Image description

দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিবেদন আছে, যেগুলো প্রকাশের পর শুধু সংবাদজগতে নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কখনও সেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ক্ষমতাসীন সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী, কখনও বা নতুন সরকারের একজন আলোচিত প্রতিমন্ত্রী। আবার কখনও আলোচনার কেন্দ্রে থেকেছে প্রতিবেদন প্রকাশকারী সংবাদমাধ্যমটিও।

কানাডাভিত্তিক বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজকে ঘিরে এমন দুটি আলোচিত প্রতিবেদনের মধ্যে ব্যবধান প্রায় সাড়ে ছয় বছর। ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল ‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল’। আর চলতি বছরের ১৭ জুন প্রকাশিত হয়েছে ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’।

দুটি প্রতিবেদনের চরিত্র আলাদা, সময় আলাদা, সরকার আলাদা। কিন্তু একটি জায়গায় বিস্ময়কর মিল রয়েছে। দুই প্রতিবেদনের কেন্দ্রেই আছেন ক্ষমতাসীন সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক ব্যক্তি। একজন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। অন্যজন বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

আরও একটি মিল আছে। মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যে দুজনের নামই অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আলোচনায় আসে।

ওবায়দুল কাদের ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের সরকার গঠনের পর একপর্যায়ে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান। মন্ত্রী হওয়ার কয়েক পর মাস পরই তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক শুরু হয়। এর আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সেসব মামলা দলীয় বিবেচনায় বিতর্কিতভাবে পর্যায়ক্রমে বাতিল হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঘিরে সম্পদ, প্রভাব ও রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের নানা অভিযোগও সামনে আসে।

অন্যদিকে মীর শাহে আলমের নামও প্রতিমন্ত্রী হওয়ার চারমাসের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা-সমালোচনায় এসেছে। প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, ঠিকাদারি বণ্টন এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগে জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন তিনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন মন্তব্যও শোনা যাচ্ছে যে, সরকারের চার মাসের মাথায় যেভাবে তার নাম বারবার আলোচনায় আসছে, তা বিএনপির জন্যও অস্বস্তিকর হয়ে উঠতে পারে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত ‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল’ প্রতিবেদনটি মূলত ওবায়দুল কাদেরের জীবনযাপন ও সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তোলে। প্রতিবেদনে নেত্র নিউজ দাবি করে, একজন হুইসেলব্লোয়ার তাদের কাছে অভিযোগ করেছেন যে কাদের বিভিন্ন সময় দামি ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি উপহার হিসেবে গ্রহণ করতেন। এমনকি একটি বড় সরকারি চুক্তি অনুমোদনের বিনিময়ে একটি বিলাসবহুল ঘড়ি পাওয়ার অভিযোগও সেখানে উত্থাপন করা হয়।

নেত্র নিউজ তখন কাদেরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত শত শত ছবি বিশ্লেষণ করে। ঘড়ি সংগ্রাহক, বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক বাজারসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় তারা তার হাতে দেখা যাওয়া বিভিন্ন ঘড়ির সম্ভাব্য মডেল শনাক্ত করার চেষ্টা করে। প্রতিবেদনে রোলেক্স, উলিস নার্দিন ও লুই ভিতোঁর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের একাধিক ঘড়ির কথা উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব ঘড়ির সম্মিলিত মূল্য এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। বিশেষভাবে আলোচনায় আসে একটি রোলেক্স ডে-ডেট মডেল, যার মূল্য প্রায় ২৯ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

নেত্র নিউজের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামা ও আয়কর নথিতে এসব ঘড়ির উল্লেখ পাওয়া যায়নি। সেই সূত্র ধরে প্রশ্ন তোলা হয়—একজন মন্ত্রীর ঘোষিত আয় ও দৃশ্যমান সম্পদের মধ্যে কি কোনো অসঙ্গতি রয়েছে?

ঘড়ি নিয়ে ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই আলোচনা হয়নি, রাজনৈতিক মহলেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ছিল নেত্র নিউজকে ঘিরে তৎকালীন আওয়ামী লীগের সরকারের অবস্থান। সরকার বাংলাদেশ থেকে নেত্র নিউজের ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলাও হয়। ২০২১ সালের অক্টোবরে আদালত নেত্র নিউজের সম্পাদক, সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিলসহ চারজনের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম-স্বাধীনতা বিষয়ক সংগঠন কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (সিপিজে), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (আরএসএফ) ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, ওবায়দুল কাদেরের ঘড়ি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনটি যতটা আলোচিত হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি আলোচিত হয়েছিল সরকারের প্রতিক্রিয়া। এর প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর আবার জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে নেত্র নিউজ। এবার আলোচনার কারণ ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’।

১৭ জুন প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসে স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়ক, সেতু ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা অস্বাভাবিক সুবিধা পেয়েছে।

নেত্র নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চার মাসে শিবগঞ্জ পেয়েছে প্রায় ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া উপজেলা গাজীপুরের কালীগঞ্জের তুলনায়ও এটি দ্বিগুণের বেশি।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়, এসব প্রকল্পের উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মালিকানাধীন আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছেও বড় অঙ্কের কাজ গেছে।

সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি হলো সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা এলটিএমের ব্যবহার। নেত্র নিউজের তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জে বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পের প্রায় ৭১ শতাংশ কাজ এই পদ্ধতিতে দেওয়া হয়েছে। অথচ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র হলে আরও বেশি প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার সুযোগ ছিল।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) দীর্ঘদিন ধরে এলটিএম পদ্ধতির অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সংস্থাটির গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এই পদ্ধতির অতিরিক্ত ব্যবহার সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতি ও পক্ষপাতিত্বের ঝুঁকি বাড়ায়।

শিবগঞ্জের ক্ষেত্রে নেত্র নিউজ দাবি করেছে, ৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পকে ১৬টি অংশে ভাগ করা হয়। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পায় প্রতিমন্ত্রীর ছেলের প্রতিষ্ঠান। বাকি বেশির ভাগ অংশ যায় স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রতিষ্ঠানের কাছে।

প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, দীর্ঘদিন উন্নয়নবঞ্চিত বগুড়ার জন্য তিনি বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশ করেছিলেন এবং সেই কারণেই বরাদ্দ এসেছে।

ছেলের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট লাইসেন্স অনেক আগে পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে অন্য একজনের কাছে পরিচালনার জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে। ফলে সেখানে তার পরিবারের কোনো স্বার্থ নেই।

কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে নেত্র নিউজ বলেছে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নি মালিকানা হস্তান্তরের সমতুল্য নয়। ফলে স্বার্থের দ্বন্দ্ব নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

এই প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থ। আওয়ামী লীগ আমলে গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ ছিল বিএনপির অন্যতম রাজনৈতিক বক্তব্য। নির্বাচনের আগে বগুড়ার জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জেলা বা এলাকা-ভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ফলে শিবগঞ্জকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো শুধু একটি উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্পের প্রশ্ন নয়; বরং বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।

তবে প্রতিবেদন দুটি প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায়। ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর নেত্র নিউজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ওয়েবসাইট ব্লক করা হয়েছিল, মামলা হয়েছিল, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি চাপ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মীর শাহে আলমকে নিয়ে অনুসন্ধান প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। প্রতিবেদনটি দেশে অবাধে পড়া যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও ওয়েবসাইট বন্ধ বা মামলা করার মতো পদক্ষেপের খবর পাওয়া যায়নি।

এটি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই দেওয়া কঠিন। তবে এটুকু বলা যায়, একই ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি দুই সরকারের আচরণে দৃশ্যমান পার্থক্য রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ক্ষমতার কাঠামো বদলালেও ক্ষমতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলো বদলায় না। একসময় সেই প্রশ্ন ছিল ওবায়দুল কাদেরের কব্জিতে থাকা বিলাসবহুল ঘড়ি নিয়ে। আজ প্রশ্ন উঠছে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, দরপত্রের পদ্ধতি এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে। নেত্র নিউজের দুটি প্রতিবেদন সেই অর্থে শুধু দুই ব্যক্তির গল্প নয়। এগুলো দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন এবং জবাবদিহির প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

আর সেই কারণেই সাত বছরের ব্যবধানে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন আজ একই সূত্রে গাঁথা। একটিতে ছিল একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রীর ঘড়ির গল্প। অন্যটিতে একজন ক্ষমতাধর প্রতিমন্ত্রীর উন্নয়ন-রাজনীতির গল্প। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি একই—ক্ষমতা কি জনস্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের স্বার্থে?

সাংবাদিকতার ভাষায় এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নামই অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানের কারণেই একসময় আলোচনায় এসেছিল ‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল’। আজ আলোচনার কেন্দ্রে ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’।