Image description

আজ ২১ জুলাই। ২০২৪ সালের এই দিনে একদিকে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা নিয়ে বহুল আলোচিত রায় দেন দেশের সর্বোচ্চ আদালত। অন্যদিকে আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নাহিদ ইসলামকে ঢাকার পূর্বাচল এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। আদালতের রায় ঘোষণার পরও সারা দেশে চলমান কোটা আন্দোলন ও পুলিশের হামলা-মামলা অব্যাহত ছিল।

জানা যায়, ১৯ জুলাই দিবাগত রাতে সাদা পোশাকধারী অজ্ঞাত ব্যক্তিরা নাহিদ ইসলামকে সবুজবাগ এলাকার একটি বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায়। ওইদিন প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নাহিদ যে ভবনে অবস্থান করছিলেন সেখানে রাত ১টা ১০ মিনিটের দিকে সাদাপোশাকে ২৫-৩০ লোক সেখানে আসেন। বাইরে ছিল আইন-শৃঙ্খলাবাহিনীর দুটি কালো ভ্যান ও দুটি গাড়ি। ভবনটির গেট ভেঙে তারা ভেতরে ঢোকেন। রাত আড়াইটার দিকে ভবন থেকে একজনকে তুলে নিয়ে গাড়িতে করে চলে যান তারা।

গুম হওয়ার দুদিন পর ২১ জুলাই গভীর রাতে তাকে রাজধানী ঢাকার অদূরে পূর্বাচল এলাকায় চোখ বাঁধা ও হাত-পা মোড়ানো অবস্থায় ফেলে যাওয়া হয়। উদ্ধারের পর তার শরীরে নির্যাতনের তীব্র চিহ্ন ও আঘাতের দাগ ছিল। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। 

নাহিদ ইসলাম বলেন, চোখ বেঁধে তাকে একটি অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল এবং জ্ঞান হারানোর আগ পর্যন্ত তার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়।

এদিন (২১ জুলাই) সাবেক প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বাধীন সাত সদস্যের আপিল বেঞ্চ সরকারি চাকরিতে কোটা নিয়ে হাইকোর্টের রায় বাতিল করে নতুন কোটা কাঠামো নির্ধারণ করেন। রায়ে সরকারি চাকরির ৯৩ শতাংশ পদ মেধার ভিত্তিতে, ৫ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনার সন্তানদের জন্য, ১ শতাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য এবং ১ শতাংশ প্রতিবন্ধী ও তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তিদের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে সরকারকে এ বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির নির্দেশ দেন আদালত।

রায়ে আদালত শিক্ষার্থীদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানালেও দেশের বিভিন্ন স্থানে পুলিশি হামলা-মামলা থামেনি। ওই দিন ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ ও আওয়ামী লীগ বাহিনীর গুলি ও হামলায় অন্তত ১৯ জন নিহত হন। পাশাপাশি বিএনপি, জামায়াতসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী এবং আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তার ও মামলা চলতে থাকে।

কোটা নিয়ে আদালতের রায়ের পর আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রীরা বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান হয়েছে। এবার সরকার সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, কোটা বিরোধী আন্দোলনকে জামায়াত, বিএনপি, ছাত্রশিবির ও ছাত্রদলের একটি কুচক্রী মহল ধ্বংসাত্মক পথে পরিচালিত করছে।

এদিকে ইন্টারনেট বন্ধ থাকলেও ক্ষুদে বার্তার মাধ্যমে সাংবাদিকদের কাছে বিবৃতি পাঠান আন্দোলনের ৫৬ জন সমন্বয়ক। সেখানে তিন শতাধিক ছাত্র-জনতাকে হত্যার অভিযোগ তুলে তারা বলেন, শুধু আদালতের রায়ের মাধ্যমে সরকার হত্যার দায় এড়াতে পারে না।
 
এদিন বিকেলে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে দেশের চলমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন বিদেশি কূটনীতিকরা।

এদিন আন্দোলনের তৎকালীন সমন্বয়ক হাসনাত আবদুল্লাহ সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ইন্টারনেট চালু, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আবাসিক হল খুলে দেওয়া, সমন্বয়কদের নিরাপত্তা নিশ্চিত এবং কারফিউ প্রত্যাহারের দাবি জানান। দাবি পূরণ না হলে নতুন কর্মসূচি ঘোষণারও হুঁশিয়ারি দেন।
 
একদিকে আদালতের রায়ে ৯৩ শতাংশ মেধাভিত্তিক নিয়োগের ঘোষণা, অন্যদিকে রাজপথে ছাত্র-জনতার রক্তঝরা আন্দোলন। ফলে আন্দোলনকারীদের কাছে আদালতের রায়ের চেয়ে রাজপথের লড়াইটাই বেশি গুরুত্ব পায়। সেই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় বহু মানুষের প্রাণের বিনিময়ে সামনে আসে গণতান্ত্রিক অধিকার ও বাকস্বাধীনতার দাবির নতুন অধ্যায়। ৫ আগস্টে পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে যান তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।