসেন তৎকালীন সেতুমন্ত্রীকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কর্মসূচি, জমায়েত ও সংবাদ সম্মেলনের বিষয়ে অবহিত করছেন।
তখন সাদ্দাম বলেন, ‘রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার নির্দেশ’ পেলে তারা সেটি করতে পারবেন। তবে সেদিন শাহবাগের দিকে বা আন্দোলনকারীদের মুখোমুখি হতে তাদের পুলিশ ও ‘বিপ্লব দা’র পক্ষ থেকে বারবার নিষেধ করা হয়েছে।
শুনানি শেষে প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম সাংবাদিকদের বলেন, ২০২৪ সালের ১১ জুলাইয়ের ওই কথোপকথনের রেকর্ডটি সিআইডির তরফে ফরেনসিক করে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হয়েছে।
ভাষ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অধীনস্ত কাউকে ‘পিটাও না কেন ওদের, মারো না কেন, বাড়তে দাও কেন’— এই ধরনের নির্দেশ দেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে স্পষ্টত ‘উসকানি’ (ইনসাইটমেন্ট) দেওয়ার অপরাধ।
প্রসিকিউটর বলেন, ‘সামনে বলছেন প্রতিরোধ, কিন্তু ফোনে এবং কার্যকরভাবে উনারা আসলে প্রতিরোধ না, আক্রমণের কথাই বলেছেন।’
তিনি দাবি করেন, ২০২৪ সালের ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর 'রাজাকার' মন্তব্যের পর ওবায়দুল কাদেরের ‘উসকানিতেই’ ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ঢাকা মেডিকেলে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতার ওপর ‘সশস্ত্র’ হামলা চালায় ছাত্রলীগের কর্মীরা।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনেও ‘উসকানিদাতা’ হিসেবে ওবায়দুল কাদেরের নাম আসার কথা বলেন এই প্রসিকিউটর।
গাজী এমএইচ তামিমের দাবি, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে হামলা ও হত্যাকাণ্ড কেবল একক নির্দেশ হয়নি, বরং এটি ছিল আওয়ামী লীগের একটি ‘সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত’।
যুক্তিতর্কে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামালের একটি ফোনালাপও তুলে ধরে প্রসিকিউশন। ট্রাইব্যুনালের প্রশ্নের জবাবে প্রসিকিউটর বলেন, ১৫ জুলাইয়ের ঘটনায় মাকসুদ কামাল ও জাফর ইকবালসহ বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে।
এ মামলায় ওবায়দুল কাদের ছাড়া পলাতক অন্য ছয় আসামি হলেন— আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, যুবলীগের সভাপতি শেখ ফজলে শামস পরশ, সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল, ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক ওয়ালি আসিফ ইনান।
গত ২ অগাস্ট তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৮ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর যুক্তিতর্ক শুরু হয়। আগামী রবিবার এ মামলার পরবর্তী যুক্তিতর্ক শুনানি হবে।