রাজধানীর দুটিসহ ৯ সিটি করপোরেশনে মেয়রপ্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দলের নির্দেশনা পেয়ে মনোনীত প্রার্থীরা নিজ এলাকায় কার্যক্রম চালাচ্ছেন। দলীয় সূত্র জানায়, চলতি সপ্তাহে নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে চূড়ান্ত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করতে পারে জামায়াত।
সংসদে আইন পাসের কারণে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না। সম্প্রতি সংসদে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চলতি বর্ষা মৌসুমের পরই স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলে জানিয়েছেন। এক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর বা অক্টোবরে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
জামায়াতের দলীয় সূত্রে ৯ সিটি করপোরেশনে দলের চূড়ান্ত প্রার্থীর বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে স্ট্রিম। একই সূত্র জানায়, রাজশাহী, সিলেট, কুমিল্লা ও নবঘোষিত বগুড়া সিটি করপোরেশনে দলটি এখনো প্রার্থী চূড়ান্ত করতে পারেনি। এগুলোর বিষয়ে প্রস্তাবনা চলতি সপ্তাহে নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে না এলে, পরেরবার তোলা হবে।
চূড়ান্ত ৯ প্রার্থীর বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের স্ট্রিমকে বলেন, ‘স্থানীয়ভাবে ওনাদের ব্যাপারে প্রস্তাব এসেছে। আরও দুয়েকটি বাকি আছে, সেগুলো চূড়ান্ত হলে একসঙ্গে ঘোষণা করা হবে।’
কোন সিটিতে কে লড়বেন
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে সেলিম উদ্দিন, দক্ষিণে সাদিক কায়েম, চট্টগ্রামে শামসুজ্জামান হেলালী, বরিশালে মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, রংপুরে এটিএম আজম খান, খুলনায় মিয়া গোলাম পরওয়ার, ময়মনসিংহে কামরুল আহসান এমরুল, নারায়ণগঞ্জে আবদুল জব্বার ও গাজীপুরে হাফিজুর রহমানকে মেয়রপ্রার্থী করছে জামায়াত।
এদের মধ্যে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের বিষয় প্রকাশ্যে এসেছে। তিন প্রার্থীর নাম দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেছেন। চারজনসহ বাকিদের নাম কেন্দ্র থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে।
এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, চলতি সপ্তাহে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক থেকে মেয়রপ্রার্থী চূড়ান্ত করা হতে পারে। বগুড়াসহ ১৩ সিটি করপোরেশনের মধ্যে কয়েকটির প্রস্তাবনা এখনো পাওয়া যায়নি। দলের নির্বাচন বিভাগ কাজ করছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে আসা প্রস্তাব নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে। সেখানেই চূড়ান্ত হবে।
জামায়াতের নেতারা জানিয়েছেন, স্থানীয় জামায়াত, মহিলা সংগঠন, শ্রমিক সংগঠন, অন্য পেশাজীবী সংগঠন, ওয়ার্ড বা ইউনিয়ন সংগঠন থেকে লিখিত পরামর্শ নেওয়া হয় মেয়রপ্রার্থী নির্ধারণে। তাদের প্রস্তাব কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি নির্বাহী পরিষদের বৈঠকে উপস্থাপন করে।
একাধিক দলীয় সূত্র জানায়, নাম ঘোষণা না হলেও, এক ধরনের নিশ্চয়তা দিয়ে এলাকায় কাজ করতে সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাজ করতে বলেছে জামায়াত।
ঢাকা উত্তরে সেলিম, দক্ষিণে সাদিক
ঢাকা উত্তর সিটিতে মেয়রপ্রার্থী হিসেবে শুরুতে তিনজন থাকলেও, এগিয়ে গেছেন মহানগর উত্তরের আমির সেলিম উদ্দিন। সংসদ নির্বাচনে সিলেট-৬ আসনে ৮ হাজার ৩৪৮ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান তিনি। বর্তমানে জোরেসোরে সামাজিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন সেলিম উদ্দিন। পবিত্র ঈদুল আজহায় নগরবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে তাঁর নামে সাঁটানো পোস্টারে ছেয়ে আছে উত্তরের অলিগলি।
এখানে মেয়রপদে লড়ার সম্ভাবনা ছিল বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান ও ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে মাত্র ৪ হাজার ৩৯৯ ভোটে হেরে যাওয়া ডা. এসএম খালিদুজ্জামানের। আতিকুর ঢাকা-১১ আসনে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিলেও, জোটের স্বার্থে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে আসনটি ছেড়ে দেন। এই দুই নেতার ভালো ভোট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, মহানগরে সেলিম উদ্দিন এগিয়ে গেছেন দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতায়। স্থানীয়দের প্রস্তাবেও তাঁকে চাওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক সাদিক কায়েমকে চূড়ান্ত করা হয়েছে। মহানগর দক্ষিণ জামায়াত ও অন্যান্য সহযোগী সংগঠন থেকে তাঁর নাম প্রস্তাব করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ছাত্রনেতা ও পরিচিত মুখ হিসেবে সাদিকের বিকল্প কাউকে উপযুক্ত ভাবছে না জামায়াত। তাছাড়া মহানগর দক্ষিণের আমির ও সেক্রেটারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁরা হলেন– দক্ষিণ অঞ্চলের পরিচালক সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ও দক্ষিণের সহকারী সেক্রেটারি কামাল হোসেন।
সম্প্রতি রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে দক্ষিণ জামায়াতের দায়িত্বশীলদের সম্মেলনে সাদিক কায়েমের নাম মেয়রপদে প্রথম প্রকাশ্যে উচ্চারিত হয়। পরে ছাত্রশিবির জানায়, সংগঠনে থাকাকালে কারও দলীয় প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। তবে শিবির থেকে বিদায় নেওয়ার পরে প্রার্থী হতে কোনো বাধা নেই।
মেয়রপদে নির্বাচনের বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার পরে জামায়াত বিভিন্ন সামাজিক কাজে সাদিক কায়েমকে সামনের সারিতে রাখছে। ঈদুল আজহা উপলক্ষে জুলাই শহীদ পরিবারে নগদ অর্থ, কুরবানির পশু বিতরণসহ মহানগর দক্ষিণের বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তিনি অংশ নিচ্ছেন।
চসিকে শামসুজ্জামান হেলালী
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে নগর জামায়াতের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর অধ্যক্ষ মুহাম্মদ শামসুজ্জামান হেলালীকে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। গত ২০ এপ্রিল দলের শুরা বৈঠকে তাঁকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয় বলে সূত্রের দাবি। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১০ আসনে হেলালী হেরে যান বিএনপি প্রার্থী সাঈদ আল নোমানের কাছে।
বরিশালে কেন্দ্রীয় নেতা হেলাল
দলের কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুয়াযযম হোসাইন হেলালকে বরিশালে প্রস্তুতি নিতে বলেছে জামায়াত। সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসনে দলের প্রার্থী ছিলেন তিনি। তবে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে পরে তিনি সরে দাঁড়ান।
এ ব্যাপারে মুয়াযযম হোসাইনকে পাওয়া যায়নি। তবে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানান, মুয়াযযম হোসাইনকে দল থেকে প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। সে মোতাবেক কাজ করছেন তিনি।
রংপুরে আজম খান
রংপুর সিটি করপোরেশনে মহানগর আমির এটিএম আজম খানকে চূড়ান্ত করেছে জামায়াত। আমির গত ১৫ মে রংপুরে গিয়ে এই ঘোষণা দেন। আজম খান গত সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ আসনে দলের মনোনয়ন পান। পরে ১১-দলীয় ঐক্যের সিদ্ধান্তে তাঁকে সরিয়ে ওই আসনে প্রার্থী করা হয় এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেনকে। শাপলা কলি প্রতীকে তিনি সংসদ সদস্য হয়েছেন।
ময়মনসিংহে এমরুল
ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনে মহানগর আমির কামরুল আহসান এমরুলের নাম চূড়ান্ত করা হতে পারে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। তবে তাঁর সঙ্গে জেলা আমির আব্দুল করিম ও মহানগর সেক্রেটারি শহীদুল্লাহ কায়সারের নামও আলোচনায় রয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে এমরুল ময়মনসিংহ-৪ আসনে দলের মনোনয়ন পেয়েছিলেন। তবে তিনি বিএনপি প্রার্থী আবু ওয়াহাব আকন্দের কাছে হেরে যান।
এমরুল স্ট্রিমকে বলেন, প্রার্থিতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। এক্ষেত্রে তৃণমূলের একটি মতামত কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। তার ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় জামায়াত চূড়ান্ত করবে। আশা করছি, শিগগির মেয়রপ্রার্থীদের নাম জানা যাবে।
খুলনায় সেক্রেটারি জেনারেল
খুলনা সিটিতে দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নাম চূড়ান্ত হয়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে মাত্র ২ হাজার ৭০২ ভোটের ব্যবধানে হেরে যান তিনি। খুলনা-৫ আসনের সাবেক এই সংসদ সদস্য সিটি নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছেন বলে জামায়াতের স্থানীয় নেতাকর্মীরাও জানিয়েছেন।
খুলনা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জুর সিটি নির্বাচনে বিএনপি দলীয় প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বর্তমানে সিটির এই প্রশাসককে হেভিওয়েট প্রার্থী ধরা হচ্ছে। তাঁর বিপরীতে মিয়া গোলাম পরওয়ারকে উপযুক্ত প্রার্থী বিবেচনা করছেন জামায়াতের নেতারা। ইতোমধ্যে তাঁর নাম প্রস্তাব করে কেন্দ্রে তালিকা পাঠানো হয়েছে।
শনিবার (২০ জুন) খুলনার সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১-দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশ রয়েছে। সেখানে জামায়াত আমির মেয়রপ্রার্থী হিসেবে গোলাম পরওয়ারের নাম ঘোষণা করতে পারেন বলে জানা গেছে।
নারায়ণগঞ্জে আবদুল জব্বার
শুক্রবার (১৯ জুন) নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে জামায়াতের কর্মী সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান মহানগর শাখার আমির আবদুল জব্বারকে মেয়রপ্রার্থী ঘোষণা করেন। যদিও তাঁকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনে প্রার্থী করা হতে পারে বলে আগেই তথ্য ছিল স্ট্রিমের কাছে।
গত সংসদ নির্বাচনে আবদুল জব্বার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থী হন। পরে কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিক এনসিপিকে আসনটি ছেড়ে দেওয়া হয়। জামায়াতের সমর্থন নিয়ে ওই আসনে জয়ী হন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব আবদুল্লাহ আল আমীন।
গাজীপুরে তুরস্কফেরত হাফিজ
গাজীপুর সিটিতে মুহাম্মদ হাফিজুর রহমানকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছে জামায়াত। গত ৬ মে টঙ্গীর তামিরুল মিল্লাত কামিল মাদ্রাসা অডিটোরিয়ামে কর্মী সম্মেলনে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করেন জামায়াতের সেক্রেটারি।
হাফিজুর রহমান তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতেন। একইসঙ্গে তিনি তুরস্ক জামায়াতের সেক্রেটারি। গত নির্বাচনের আগে আমিরের ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি দেশে ফেরেন। পরে গাজীপুর-৬ আসনে মনোনয়ন পান।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি। এরপর প্রথম দফায় গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর, দক্ষিণসহ ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেয় সরকার। পরে ১৪ মার্চ আরও পাঁচ সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। নিয়োগ পাওয়া ১১ প্রশাসকই বিএনপি নেতা। এর বাইরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে আদালতের আদেশে বিএনপি নেতা ডা. শাহাদাত হোসেন মেয়রের দায়িত্বে আছেন।