Image description

রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী। ওই অভিযানকে কেন্দ্র করে বহু হতাহতের অভিযোগ ওঠে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাসহ তার মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্যদের বিরুদ্ধে শাপলা চত্বরে গণহত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে মামলা হয়। তবে ওই হত্যাকাণ্ডের ১৩ বছর পরও অজানা রয়ে গেছে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা। বিচার পাননি শহীদ পরিবারের সদস্য ও ভুক্তভোগীরা।
হেফাজত নেতাদের অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে বিচার চাওয়াও তাদের জন্য সহজ ছিল না। বিচার চাইতে গিয়ে হামলা, মামলা, জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন অনেকে। তাদের মধ্যে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মী এমনকি মানবধিকার কর্মীরাও রয়েছেন। এমনকি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তুলে নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

পবিত্র কোরআন ও মহানবী (সা.)-এর প্রতি অবমাননার প্রতিবাদসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে ‘ঢাকা অবরোধ’ নামের ওই কর্মসূচির ডাক দেয় হেফাজতে ইসলাম। আলেম সমাজ ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীসহ সারা দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নেয়। ঢাকা অবরোধ শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হয় আন্দোলনকারীরা।

হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে দিনভর উত্তেজনা ছিল সেখানে। সেদিন সন্ধ্যার আগেই দুজনের মরদেহ আনা হয় শাপলা চত্বরে নির্মাণ করা অস্থায়ী মঞ্চের সামনে। মধ্যরাতে সমাবেশে আসা আলেম ও মাদ্রাসাছাত্রদের ওপর হামলে পড়ে যৌথ বাহিনী। গুলি, টিয়ারশেল আর সাউন্ড গ্রেনেডের মুখে খালি হয়ে যায় পুরো এলাকা। হতাহত হন অনেকে।

ঢাকায় নিহত ৩২ জনের পরিচয় শনাক্ত
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম গত ৩ মে সাংবাদিকদের বলেন, জানান, শাপলা চত্বরের ওই সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ৫৭ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ঢাকায় নিহত ৩২ জনের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণগঞ্জে ২০ জন এবং চট্টগ্রামে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে নিহতদের শনাক্তের কাজ করছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা।

এর আগে ২০২৫ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে নিহতদের মধ্যে ৯৩ জনের পরিচয় প্রকাশ করে হেফাজতে ইসলাম। তখন বলা হয়েছিল, এটি প্রাথমিক তালিকা। যাচাই-বাছাই শেষে এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। তারও আগে ২০২১ সালের ১০ জুন মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চলমান অনুসন্ধানের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে তারা শাপলা চত্বরে নিহত ৬১ জনের নাম সংগ্রহ করেছে। এর এক মাস পর সংস্থাটির সাধারণ সম্পাদক আদিলুর রহমান খানকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০১৪ সালে শাপলায় নিহত ৪১ জনকে নিয়ে ‘শহীদনামা’ নামে বই লিখেন হাবীবুল্লাহ সিরাজ।

উল্লিখিত তিন প্রতিবেদন এবং শহীদনামা বইয়ে নিহতের সংখ্যা নিয়ে চার ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে। অবশ্য কেউ এটিকে চূড়ান্ত তালিকা বলছেন না। সেদিনের ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি হাত-পা কিংবা চোখ হারিয়ে পঙ্গুত্বের শিকার হয়েছেন অনেকে। তাদের নিয়েও পূর্ণাঙ্গ কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

 

শহীদের তালিকা নিয়ে কাজ করছে হেফাজত
হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শহীদের সংখ্যা ৯৩ নয়, আরও বেশি হবে। গণমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছি, জুরাইনে অনেক বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। যাত্রাবাড়ীর ময়লার স্তূপে মানুষের হাড় পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মিডিয়া, মানবধিকার সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থা বলেছে, এগুলো হেফাজতের লাশ। বিশেষ করে আঞ্জুমানে মুফিদুল ইসলাম ২০১৩ সালের মে মাসে প্রায় ৫০০ বেওয়ারিশ লাশ দাফন করেছে। এগুলো তো দাফন হয়ে গেছে। পরিবারও জানে না, এগুলো কার লাশ।’ শহীদের সঠিক সংখ্যা নির্ণয়ে হেফাজতে ইসলাম কাজ করছে বলে জানান আজিজুল হক।

 

এক যুগের বেশি সময় পার হওয়ার পরও হেফাজত কর্তৃক শহীদদের তালিকা প্রকাশ করতে না পারাকে চরম ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ গ্রিন পার্টির সদস্য সচিব সালাহউদ্দীন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, ‘তালিকা করা শহীদ পরিবারের দায়িত্ব নয়। এই দায়িত্ব হেফাজতের। ১৩ বছরেও তারা চূড়ান্ত তালিকা করতে পারেনি। আহতদেরও খোঁজ নেয় না কেউ।’

 

শহীদনামার লেখক হাবীবুল্লাহ সিরাজ বলেন, ‘বই প্রকাশ করতে গিয়ে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। মাঝপথে ছাপা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমার বইয়ে ৪১ জনের কথা আছে। তাদের পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে লিখেছি।’

 

শেখ হাসিনাসহ ৫৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
শাপলা চত্বরে গণহত্যার ১৩ বছর পার হলেও বিচার পায়নি ভুক্তভোগীদের পরিবার। আওয়ামী লীগ আমলে সে বাস্তবতাও ছিল না। জুলাই অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই হেফাজতের পক্ষে বাদী হয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ করেন সংগঠনের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এতে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের নাম উল্লেখ করে ৫৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দাখিল করা হয়।

 

আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্টমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, সাবেক তিন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, বেনজীর আহমেদ, এ কে এম শহিদুল হক, পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম।

 

আজিজুল হক ইসলামাবাদী বলেন, ‘তৎকালীন সরকারের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা, মন্ত্রী-এমপিরা জেলে আছেন। বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাক্ষী সংগ্রহ করা হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস, শাপলা চত্বরে হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী জালিমদের বিচারের মুখোমুখি করতে পারব।’

 

শাপলা চত্বরের সেদিনের স্মৃতি জিইয়ে রাখতে মাওলানা মামুনুল হককে চেয়ারম্যান করে ‘শাপলা স্মৃতি সংসদ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা কামালুদ্দীন বলেন, ‘বিগত ১২ বছর শাপলা স্মৃতি সংসদ করা সম্ভব হয়নি। সরকারের কাছে বিচার চাইব। আমরা সাক্ষ্য দিতে প্রস্তুত।’

 

প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা
নেত্রকোণার পূর্বধলার একটি মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা খায়রুল ইসলাম। ২০১৩ সালে নরসিংদীর বেলাবরের কাঙ্গালিয়া মাদ্রাসায় শরহে বেকায়া (এসএসসি সমমান) পড়তেন তিনি। ৫ মে হেফাজতের কর্মসূচিতে যোগ দিতে ৪ মে সন্ধ্যায় মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ঢাকার সাইনবোর্ড এলাকায় এক মাদ্রাসায় অবস্থান নেন। সকালে মহাসড়কে হাজারো মানুষের সঙ্গে মিছিলে অংশ নেন। দুপুরে রওনা করেন শাপলা চত্বরের দিকে।

 

খায়রুল ইসলাম বলেন, ‘বিকাল ৩টায় জানতে পারি, বায়তুল মোকাররমে সংঘর্ষ হয়েছে। দুই তিনজনের শহীদ হওয়ারও খবর পাই। সন্ধ্যায় দুজনের মরদেহ শাপলা চত্বরে আনার খবরে খুবই মর্মাহত হই, ভয়ও পাই। আওয়ামী লীগের এক নেতা শাপলা চত্বর ছেড়ে যেতে হুমকি দেয়। হেফাজত নেতা মামুনুল হকও মঞ্চ থেকে পাল্টা হুমকি দেন।’

 

রাত ৯টার দিকে বাংলাদেশ ব্যাংকসংলগ্ন কোনো উঁচু জায়গা থেকে প্রথম সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ পান খায়রুল। রাত ১১টার পর কিছুটা সময় তিনি তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিলেন। হঠাৎ ভয়ার্ত মানুষের চিৎকারের শব্দে ঘুম থেকে লাফিয়ে উঠে চারদিকে অন্ধকার দেখতে পান। মানুষ ছোটাছুটি করছে। গুলি আর সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ শোনা যাচ্ছে।
শাপলা চত্বর থেকে বায়তুল মোকাররমের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন খায়রুল। ব্যারিকেড দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রতিহতের চেষ্টা করেন। হঠাৎ দেখেন, পাশে দুজন রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। অন্যদিকে যৌথ বাহিনীর ধেয়ে আসছে। একসময় কমলাপুরের দিকে দৌড়াতে থাকেন। পেছনে তাড়া করতে থাকে ভয়ংকর শব্দ। তার ভাষায়, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়াল রাত ছিল এটি।’

 

৫ মে রাতে শাপলা চত্বরের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী এশিয়া পোস্টকে জানান, দিনব্যাপী ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় আলেম, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও সাধারণ মুসল্লিদের ওপর হামলা চালায় যৌথ বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সন্ধ্যায় কয়েকজন শহীদ হন। রাতভর শাপলা চত্বরে উত্তেজনা চলতে থাকে। হেফাজত নেতাদের অনেকে ভাষণ দেন। মধ্যরাতের দিকে হঠাৎই চারপাশ অন্ধকার হয়ে যায়। শুরু হয় গুলি, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ। চারপাশে শুধু গুলির শব্দ। যৌথ বাহিনীর আক্রমণের মুখে মানুষ দিশেহারা হয়ে এদিক-সেদিক ছুটতে থাকে। অনেকে আহত হন। শহীদদের মরদেহ পড়ে থাকে রাস্তার ধারে।

 

অপারেশন ফ্লাশ আউট
সরকার উৎখাতের আন্দোলনের অভিযোগে ৫ মে সন্ধ্যার আগে শাপলা চত্বর ছাড়তে হুঁশিয়ারি দিয়েছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। অন্যদিকে দাবি আদায়ে অনড় অবস্থান নেয় হেফাজত। পরে সরকারের নির্দেশে রাতভর ‘অপারেশন ফ্লাশ আউট’ নামের অভিযান চালায় যৌথ বাহিনী।

 

পুলিশের পক্ষ থেকে অভিযানের নাম দেওয়া হয় অপারেশন সিকিউরড শাপলা। অপারেশন ক্যাপচার শাপলা নাম দেয় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয় সমাবেশে যোগ দেওয়া ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের। সূর্যোদয়ের আগেই রাতের অন্ধকারে খালি করে ফেলা হয় শাপলা চত্বর।