Image description

কয়েক দিন ধরে অফিস টাইমে চলছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে মাঠ প্রশাসনের অনলাইন কর্মশালা। নিজ দপ্তরে বসে ভূমি অধিগ্রহণ-সংক্রান্ত দেড় ঘণ্টার এ আয়োজনে অংশগ্রহণকারীরা পাচ্ছেন সম্মানী হিসেবে মোটা অঙ্কের টাকা। এটি নির্ধারিত বেতন-ভাতার বাইরে অতিরিক্ত আয়। শুধু এ কর্মশালাই নয়, নিয়মিতভাবেই সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অধীনে হচ্ছে সেমিনার, কর্মশালা, প্রশিক্ষণ এবং ভার্চুয়াল বৈঠক। শুধু তাই নয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ধরনের আয়োজন না করেই জালিয়াতির মাধ্যমে সম্মানীর টাকা তুলে নজির আছে আত্মসাতেরও। এভাবে বছরে সরকারের ব্যয় হচ্ছে অন্তত হাজার কোটি টাকা। তবে এক্ষেত্রে শুধু নীতিনির্ধারকদের পছন্দের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাই ভোগ করেন সুবিধা। কিন্তু সাচিবিক সহায়তা দেওয়ার পরও কোনো ধরনের সম্মানী পান না অধস্তনরা। এ নিয়ে তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে এক ধরনের চাপা ক্ষোভ ও অসন্তোষ।

আমলাদের এ ধরনের অতিরিক্ত আয় সরকারি অর্থের অবশ্যই অপচয়— এমন মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে এ অর্থ নেওয়ার জন্য তৈরি করে নিয়েছেন বিধি, যা দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর আছে। এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করা উচিত। কারণ, যেখানে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেই কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে সব ধরনের অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে এনেছেন, সেখানে বাংলাদেশের মতো গরিব রাষ্ট্রের অহেতুক এ ধরনের সুবিধা বাঞ্ছনীয় নয়।

বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবিলায় সরকারি অর্থের অপচয় রোধে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাতিল করেছেন নিজের প্রটোকলের ফোর্স, গাড়িসহ প্রাধিকারভুক্ত অনেক সুযোগ-সুবিধা। শুধু তাই নয়, সরকার ও বিরোধীদলীয় এমপিরাও শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং প্লট নেবেন না বলেও করেছেন অঙ্গীকার। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গত ৫ এপ্রিল মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সৃষ্ট জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় নয়টি ক্ষেত্রে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমিয়ে জারি করা হয়েছে পরিপত্র। এতে বলা হয়, সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে যে, সরকারের পরিচালন ব্যয় কমাতে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে সব বৈদেশিক প্রশিক্ষণ বন্ধ থাকবে। পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ প্রশিক্ষণ ব্যয় ৫০ শতাংশ কমাতে হবে। সভা-সেমিনারে আপ্যায়ন ব্যয় ৫০ শতাংশ এবং সেমিনার-কনফারেন্স ব্যয় কমাতে হবে ২০ শতাংশ।

জানতে চাইলে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. আবদুল বারী গত রবিবার নিজ দপ্তরে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘বিষয়টি ভালোভাবে জানতে হবে। প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্টরা বলছেন— মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর, পরিদপ্তর ও দপ্তরের নিয়োগ এবং পদোন্নতিসংশ্লিষ্ট কাজের জন্য সম্মানী বা পারিতোষিক নির্ধারণ করা আছে। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির সদস্য, মৌখিক বা ব্যবহারিক পরীক্ষা বোর্ডের সদস্য বা বিশেষজ্ঞদের জনপ্রতি ৬ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এমনকি ক্যাডার কর্মকর্তাদের পদোন্নতির সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ ‘সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের’ (এসএসবি) সদস্যরাও বৈঠকপ্রতি সম্মানী পান ১০ হাজার টাকা। বিসিএস নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষায় পরীক্ষকরা পান মোটা অঙ্কের সম্মানী। এভাবেই সরকারি কর্মদিবসে অফিস সময়ে নিয়োগ, পদোন্নতিসংশ্লিষ্ট কাজ ও সেমিনার, কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের নামে বছরে বেতনবহির্ভূত কয়েক হাজার কোটি টাকা বাগিয়ে নিচ্ছেন সরকারি কর্মকর্তারা। তারাই এ-সংক্রান্ত আইন ও বিধি প্রণয়ন করে থাকেন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে শুধু প্রশিক্ষণ খাতেই বরাদ্দ ছিল প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। করোনা মহামারীর কারণে ২০২২-২৩ অর্থবছরে এ খাতের বরাদ্দ ৬০২ কোটি এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারি কর্মচারীদের প্রশিক্ষণে ব্যয় হয়েছে ১৯ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা।

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যমান আইন ও বিধি মেনেই তারা সম্মানী নিচ্ছেন। পিপিআর অনুযায়ী, সরকারি ক্রয়সংশ্লিষ্ট বিধিনির্দেশ এবং প্রাক্কলন কমিটির প্রতিটি সভায় ১০ কোটি টাকার বেশি কেনাকাটার ক্ষেত্রে সভার জন্য সদস্যরা ৫ হাজার টাকা করে সম্মানী পান। ১ কোটি টাকার বেশি হলে ৩ হাজার এবং ১০ লাখ টাকার বেশি হলে দেড় হাজার টাকা। আর ১০ লাখ টাকার কম হলে ১ হাজার টাকা সম্মানী পান। একই পরিমাণ সম্মানী পান মূল্যায়ন কমিটি এবং কারিগরি পরীক্ষণ ও গ্রহণ কমিটির সদস্যরাও। এ ছাড়া দরপত্র ও প্রস্তাব উন্মুক্তকরণ কমিটির প্রত্যেক সদস্য ১ হাজার করে টাকা সম্মানী পান। ঠিক এমনই সম্মানী নির্ধারণ করা আছে প্রায় প্রতিটি খাতে।

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান আগামীর সময়কে বললেন, ‘কর্মশালা, প্রশিক্ষণ বা নিয়োগ ও ক্রয় কমিটির বৈঠক সরকারি কাজের অংশ। এটি কর্মকর্তাদের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। দীর্ঘদিন ধরেই তা চলে আসছে। এ ধরনের সম্মানীর নামে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া আমলাদের ক্ষমতার অপব্যবহার। এটি উত্তম চর্চার মধ্যে পড়ে না। আইনসিদ্ধ হওয়ায় বিগত সরকারগুলোও এর অনুমোদন দিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নিয়েই কর্মকর্তাদের শুল্কমুক্ত গাড়ির সুবিধা স্থগিত করেছেন। সম্মানীর নামে রাষ্ট্রীয় অপচয় স্থায়ীভাবে বন্ধ হওয়া উচিত।’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দক্ষতা উন্নয়নে নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রেখেছে সরকার। কিন্তু প্রশিক্ষণ সম্পন্ন না করে সম্মানী ভাতা উত্তোলন, স্বাক্ষর জাল করে প্রশিক্ষণের অর্থগ্রহণ, বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ লোপাট, বেশি প্রশিক্ষণার্থীর অংশগ্রহণ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের মতো ঘটনার নজির প্রশাসনে কম নয়। যেমন— ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের (বিআরডিবি) সম্মেলন কক্ষে ‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার রূপকার’ শীর্ষক এক দিনের কর্মশালায় অংশ নেন প্রতিষ্ঠানটির তৎকালীন ডিজি সুপ্রিয় কুমার কুন্ডু, পরিচালক (পরিকল্পনা) এস এম মাসুদুর রহমান, পরিচালক (সরেজমিন) আবদুর রশীদ, পরিচালক (প্রশিক্ষণ) ইসমাইল হোসেনসহ বিভিন্ন পদের আরও ৩৮ জন। কর্মশালা বেলা ৩টার পর শুরু হলেও দুপুরের খাবার বাবদ খরচ দেখানো হয়েছিল ৩৩ হাজার ৩৪৫ টাকা, যা কেনা হয়েছিল কারওয়ান বাজারের ‘চারুলতা রেস্তোরাঁ’ থেকে। বাস্তবে সেদিন ওই দোকানসহ রাজধানীর সব দোকানই বন্ধ ছিল। বন্ধ ছিল বিআরডিবির প্রধান কার্যালয়ও। হয়নি কোনো কর্মশালাও। কারণ, করোনার জন্য ২০২০ সালের ২৭ মার্চ থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত দেশে ছিল কঠোর লকডাউন (সাধারণ ছুটি)। উপযুক্ত কারণ ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ায় ছিল কঠোর নিষেধাজ্ঞা। অথচ এমন নিষেধাজ্ঞা ও সরকারি ছুটির মধ্যেও ভুয়া সভা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ এবং ওয়ার্কশপ দেখিয়ে উল্লিখিত তিন মাসে ৩৬ লাখ ৬৪ হাজার ৮৩০ টাকা তুলে আত্মসাৎ করা হয়েছিল, যা প্রতিষ্ঠানটির অডিট প্রতিবেদনে ধরা পড়ে।

জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মো. ফিরোজ মিয়া আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘সুবিধা দিয়েই করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি। একজন কর্মকর্তা তার দায়িত্বের বাইরে কোনো কাজ করলে তাকে কিছু টোকেন মানি দেওয়া যেতে পারে। তবে দু-এক ঘণ্টার বোর্ডসভা, মিটিংয়ে সম্মানীর নামে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়া দৃষ্টিকটু। গরিব দেশের জন্য এত উঁচু সম্মানী মানায় না। বিদেশে সম্মানী নয়, এ ধরনের কাজে গিফট বা ফুলের তোড়া দেওয়া হয়।’