টুডে রিপোর্ট
জাতীয়তাবাদী যুবদলের সদ্য ঘোষিত কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে সমালোচনা ও বিতর্ক থামছেই না। গত রোববার বিকেলে সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতাদের জরুরি সভায় হট্টগোলের ঘটনা ঘটেছে। তাছাড়া সদ্যঘোষিত নির্বাহী কমিটিতে পদ পাওয়া প্রায় অর্ধশতাধিক নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন না, বিভিন্ন খুনের মামলায় দাগী আসামি, বিশেষ নেতার নিকটাত্মীয়, গার্মেন্ট ব্যবসায়ী এমন ব্যক্তিদেরকে কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদায়ন করা হয়েছে। যা নিয়ে দলের ভেতরে এবং বাইরে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে তৃণমূলে ব্যাপক ক্ষোভ ও সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে বিগত দিনে রাজপথে লাগাতার কর্মসূচি পালন করেছেন এমন নেতারা বঞ্চিত হওয়ায় এই ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে হত রোববার যুবদলের কেন্দ্রীয় জরুরি সভায় ব্যাপক হট্টগোল ও সভা পণ্ড হয়ে যায়। কেননা, যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়ন নিজেদের একনিষ্ঠ অনুসারীদেরই কেবল কেন্দ্রীয় কমিটিতে পদায়ন করেছেন। ফলে পদবঞ্চিত নেতারা কয়েকদিন ধরে মানববন্ধন করে আসছেন। কয়েকদিন আগে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সঙ্গেও দেখা করে নিজেদের আকুতি তুলে ধরেছেন। তারা অবিলম্বে যুবদলের মেয়াদোত্তীর্ণ ও বিতর্কিত কেন্দ্রীয় কমিটি বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আহ্বান জানান।
জানা গেছে, ২০২৪ সালে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। তবে প্রায় ২৩ মাস পর গত ৪ জুন ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। যুবদলের একাধিক নেতার অভিযোগ, অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় ধরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়া বর্তমান কমিটির সাংগঠনিক ব্যর্থতার প্রতিফলন।
জরুরি সভায় ব্যাপক হট্টগোল
জানা যায়, গত রোববার (৫ জুলাই) নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক জরুরি সভা আহ্বান করে যুবদল। সেখানে নিষ্ক্রিয় ও বিতর্কিতদের নিয়ে সংবাদ প্রকাশের বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে তর্ক-বির্তকে জড়িয়ে পড়েন সংগঠনটির সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন। পরে স্থগিত করা হয় জরুরি সভা। বৈঠকে অংশ নেওয়া একাধিক নেতা জানান, সদ্য ঘোষিত ১৫১ সদস্যের কমিটিতে বিতর্কিতদের দায় একজন আরেকজনের ওপর চাপানোর চেষ্টা করলে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে। এ নিয়ে চরম হট্টগোল সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্না ও সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়নও নিজেদের মধ্যে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন। তাদের কথাবার্তা ‘তুই-তুকারির’ পর্যায়ে চলে যায়।
যুবদলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতার মতে- নতুন কমিটির বিতর্কিত ও দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনে নিষ্ক্রিয় থাকা সহসভাপতি ফিরোজ আবদুল্লাহর অতীত রাজনৈতিক পরিচয় জানতে চান যুবদলের সভাপতি মুন্না। এসময় তিনি আরও বলেন, অনেক ত্যাগীদের বাইরে রেখে শুধু যুবদলের সেক্রেটারির লোক হওয়ায় তোমোদেরকে পদ দেওয়া হয়েছে। এ থেকে ঘটনার সূত্রপাত। পাল্টা সাধারণ সম্পাদক নয়নও সভাপতিকে বলেন, আপনিও তো কমিটিতে অনেক নাম দিয়েছেন। যাদেরকে আমি চিনি না। তর্কের এক পর্যায়ে যুবদল সভাপতি পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার ঘোষণা দেন। যুবদল অফিসের অভ্যন্তরে সংঘটিত অনাকাঙ্খিত ঘটনা মূহুর্তের মধ্যে পার্টি অফিসে ছড়িয়ে পড়ে। সাংগঠনিক টিমের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন অনেক কেন্দ্রীয় নেতা বাইরে থেকে ঘটনা অবলোকন করেন এবং প্রতিবেদককে উক্ত ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন।
সূত্র জানায়, কমিটির মান ও মর্যাদা নষ্ট হওয়ার জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক গ্রুপ একে-অপরকে দোষারোপ করতে থাকে। এ সময় মাহমুদুস সালেহীন রাজনীতি না করেও পদ পাওয়ার বিষয়ে বেশ কয়েকজন মন্তব্য করেন। সবমিলিয়ে পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হলে মিটিং স্থগিত করা হয়।
১৫১ সদস্যের অর্ধশতাধিকই বিতর্কিত
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, যুবদলের ১৫১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটির প্রায় অর্ধশতাধিক নেতার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। কারও কারও বিরুদ্ধে খুনের মামলার আসামি, আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় থাকাসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের মধ্যে রয়েছেন ১নং সহসভাপতি জিয়াউর রহমান জিয়া। তিনি যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত আসামী। তার নেতৃত্বে বশির, জিতু, পাতলা শামীম গং ধানমন্ডি থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওয়ারেছ আহমেদকে ১৯৯৮ সালের ৬ অক্টোবর অপহরণ করে পুরান ঢাকার কোর্ট কাচারির বিপরীতে হোটেল সার্কে ফ্যানের সাথে ঝুলিয়ে পিটিয়ে হত্যা করে লাশ আশুলিয়ায় ফেলে দেওয়া হয়্। ৮ অক্টোবর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ, ১১অক্টোবর হেলালের বড় ভাই খন্দকার বেলাল বাদী হয়ে ধানমন্ডি থানায় মামলা দায়ের করেন। ধানমিন্ড থানায় মামলা নং- ৩৩ (১০) ৯৮। ২০০৭ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর জিয়াউর রহমান জিয়াসহ ৬জনকে আদালত যাবজ্জীবন কারাদন্ড প্রদান করেন। ঢাকা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ মামলা নং- ৯/২০০৭ এবং তাছাড়া দীর্ঘ সময় পলাতক থাকার পর পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জিয়াউর রহমান প্রায় আট বছর জেল খেটে জামিনে বের হয়। এ সংক্রান্ত কাগজপত্র প্রতিবেদকের কাছে রয়েছে। এমন একজন ছাত্রদল নেতা হত্যাকারীকে যুবদলের ১নং সহসভাপতি করায় নেতাকর্মীরা হতাশ।
উল্লেখ্য যে, জিয়াউর রহমান জিয়ার ছোট ভাইয়ের ভায়রা ভাই হলেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন। সেই হিসেবে রুমনের বেয়াই হন জিয়া। তাছাড়া শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়নের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় তাকে ৪ নং সহসভাপতি থেকে ১নং সহসভাপতি করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ ষড়যন্ত্রমূলক বলে দাবি করেন জিয়াউর রহমান জিয়া।
সহ-সভাপতিদের মধ্যে সাইদুর রহমান ১/১১ হতে রাজনীতিতে অনুপস্থিত। তিনি যুবদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাহউদ্দিন টুকুর মাইমেন হিসেবে গত কমিটিতে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হলেও কোনো আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেননি। অপর সহ-সভাপতি সাব্বির আহমেদ দিপু গত কমিটিতে (টুকু-মুন্না) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হলেও কর্মসূচিতে না থেকে আন্দোলনকারীদের ব্যঙ্গ করে কথা বলতেন। তিনি দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়েও আজেবাজে কথা বলতেন। তবে তিনি বর্তমান সভাপতি আবুদল মোনায়েম মুন্নার অর্থের যোগানদাতা হিসেবেই পরিচিতি। আরেক সহ-সভাপতি রফিক আহমেদ ডলার ২০০৭ সালে বিদেশে পাড়ি দেন। সাধারণ সম্পাদক নয়নের বন্ধু হওয়ায় ২০২২ সালে দেশে এসে গত কমিটিতে সদস্য পদ লাভ করেন। কিন্তু আন্দোলন সংগ্রামে তার ন্যুনতম অংশগ্রহণ ছিলোনা বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়াও তিনি একজন আদম ব্যবসায়ী।
এছাড়া সহ-সভাপতি সাইদ ইকবাল মাহমুদ টিটো ২০০৭ সালে ১/১১’র সময় ছাত্রদলের সংস্কারপন্থীদের গ্যাংলিডার ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রদল নেতাকে মধুর ক্যান্টিন ও ক্যাম্পাসে টিটোর নেতৃত্বে পিটিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া ও বর্তমান প্রধামন্ত্রী তারেক রহমান গ্রেফতার হওয়ার দিন তার নেতৃত্বে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। টিটোর এই কর্মকান্ডের সহযোগী ছিলেন আরেক সহ-সভাপতি ফেরদৌস আহমেদ মুন্না। এমনকি তাদের নেতৃত্বে সংস্কারপন্থীরা নয়াপল্টনে পার্টি অফিস তালা ভেঙে দখল করা হয়েছিল। সে ভিডিও এখনো অনেকের কাছে রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে মাদকসেবনের অভিযোগও রয়েছে। যে কারণে টিটো এবং মুন্না প্রায় এক যুগের বেশি সময় কোনো পদে ছিলেন না। বরং পদ পেয়েও নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অবশ্য টিটো বলেন, যারা অভিযোগ তুলছেন তারাই এর জবাব দিতে পারবেন। কারণ আমি তো এসবের ধারে কাছেও নেই। তাই উত্তর দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি না।
সহ-সভাপতি ফিরোজ আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজির অভিযোগ রয়েছে। তার রাজনৈতিক কোনো ব্যকগ্রাউন্ড নেই। গত কমিটিতে থেকেও কোনো আন্দালনে তিনি অংশগ্রহণ করেননি। সাধারণ সম্পাদকের ব্যাক্তিগত ক্যাশিয়ার হিসেবেও তিনি সংগঠনে পরিচিত। আরেক সহ-সভাপতি মাহমুদুস সালেহীন বিগত টুকু-মুন্না কমিটির সদস্য পদ থেকে সহ-সভাপতি হয়েছেন। রাজনীতিতে তাকে কেউ ভালোভাবে চেনেন না। আন্দোলন সংগ্রামেও খুব বেশি দেখা যায়নি। নিয়ম লঙ্ঘন করে তাকে সহ-সভাপতি করা হয়েছে। অপর সহসভাপতি আতিকুর রহমান আতিকও একজন আদম ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। গত একযুগ আন্দোলন সংগ্রামে তার কোনো অংশগ্রহণও ছিলোনা। এমনকি তার ভায়রা ভাই মালয়েশিয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি। বিদেশে লোক নেওয়ার নাম করে শত শত মানুষের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বায়রা অফিস দখল করে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আদম ব্যবসায়ীদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ৫ আগস্টের পর গাড়ি ও ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এসব বিষয়ে আতিক বলেন, তার বিরুদ্ধে মনগড়া অভিযোগ দাঁড় করানো হচ্ছে।
আরেক সহ-সভাপতি তরিকুল ইসলাম টিটু ২০০৭ সালে ১/১১ এর সময় ছাত্রদলের সংস্কার পন্থিদের গ্যাংলিডার টিটোর অন্যতম সহযোগী ছিলেন। তিনিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্রদল নেতাকে ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করার নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধেও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান গ্রেফতার হওয়ার দিন মিষ্টি বিতরণের অভিযোগ রয়েছে। তিনিও প্রায় মাদকসেবন করেন বলে জানা গেছে।
যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে এম কামরুজ্জামান প্রায় দশ বছর নিষ্ক্রিয় ছিলেন। গত কমিটিতে সহসাধারণ সম্পাদকের মতো পদে থাকা সত্বেও একদিনের জন্যও কোন আন্দোলন সংগ্রামে তাকে পাওয়া যায়নি। বর্তমান সভাপতিকে দামি মোবাইল গিফট দিয়ে পদায়িত হয়েছেন। অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মনিরুল ইসলাম সোহাগ গত ১৭ বছর রাজনীতিতে অনুপস্থিত। শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ অনুসারী হওয়ায় পদায়িত হয়েছেন। এটা নিয়ে সবচেয়ে বেশি সমালোচনা হচ্ছে। এছাড়াও আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবু আতিক আল হাসান মিন্টুর বিরুদ্ধেও সংস্কারপন্থার অভিযোগ রয়েছে। বিগত আন্দোলন সংগ্রামে তাকে খুব বেশি দেখা যায়নি বলে জানা গেছে।
অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাইনুদ্দিন রুবেলের বিরুদ্ধে নিজ সংগঠনের নেতাকের খুন করার অভিযোগ রয়েছে। তার নেতৃত্বে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক লিটন চৌধুরীকে ২০০৫ সালের ১৪ এপ্রিল হত্যা করা হয়। রুবেল এ মামলার ১নং আসামি। তাকে দল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার হয়েছিল। সেই বহিষ্কার আদেশ এখনো বহাল আছে। দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর রুবেল তার প্রকৃত নাম মইন আলদিন বিন নাসির রুবেল (কালা রুবেল) পরিবর্তন করে মাইনুদ্দিন রুবেল নাম ধারণ করে ঢাকায় এসে সাধারণ সম্পাদক নূরুল ইসলাম নয়নের সাথে রাজনীতি শুরু করে এবং গত কমিটিতে ক্রীড়া সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়ে বর্তমানে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন। দলের বহিষ্কারাদেশ বহাল থাকাবস্থায় একজন খুনিকে যুগ্ম সম্পাদকের মতো গুরুত্বপূর্ন পদ দেওয়ায় নেতাকর্মীরা মানতে পারছেন না।
যুগ্ম সম্পাদক আজহারুল হক মিলন হলেন যুবদলের সভাপতি আবদুল মোনায়েম মুন্নার বন্ধু। অতীতে আন্দোলন বা কর্মসূচিতে কখনো কেউ দেখা যায়নি।
আরেক যুগ্ম সাধারন সম্পাদক গোলাম মোস্তফা চলেন এসি রুমে। তার স্টাইলই আলাদা। তার বড় সহযোগী হলেন নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের এমপি নজরুল ইসলাম আজাদ। তার কাছ থেকে যুবদলের বর্তমান সভাপতি মোনায়েম মুন্না বিভিন্ন অজুহাতে প্রচুর অর্থ গ্রহণ করেন। সেই সুবাদে গোলাম মোস্তফাকে যুগ্ম সম্পাদকের পদ দেওয়া হয়েছে। আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আশরাফুর রহমান বাবুর বাড়ি চাঁদপুরের মতলবে। তার বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপকর্মের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। কোনো আন্দোলন সংগ্রামে তাকে দেখা যায়নি। আরেকজন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামসুজ্জোহা সুমন মাগুরার আওয়ামী এমপি সাইফুজ্জামান শেখরের ব্যবসায়িক পার্টনার। গত ১৭ বছর তার সাথে ব্যাবসা করেছেন। ২০২৩ সালের ২৮ শে অক্টোবর থেকে ৭ জানুয়ারি পর্যন্ত নেতাকর্মীরা যখন আন্দোলনের মাঠে তখন তিনি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড বিনোদনে মত্ত ছিল। তখন তিনি সেসব দেশের ছবি ফেইসবুকে পোস্ট করেছেন এবং নিকট বন্ধুদের আন্দোলনে না নামার পরামর্শ দিয়ে বলেছে এই আন্দোলন করে কিছু হবেনা। তার একটা কমন ডায়ালগ হচ্ছে- ‘টাকা থাকলে এই দলে পদ পাওয়া যায়, রাজপথে থাকা লাগেনা। তার পাসপোর্ট অনুসন্ধান করলে সত্যতা পাওয়া যাবে।
এছাড়া যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুল ওয়াহাব গত ১০ বছর রাজনীতিতে অনেকটাই নিষ্ক্রিয় ছিলেন। অপর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সাজেদুল ইসলাম ২০২৩ সালের ২৮ অক্টোবর ঢাকায় মহাসমাবেশ বাদ দিয়ে বিদেশে অবস্থান করেন। সেসময় সংগঠন থেকে তাকে শোকজ করা হয়েছিল। তারপরও তাকে পদায়ন করা হয়েছে শুধুমাত্র সভাপতির সাথে ঘনিষ্ঠতার কারণে। এমনকি তিনি গাজীপুরে মদ ও ডিস্কো বার পরিচালনা করেন। দফতর সম্পাদক মিনহাজুল ইসলাম ভুঁইয়ার বিরুদ্ধে গুপ্ত সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন তার ট্রাঙ্কে শিবিরের কাগজপত্র পাওয়া গেছিল। তারপরও তখনকার সময়ে নোয়াখালী বেইজ রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করার জন্য তাকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে জায়েজ করা হয়। তাছাড়া তিনি কখনোই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মাজার কিংবা শহীদ মিনারে ফুল দিতে যান না। দলীয় অফিসেও খুব কম আসেন বরং নিজের অফিসে থেকে টুকটাক সংগঠনের কাজ করেন বলে জানা গেছে। তবে মিনহাজ তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আগের মতো দলীয় কাজ না থাকায় তিনি পার্টি অফিসে কম যান।
সহ-সাধারণ সম্পাদকদের মধ্যে এন এম আবদুল্লাহ উজ্বল একজন দর্জি ব্যবসায়ী। তাকে কখনো আন্দোলন সংগ্রামে দেখা যায়নি। কেবল সভাপতি মুন্নার ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পদায়িত। মাইনুদ্দিন খোকন ও মামুন হোসেন ভুঁইয়া গত কমিটিতে থাকলেও কোনো কর্মসূচিতে থাকতেন না। রাহাদুল আলম খান গত দশ বছর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। বরুং একটা রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার হিসেবে চাকুরি করেন। তার বিরুদ্ধেও মাদক সেবনের অভিযোগ রয়েছে। সহ-সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান পলাশ টোকাই হিসেবে পরিচিত। তিনিও কোন আন্দোলন সংগ্রামে ছিলেন না। যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নয়নের ঘনিষ্ঠ অনুসারী বলেই পদ পেয়েছেন।
সহ-সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট মেহেদী হাসান জুয়েল ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজি-ডাকাতি করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। ঢাকার শান্তিনগর পরশুরাম ভবনে ডাকাতি করতে যাওয়ার ভিডিও রয়েছে। তার সঙ্গে থাকা কয়েকজন ধরা পড়ার খবর বেরিয়েছিল। চাঁদপুরের বালু সেলিম (মৃত) এর কাকরাইলের অফিস লুট করে সিনেমা তৈরির ক্যামেরা, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও ১৫ কোটি টাকা লুট করে। যা আল জাজিরায় নিউজ হয়েছিল।
এছাড়াও সহ-সাধারণ সম্পাদক সাহাবুদ্দিন মুন্না গত ১৫ বছর আন্দোলন সংগ্রামে সক্রিয় ছিলেন না। আর আলমগীর কবির সেলিম ও মজিবুর রহমান ভুঁইয়া সবুজও সক্রিয় ছিলেন না। সাধারণ সম্পাদকের বন্ধু হিসেবে পদ পেয়েছেন। মাসুদুল হক রাজনীতিতে অপরিচিত। তিনি সভাপতি মুন্নার ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে পদ পেয়েছেন।
সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আরিফুর রহমান সোহেল গত সাত বছর ধরে প্যাভিলিয়ন গ্রুপ (গার্মেন্টস ফ্যাক্টরী) ফুল টাইম চাকুরি করছেন। যুবদলের রাজনীতিতে তার কোনো ভুমিকা নেই। সাধারণ সম্পাদক নয়নের ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় পদ পেয়েছেন। সহ-ক্রীড়া সম্পাদক মেজবাহ উদ্দিন মেজুর সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। তবে সভাপতির ভাষ্য অনুযায়ী যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর অনুরোধে তাকে পদ দেওয়া হয়েছে। সহ-ত্রাণ ও পুনর্বাসন সম্পাদক আবদুল কুদ্দুসও রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয়। কেবল ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনুর ব্যক্তিগত সেক্রেটারি হওয়ায় তাকে পদ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদকদের মধ্যে ডা. গালিবও প্রায় নিষ্ক্রিয়। শুধুমাত্র সাধারণ সম্পাদক নয়নের অনুসারী হিসেবে পদায়িত। অপরজন ডা. বেলাল নাজিম সভাপতি মুন্নার অনুসারী হিসেবে পদায়িত। আর সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. মাহমুদুল হাসান খান সুমনকে দলের কেউ চেনেনা। তিনি খুবই অপরিচিত। একই অবস্থায় সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক ডা. আল মামুন হাসান খান এমিল এর।
পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক হেদায়েত হোসেন ভুঁইয়া ছিলেন তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ডের লাইনম্যান। ঘটনাক্রমে সভাপতি মুন্নার সঙ্গে দেখা হওয়ার সুবাদে বাসার ব্যাক্তিগত কাজে তাকে নিয়োগ করা হয়। অপেক্ষাকৃত জুনিয়র ও অর্বাচীন ব্যাক্তিকে পাঠাগার সম্পাদক করায় নোয়াখালী জেলা নেতৃবৃন্দ বিব্রত ও বিস্মিত হয়েছেন। সদস্য (সহ-সাধারণ সম্পাদক) আমিনুল ইসলাম খান
পূর্বে কোনো রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলনা। তাকে কেউ তাকে ঠিকভাবে চেনেও না। তিনি সাধারণ সম্পাদকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পদায়িত।
সহ-সাধারণ সম্পাদক পদমর্যাদায় (সদস্য) মহসীন বিশ্বাস, জহিরুল ইসলাম বিপ্লব, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাইনুল ইসলাম, খন্দকার রিয়াজ, রাশেদুল ইসলাম রিপনও বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে নিষ্ক্রিয় ছিলেন। প্রচার সম্পাদক আল মেহেদী তালুকদার গত ৭-৮ বছর রাজনীতির বাইরে ছিলেন। তার বিরুদ্ধেও মাদকসেবনের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়াও সদস্য-আবদুল্লাহ আল কাফি শাহেদ, নাজিম উদ্দিন মিঠু, মাহমুদুল করিম সজল সালাহউদ্দিন আহমেদ শাহীন, এমরান হোসেন শাহিন ও ফখরুল বিন খালেককে যুবদলের কোনো পর্যায়ের নেতাকর্মীরা চেনে না। তাদের মধ্যে নাজিম উদ্দিন মিঠু ছাত্রলীগের কর্মী ছিলেন। তার বিরুদ্ধে মাদকসেবনের অভিযোগ রয়েছে। এমরান হোসেন শাহিন কারওয়ানবাজারের একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে (ফোন, ফ্যাক্স ও বিকাশের দোকান) চাকুরি করেন। সভাপতির মুন্নার একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে পদ পেয়েছেন। ফখরুল বিন খালেকের পুরো পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত।
এসব বিষয়ে যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোনায়েম মুন্না বলেন, এতোবড় একটি সংগঠনের সবাই তো একই মানসিকতার হবে না। এখানে বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন রকমের লোকজন রয়েছেন। আমরা চেষ্টা করেছি একটি সুন্দর ও কর্মক্ষম কমিটি গঠন করতে। আমাদের দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবকিছু দেখেই তো কমিটির অনুমোদন দিয়েছেন। দুই একজন ব্যক্তি বিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে। তবে যেভাবে অভিযোগ তোলা হচ্ছে তা সত্য নয়। অনেকাংশেই ঢালাও অভিযোগ তোলা হচ্ছে।