Image description

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বাধা না দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। এই সিদ্ধান্তের ফল কী হতে পারে, তা নিয়ে একেক রকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন রাজনৈতিক দলের নেতা, রাজনীতি বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষকরা।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে অনেক এলাকায় নির্বাচনী চিত্র বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে বিএনপি, আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের মধ্যে একটি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিছু পর্যবেক্ষক মনে করছেন, দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার কথা চিন্তা করে সরকার এই আপস করেছে। আবার অনেকের ধারণা, সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচন দেখতে চায় বাইরের কিছু দেশ, আর সেই আন্তর্জাতিক চাপের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা ও সরকারের একজন মন্ত্রী টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে সুযোগ দেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মহলের তাগিদ ছিল। তিনি বলেন, এটি কোনো গোপন বিষয় নয় যে, একটি বিশেষ দেশ আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে এবং তাদের রাজনৈতিক অধিকার দিতে সরকারকে উৎসাহিত করছে। তবে সরকার কোনো বিদেশি চাপের কাছে নতি স্বীকার করেনি দাবি করে তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ অপরাধী হিসেবে আদালতে দণ্ডিত না হচ্ছেন, ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো নাগরিককে তার রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যায় না—এই নীতি মেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

এদিকে, কিছু বিশ্লেষকের আশঙ্কা, এই সুযোগ কেবল কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। কারণ, প্রার্থীরা নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর আইনি বা রাজনৈতিক বাধায় পড়তে পারেন। নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে একজন বিশ্লেষক বলেন, অতীতেও এমন দেখা গেছে যে, নীতিগতভাবে বিরোধী দলের নেতাদের নির্বাচনে লড়ার অনুমতি দেওয়া হলেও পরে নানাভাবে তাদের ওপর আইনি ও রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল।

‘দলীয় নির্বাচন নয়’

বিএনপির কয়েকজন নেতার যুক্তি, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আর জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নয়। কারণ এই নির্বাচন কোনো দলীয় প্রতীকে হয় না।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর টাইমস’কে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রার্থীদের কোনো দলের প্রতিনিধি বলাটা ভুল ও বিভ্রান্তিকর। তিনি স্পষ্ট করেন, এই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী বা আওয়ামী লীগের প্রার্থী বলে কিছু নেই। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পূর্ণ নির্দলীয় এবং এখানে কোনো দলীয় প্রতীক ব্যবহার করা হয় না।

পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরী এ্যানীও একই কথা বলেছেন। তিনি টাইমস’কে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে যে কেউ অংশ নিতে পারেন। প্রার্থীদের কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে পরিচয় দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

তবে সরকারের এই অবস্থানের কড়া সমালোচনা করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির মতে, এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগ আবার রাজনীতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে যেতে পারে।

জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ দাবি করেন, বিএনপির নেতারা শুরু থেকেই আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার বিরোধিতা করে আসছেন। তিনি বলেন, মির্জা ফখরুলসহ বিএনপির শীর্ষ নেতারা বারবার বলেছেন তারা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে নন। দলটিকে রাজনৈতিক সুযোগ দেওয়ার ব্যাপারে তাদের একটা দীর্ঘদিনের আশ্বাস রয়েছে।

আজাদ আরও বলেন, আওয়ামী লীগের লোকেরা নির্বাচনে এলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেক কঠিন হবে, বিশেষ করে যেসব এলাকায় জামায়াত তাদের নিজেদের আসন বাড়াতে চায়। তিনি মনে করেন, কোনো দেশপ্রেমিক বা সচেতন নাগরিক আওয়ামী লীগকে আবার সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার এই চেষ্টাকে মেনে নেবে না।

মন্ত্রী এ্যানী অবশ্য জামায়াতের এই সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের নিয়মটাই বুঝতে ভুল করেছে। এটি কোনো দলীয় নির্বাচন নয়। একটি নির্দলীয় নির্বাচনে আগেই দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করে জামায়াত নিজেই ভুল করেছে।

সরকারের অবস্থান

গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা প্রার্থী হতে চাইলে সরকার কোনো বাধা দেবে না। তার এই মন্তব্যের পর বিতর্ক আরও তীব্র হয়।

সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যাদের নামে মামলা আছে বা মামলা চলছে, আইনি কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকলে তারাও নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। সরকার তাদের পথ আটকাবে না।

আওয়ামী লীগের অনেক নেতার এখনো দলীয় পদ-পদবী রয়ে গেছে, এতে কোনো সমস্যা হবে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, এই বিষয়টির এখন আর কোনো গুরুত্ব নেই। কারণ দল হিসেবে আওয়ামী লীগের সব ধরনের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে।

তার এই বক্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম হয়েছে। এ সিদ্ধান্তের  সমর্থকরা একে দেখছেন একটি গণতান্ত্রিক পদক্ষেপ হিসেবে, অন্যদিকে সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন আগামী দিনের বড় নির্বাচনগুলোর ওপর এর কী প্রভাব পড়বে।