ড. সিরাজুল আই ভুইয়া
বাংলাদেশ আবার ইতিহাসের সেই চিরচেনা মোড়ে দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি ভুল সিদ্ধান্ত জাতিকে দশক পিছিয়ে দেয় আর একটি সঠিক সিদ্ধান্ত প্রজন্মের ভাগ্য বদলে দেয়। ১২ ফেব্রুয়ারি কোনো সাধারণ নির্বাচনি দিন নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের স্মৃতি ও বিস্মৃতির মধ্যে বেছে নেওয়ার দিন। এটি সেই দিন, যেদিন বাংলাদেশকে ঠিক করতে হবে জুলাইয়ের রক্ত কি শুধু দেয়ালে লেখা স্লোগান হয়ে থাকবে, নাকি তা সংবিধানে রূপ নেবে।
জুলাই ৩৬-এর বিপ্লব ছিল না কোনো হঠাৎ আবেগের বিস্ফোরণ। এটি ছিল দীর্ঘ অবদমনের বিরুদ্ধে জনগণের নীরব সহ্যের বিস্ফোরণ। ভোটের অধিকার হরণ, বিরোধী কণ্ঠ রুদ্ধ করা, রাষ্ট্রকে দলীয় সম্পত্তিতে পরিণত করা এবং জবাবদিহিকে নির্বাসনে পাঠানোর বিরুদ্ধে জনগণ সেদিন রাস্তায় নেমেছিল। সেই আন্দোলনের মূল্য ছিল রক্ত, জীবন এবং ভবিষ্যৎ। ইতিহাসে এমন আত্মত্যাগ শুধু স্মরণ করার জন্য নয়, তা রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য। এই গণভোট সেই নির্মাণেরই নাম।
গণভোট : আবেগের নয়, কাঠামোর প্রশ্ন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি একটাই—আমরা সরকার বদলেছি, কিন্তু শাসনব্যবস্থা বদলাইনি। আমরা নির্বাচন করেছি, কিন্তু প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করিনি। ফল একটাই হয়েছে : প্রতিবার নতুন সরকার, কিন্তু পুরোনো ক্ষমতার চর্চা; প্রতিবার নতুন সংবিধানের ভাষা, কিন্তু একই কর্তৃত্ববাদী বাস্তবতা।
এই গণভোট সেই দুষ্টচক্র ভাঙার একটি ঐতিহাসিক প্রচেষ্টা। এটি আবেগের দলিল নয়, বরং রাষ্ট্রকাঠামো পুনর্গঠনের সাংবিধানিক হাতিয়ার। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে এই স্বীকারোক্তি যে গণতন্ত্র শুধু ব্যালট বাক্সে জন্মায় না, তা টিকে থাকে শক্তিশালী ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও তার সংস্কার টিম এই সত্যটি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে বুঝেছেন। বাংলাদেশের ৫৪ বছরের অভিজ্ঞতা তাদের শিখিয়েছে নির্বাচন থাকলেই গণতন্ত্র থাকে না, যদি প্রশাসন দলীয় হয়, বিচার দুর্বল হয় এবং রাষ্ট্র নাগরিকের নয়, ক্ষমতাসীনের সেবায় নিয়োজিত থাকে।
জুলাইয়ের শহীদদের কাছে রাষ্ট্রের দায়
জুলাইয়ের রক্তের দাবি শুধু স্মৃতিফলক নয়, শুধু বার্ষিক শ্রদ্ধা নয়। সেই রক্ত চায় কাঠামোগত পরিবর্তন। সেই আত্মত্যাগ চায় এমন একটি রাষ্ট্র, যেখানে আর কোনো সরকার ভোট চুরি করতে সাহস পায় না, যেখানে আর কোনো প্রশাসন দলীয় লাঠিয়াল হয়ে ওঠে না, যেখানে আর কোনো নাগরিক ভিন্নমতের জন্য নিখোঁজ হয় না।
এই গণভোট সেই নৈতিক ঋণ শোধের একমাত্র পথ। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে শহীদদের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রের ভিত্তিতে পরিণত করা। ‘না’ ভোট মানে সেই আত্মত্যাগকে আবার রাজনৈতিক সমঝোতার কবর দেওয়া।
‘না’ ভোট মানে কী—এই সত্য লুকানোর সুযোগ নেই
একটি দুর্বল ‘না’ ভোট মানে স্থিতাবস্থা নয়; মানে পুরোনো রোগের পুনরুত্থান। মানে সেসব শক্তির প্রত্যাবর্তন, যারা দুর্বল প্রতিষ্ঠান, নিয়ন্ত্রিত নির্বাচন ও ভীত নাগরিকের মধ্যেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। মানে আবার সেই রাজনীতি, যেখানে ক্ষমতা জবাবদিহির ঊর্ধ্বে থাকে আর রাষ্ট্র আইনের নয়, ব্যক্তির ইচ্ছায় চলে।
এটি কোনো নাটকীয় পতন ডেকে আনবে না বরং ধীরে ধীরে গণতন্ত্রের শ্বাসরোধ করবে। ইতিহাস বলে, স্বৈরতন্ত্র সবসময় একদিনে আসে না; আসে ক্লান্ত জনগণ, দুর্বল প্রতিষ্ঠান আর ‘স্থিতিশীলতা’র মিথ্যা মোড়কে।
কেন সংস্কারবিরোধীরা আতঙ্কিত
এই গণভোটের বিরোধিতা করছে কারা, তা বোঝাই যথেষ্ট। দেশের ভেতরে সেই পুরোনো ক্ষমতার নেটওয়ার্ক, যারা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ছায়ায় বেড়ে উঠেছিল; যারা প্রশাসনকে দলীয় করে, রাষ্ট্রকে ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে রূপ দিয়েছিল। তাদের জন্য ‘না’ ভোট মানে সময় কেনা পুনর্গঠন, পুনরাবর্তন এবং আবার জনগণকে ক্লান্ত করে তোলার সুযোগ।
এর বাইরে আঞ্চলিক কিছু শক্তিও আছে, যারা দুর্বল ও নির্ভরশীল বাংলাদেশেই স্বস্তি খুঁজে পায়। একটি শক্তিশালী, আইননির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ তাদের জন্য সুবিধাজনক নয়। কারণ শক্ত প্রতিষ্ঠান মানে কম চাপ, কম গোপন দরকষাকষি, কম প্রভাব বিস্তার। তাই গণভোটবিরোধিতা এখানে আদর্শের প্রশ্ন নয়, এটি স্বার্থের প্রশ্ন।
‘হ্যাঁ’ ভোট : পশ্চাদপসরণের বিরুদ্ধে শেষ প্রাচীর
‘হ্যাঁ’ ভোট মানে এই ঘোষণা জুলাই আর গোপনে উল্টে দেওয়া যাবে না। এই বিপ্লব আর কোনো অন্ধকার সমঝোতায় হারিয়ে যাবে না। এটি সংবিধানে লেখা থাকবে, আইনে সুরক্ষিত থাকবে, প্রতিষ্ঠানে প্রোথিত থাকবে।
এটি শুধু সংস্কারের প্রশ্ন নয়; এটি অপরিবর্তনীয়তার প্রশ্ন। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে বাংলাদেশ আর কখনো স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে আপস করবে না, সে ঘরোয়া হোক বা বিদেশি সহায়তাপুষ্ট।
উপসংহার : যে বাংলাদেশ আমাদের প্রাপ্য
এই গণভোট নির্বাচনের বিকল্প নয়; এটি নির্বাচনের ভিত্তি। সংস্কার ছাড়া নির্বাচন শুধু আচার—আইনসম্মত, কিন্তু আত্মাহীন। সংস্কারের সঙ্গে নির্বাচন আবার জনগণের প্রকৃত ক্ষমতায়ন হয়ে উঠতে পারে।
১২ ফেব্রুয়ারির ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে জুলাইয়ের অধ্যায়কে অসমাপ্ত রেখে যাওয়া নয়। এটি সেই অধ্যায়ের পরিণতি। এটি রাজপথ থেকে সংবিধানে যাত্রা, স্লোগান থেকে রাষ্ট্রে রূপান্তর, রক্ত থেকে আইনে উত্তরণ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস যথার্থই বলেছেন : ‘গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনে টিকে থাকে না; প্রতিদিন জনগণের জন্য কাজ করা প্রতিষ্ঠান দিয়ে তাকে রক্ষা করতে হয়’। এই গণভোট সেই দর্শনেরই বাস্তব রূপ।
যেসব রাজনৈতিক দল ও গণতান্ত্রিক শক্তি স্বল্পমেয়াদি লাভের ঊর্ধ্বে উঠে এই গণভোটকে সমর্থন করেছে, তারা ইতিহাসের সঠিক পাশে দাঁড়িয়েছে। কারণ গণতন্ত্রের প্রশ্নে নিরপেক্ষতা বলে কিছু নেই।
‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়ে নাগরিকরা শুধু সংস্কার বেছে নেন না। তারা স্মৃতি বেছে নেন জুলাইয়ের শহীদদের স্মৃতি। তারা দায়িত্ব বেছে নেন গণতন্ত্র রক্ষা করার দায়িত্ব এবং সর্বোপরি, তারা এমন এক প্রজাতন্ত্র বেছে নেন, যা তার জনগণের যোগ্য।
বাংলাদেশ আজ আর দ্বিধার সুযোগে নেই। ইতিহাস অপেক্ষা করছে। ১২ ফেব্রুয়ারি, কলমটি আমাদের হাতেই।
লেখক : যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের সাভান্না স্টেট ইউনিভার্সিটিতে সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিষয়ে অধ্যাপক