গত ১৯ মে ভারতের দৈনিক হিন্দুস্তান টাইমসকে একটি সাক্ষাৎকার দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। তাঁর বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে বাংলাদেশের একাধিক গণমাধ্যম সাক্ষাৎকারে দেওয়া তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
হাসিনার বক্তব্য নিয়ে দৈনিক ইত্তেফাক বাংলা ও ইংরেজিতে অন্তত চারটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে। প্রতিটিতে হাসিনা দেশে ফিরবেন, এমন একটি আত্মবিশ্বাসী বার্তা রয়েছে। এছাড়া বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর, মানবজমিন, কালবেলাও এ ধরনের ফটোকার্ড এবং সংবাদ প্রকাশ করে।
২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে শেখ হাসিনার বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের বিষয়টি সামনে এনে তাঁর (হাসিনা) বক্তব্য প্রচারকে ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করে ২০২৫ সালের ২২ আগস্ট একটি বিবৃতি দেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। ২১ আগস্ট ২০২৫ শেখ হাসিনার একটি অডিও বার্তা বেশকিছু গণমাধ্যমে প্রকাশ করার পরদিন এ বিবৃতি দেয় সরকার।
বিবৃতিতে বলা হয়, “বাংলাদেশের টেলিভিশন, সংবাদপত্র এবং অনলাইন আউটলেটগুলোতে ফৌজদারী অপরাধে দণ্ডিত অপরাধী এবং গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত পলাতক আসামী শেখ হাসিনার অডিও সম্প্রচার এবং প্রচার ২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। তা ছাড়া, গত বছরের ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘৃণা ছড়ায়, সাবেক স্বৈরশাসকের এমন বক্তব্য সম্প্রচার নিষিদ্ধ করে।”
আরও বলা হয়, “আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল তাকে (শেখ হাসিনাকে) দোষী সাব্যস্ত করেছে এবং বর্তমানে তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন রয়েছে। তদুপরি, বাংলাদেশের আইন অনুসারে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে এবং একই সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ অনুসারে, যে কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন যারা তাদের নেতাদের কার্যকলাপ বা বক্তৃতা প্রচার, প্রকাশ বা সম্প্রচার করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।”
শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ করার বিষয়ে একাধিক আইনজীবীর সঙ্গে আলাপ করে বাংলাফ্যাক্ট। আইনজীবীরা জানান, শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রকাশ করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। গণমাধ্যমে বক্তব্য প্রকাশের বিষয়ে যেকেউ চাইলে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করতে পারে। বক্তব্য প্রকাশের মাধ্যমে গণমাধ্যম আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ অমান্য করেছে।
এখানে লক্ষণীয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লন্ডন থাকা অবস্থায় তাঁর বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছিল। "আইনের দৃষ্টিতে পলাতক থাকা অবস্থায়" তারেক রহমানের বক্তব্য প্রচারে নিষেধাজ্ঞা চেয়ে ২০১৫ সালের ৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী নাসরিন সিদ্দিকী একটি রিট করেন। পরদিন হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দেন। তারেক রহমানের কোনো বক্তব্য বা বিবৃতি যেকোনো গণমাধ্যমে প্রচার ও প্রকাশ নিষিদ্ধ করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের আগস্টে রিট আবেদনকারী সম্পূরক আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ২৮ আগস্ট এক আদেশে হাইকোর্ট তারেক রহমানের বক্তব্য, বিবৃতি, অডিও ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে সরাতে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেন। ২০২৩-এর ২৮ জুলাই বিএনপির মহাসমাবেশে তারেক রহমানের একটি অডিও ভাষণ প্রচার করা হয়। অনলাইনে সেটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সেই পরিপ্রেক্ষিতে এমন আদেশ আসে।
বাংলাদেশের এই গণমাধ্যমগুলো সেদিন বা তার পরদিন তারেক রহমানের ওই বক্তব্যের কোনো প্রচার করেনি। বর্তমানে গণমাধ্যমগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার বক্তব্য নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও প্রচার করছে, যা গণমাধ্যমগুলোর নীতি ও পক্ষপাত নিয়ে প্রশ্ন তোলে।