বাংলাদেশ–পাকিস্তান যুদ্ধবিমান আলোচনার গুঞ্জন আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ আনছে। ভারতের উদ্বেগের বাইরে প্রশ্ন একটাই, তেজস কেন পিছিয়ে, জেএফ-১৭ কীভাবে রপ্তানিযোগ্য হলো?
As Bangladesh considers buying Pakistan’s JF-17 fighter jets, the move exposes a bigger regional shift. Pakistan now exports combat aircraft, while India struggles with its own jet program. The decision could reshape South Asian military balance and challenge India’s long-held strategic confidence.
আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও নিরাপত্তা বিশ্লেষণে যাঁরা নিয়মিত নজর রাখেন, তাঁদের কাছে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশেরই কৌশলগত পরিকল্পনা ও নিরাপত্তা-ভাবনা পরিচিত। ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতি থেকে শুরু করে ‘কোল্ড স্টার্ট’–এর মতো ডকট্রিনের আলোচনা যেমন ভারতের নীতিচর্চায় দেখা যায়, তেমনি পাকিস্তানের ক্ষেত্রে প্রতিরোধক্ষমতা, জোটনীতি ও প্রতিরক্ষা-সামর্থ্য টিকিয়ে রাখার বাস্তব হিসাবও ধারাবাহিকভাবে সামনে আসে।
১৯৪৭ সালের পর থেকে একাধিক সংঘাতে কার লাভ-ক্ষতি কতটা “স্থায়ী” ছিল, এ নিয়ে মূল্যায়ন একরকম নয়। ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক সক্ষমতা, কূটনৈতিক পরিবেশ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে বিশ্লেষকদের দৃষ্টিও ভিন্ন হয়েছে। সে কারণেই কার কৌশল কতটা কার্যকর, বা কার সুবিধা কোথায়, এ প্রশ্নে একদিকে যেমন ভারতের পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা আলোচনায় আসে, অন্যদিকে কিছু সমালোচকের মতে এই সুবিধা অনেক সময় নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষ ও পরিস্থিতিতেই বেশি দৃশ্যমান থাকে।
এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতে একটি সম্ভাব্য সিদ্ধান্ত ঘিরে আঞ্চলিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। অনলাইন পরিসরে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে যুদ্ধবিমান ক্রয়ের পথে এগোচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৬ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খানের চারদিনের ইসলামাবাদ সফরের পর বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে বেশি গুরুত্ব পায়। প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স থেকে ১৬টি এবং দীর্ঘমেয়াদে মোট ৪৮টি জেএফ-১৭ থান্ডার ব্লক থ্রি (৪.৫ জেনারেশন) যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়ে আলোচনা অগ্রসর হয়েছে, যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় দুই বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
এই খবর ভারতের গণমাধ্যমে বিশেষ করে টেলিভিশন টকশোগুলোতে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল জানান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্ভাব্য এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ‘গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ’ করা হচ্ছে। তবে ভারতের উদ্বেগের বাইরে গিয়ে আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত, তা হলো, কৌশলগত বিচারে পাকিস্তান কীভাবে যুদ্ধবিমান উৎপাদন ও রপ্তানিতে ভারতের চেয়ে দৃশ্যমান সাফল্য দেখাতে পারল।
ইতিহাসের দিকে তাকালে পার্থক্যটি আরও স্পষ্ট হয়। ১৯৭৪ সালে ভারতের প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা, ‘স্মাইলিং বুদ্ধ’, দেশটিকে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টো যেকোনো মূল্যে পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জনের ঘোষণা দেন। তবে সেই লক্ষ্য পূরণে পাকিস্তানের সময় লাগে প্রায় চব্বিশ বছর; ১৯৯৮ সালের ২৮ মে বেলুচিস্তানের চাগাই পাহাড়ে ‘চাগাই-১’ পরীক্ষার মাধ্যমে তারা পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রে পরিণত হয়। এই ব্যবধানই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে পাকিস্তান দীর্ঘ সময় ধরেই ভারতের তুলনায় পিছিয়ে ছিল।
তবুও বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তান যেখানে নিজস্বভাবে তৈরি যুদ্ধবিমান একাধিক দেশে রপ্তানি করছে, সেখানে ভারত এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান আজারবাইজান ও লিবিয়ার সঙ্গে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান রপ্তানি চুক্তি সম্পন্ন করেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। বিপরীতে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হিন্দুস্তান অ্যারোনটিক্স লিমিটেড (এইচএএল) এখনো তেজস যুদ্ধবিমানের উৎপাদনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে, যার অন্যতম কারণ মার্কিন জিই ইঞ্জিন সরবরাহে বিলম্ব।
ভারতের নিজস্ব যুদ্ধবিমান তৈরির যাত্রা শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালে লাইট কমব্যাট এয়ারক্রাফট (এলসিএ) প্রকল্পের মাধ্যমে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর ২০০১ সালে এর প্রথম সফল প্রোটোটাইপ উড্ডয়ন করে। এটি ভারতের প্রথম আধুনিক সুপারসনিক যুদ্ধবিমান হলেও প্রকল্পটির গতি ছিল ধীর। এর আগে ১৯৬০-এর দশকে এইচএফ-২৪ মারুত প্রকল্প প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছিল। ফলে ভারতীয় বিমানবাহিনী দীর্ঘ সময় বিদেশি মিগ-২১ ও মিরাজ-২০০০-এর ওপর নির্ভরশীল ছিল।
২০০৩ সালে এলসিএ প্রকল্পের নামকরণ হয় ‘তেজস’। একই বছর পাকিস্তান-চীন যৌথ উদ্যোগে তৈরি এফসি-১ যুদ্ধবিমানের প্রথম উড্ডয়ন ঘটে, যা পরবর্তীতে জেএফ-১৭ নামে পরিচিত হয়। মাত্র এক দশকের মধ্যে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করে পাকিস্তান ও চীন। ভারতীয় মহলে তখন এই বিমানকে উপহাস করলেও, একই সময়ে ভারতের পুরনো মিগ-২১ বিমানের ধারাবাহিক দুর্ঘটনা দেশটির বিমান নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
২০০৭ সালে পাকিস্তান আনুষ্ঠানিকভাবে জেএফ-১৭ বিমান নিজেদের বিমানবাহিনীতে যুক্ত করে। ভারতীয় তেজস তখনো সামরিক বহরে অন্তর্ভুক্ত হয়নি। অবশেষে ২০১৬ সালে প্রথম তেজস স্কোয়াড্রনে যুক্ত হয়। এর মধ্যে পাকিস্তান চারটি যুদ্ধপ্রস্তুত স্কোয়াড্রন গড়ে তোলে এবং বাস্তব অভিযানে ব্যবহারের অভিজ্ঞতাও অর্জন করে, যা তাদের রপ্তানি সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হয়।
২০২৫ সালে এসে তেজস উৎপাদনে কিছুটা গতি এলেও একই বছরের নভেম্বরে দুবাই এয়ার শোতে একটি দুর্ঘটনা ভারতের রপ্তানি স্বপ্নে বড় ধাক্কা দেয়। আর্মেনিয়া তেজস কেনার আলোচনা স্থগিত করে এবং আর্জেন্টিনা জেএফ-১৭ কেনার পথে অগ্রসর হয়। আজারবাইজান ইতোমধ্যে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পন্ন করেছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ‘স্বদেশি’ প্রযুক্তির প্রতীক হিসেবে তেজস তৈরি হলেও এর প্রধান ইঞ্জিন এখনো বিদেশি, মার্কিন জিই এফ৪০৪ ও এফ৪১৪ নির্ভর। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সামরিক অভিযান অপারেশন সিন্দুরে রাফায়েলসহ ভারতের অন্যান্য যুদ্ধবিমান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে তেজসের সরাসরি যুদ্ধভূমিতে অনুপস্থিতি নিয়ে দেশটির গণমাধ্যমে সমালোচনা হয়েছে।
এই বাস্তবতায় পাকিস্তানের তুলনামূলকভাবে সফল যুদ্ধবিমান বাংলাদেশ কিনতে পারে, এটি ভারতের জন্য স্বস্তিকর হওয়ার কথা নয়। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, ভারতের প্রভাববলয়ে থাকা একটি দেশে পাকিস্তান কেন তাদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা সম্পদ রপ্তানিতে আগ্রহী হবে? যদি এমন কোনো চুক্তি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়, তবে তা হয়তো পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বাস্তবতা, নয়তো বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা কৌশলে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করবে।

