জাপানের প্রস্তাবিত আঞ্চলিক বাণিজ্য করিডোর একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে মাতারবাড়ী বন্দর ব্যবহার করতে দিলে বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পাবে?
একটি গভীর সমুদ্রবন্দর দেশের সমৃদ্ধির পথ খুলে দিতে পারে। তবে সেই বন্দরের উপযোগিতা নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর—বন্দরের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, খরচ কত, আর সুবিধা কারা পায়? বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে মাতারবাড়ীর মাধ্যমে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোকে সামুদ্রিক বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করার প্রস্তাব এসেছে। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
‘দ্য হিন্দু’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাপান এই বন্দরকে কেন্দ্র করে একটি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন গড়তে আগ্রহী। এটি বাংলাদেশের মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে যুক্ত করবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরের আগেই এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু প্রতিবেদনে বাণিজ্যিক শর্ত স্পষ্ট করা হয়নি। খরচ কীভাবে ভাগ হবে, তাও বলা নেই। বাংলাদেশ কী সুবিধা পাবে, সেটিও অস্পষ্ট।
এই না-বলা কথাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের একটি মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ। অন্যরা যেমন জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বাজার নিয়ে দর-কষাকষি করে, বাংলাদেশকেও একই মনোভাব নিয়ে প্রবেশাধিকার নিয়ে দর-কষাকষি করতে হবে। সরকারকে একটি বিষয় বুঝতে হবে—যেকোনো চুক্তির কারণে বাংলাদেশ বোঝা বইবে, আর ভারত কৌশলগত সুবিধা পাবে, তা ব্যাপক জনরোষ তৈরি করতে বাধ্য।
সংযোগ যখন আধিপত্যের হাতিয়ার
প্রতিবেশী অর্থনীতিগুলোর মধ্যে সংযোগ হলেই যে আধিপত্য তৈরি হয়, তা নয়। একটি সুপরিকল্পিত বন্দর বাংলাদেশের রপ্তানিকারক ও প্রতিবেশী দেশগুলো—দুই পক্ষই ব্যবহার করতে পারে। এতে বাংলাদেশ অনেক লাভবান হতে পারে। বেশি কার্গো এলে জাহাজ চলাচল, লজিস্টিকস ও বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
সমস্যা তৈরি হয় অসম ক্ষমতার ভিত্তিতে গড়া সহযোগিতায়। ধরা যাক, বাংলাদেশ আর্থিক ও পরিবেশগত দায়ের বড় অংশ নিল। আর ভারত কিছু না দিয়েই সস্তায় ও নির্ভরযোগ্যভাবে বন্দর ব্যবহার করল। তখন মাতারবাড়ী ভারতীয় আধিপত্যের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
চুক্তির শর্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি, তাই এটিকেই নিশ্চিত কিছু ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আধিপত্য মানেই ভূখণ্ডের মালিকানা নয়। বড় প্রতিবেশীর স্বার্থ যখন ছোট প্রতিবেশীর অবকাঠামো ও ব্যয়নীতি ঠিক করে দেয়, তখনো আধিপত্য তৈরি হতে পারে। বন্দর বাংলাদেশের এখতিয়ার ও নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারে। কিন্তু এর অর্থনৈতিক বিকাশের দিক অন্যরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।
তাই কিছু প্রশ্নের উত্তর দরকার। যেমন প্রবেশাধিকারের নীতি কে ঠিক করবে? শুল্ক বা দাম কে নিয়ন্ত্রণ করবে? অতিরিক্ত সক্ষমতা তৈরিতে কে বিনিয়োগ করবে? বাংলাদেশ কি নিজের শুল্ক ও নিরাপত্তাবিধি কার্যকর করতে পারবে? বাণিজ্যিকভাবে অলাভজনক হলে কী পরিবর্তন করার সুযোগ থাকবে?
খরচ কে বহন করবে
‘জাপানের অর্থায়নে’ কথাটির অর্থ স্পষ্ট করা দরকার। ঋণ নিয়ে অর্থায়ন করলে পরিশোধের দায় তৈরি হয়। এর মানে এই নয় যে, খরচ জাপান বহন করছে। জাইকার সরকারি প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে জাইকা ও বাংলাদেশ সরকার মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প (২)-এর জন্য ১০৫ দশমিক ৩৬২ বিলিয়ন ইয়েন পর্যন্ত ঋণচুক্তি করে। ঋণের শর্তগুলো হলো—পরিশোধের মেয়াদ ৩০ বছর। গ্রেস পিরিয়ড ১০ বছর। প্রকল্পের বার্ষিক সুদের হার ১ দশমিক ২ শতাংশ এবং পরামর্শক সেবার জন্য আলাদা অতিরিক্ত হার।
এটি মাত্র একটি ঋণ। এটি প্রকল্পের মোট খরচ নয়। এই ঋণ পরিশোধের দায় বাংলাদেশের। বন্দরের আয় এই বোঝা কমাতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু আয় অপর্যাপ্ত হলে ঝুঁকিতে পড়বে সরকারি খাত।
তাই প্রস্তাবিত আঞ্চলিক ব্যবস্থায় তিনটি বিষয় আলাদা করতে হবে—১. বাংলাদেশের নিজের উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। ২. বিদেশি ট্রানজিট সেবা দিতে প্রয়োজনীয় অতিরিক্ত অবকাঠামো। ৩. সেই ট্রানজিটের কারণে সৃষ্ট পরিচালন ব্যয়।
কিছু ভারতীয় কোম্পানি বন্দর ব্যবহার করবে বলে ভারতকে বাংলাদেশের বন্দরের পুরো নির্মাণ খরচ দিতে হবে, এমন নয়। একইভাবে শুধু ভারতের বাণিজ্যের জন্য বাংলাদেশকে বাড়তি সড়ক, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো, শুল্ক ভবন বা অন্যান্য স্থাপনা বানাতে হবে, এটাও ঠিক নয়।
এসব খরচ মেটাতে হবে আগে থেকে ঠিক করা ব্যবস্থায় বা অন্য কোনো পূর্বসম্মত পদ্ধতিতে।
সরকারকে পুরো অর্থায়ন-পরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে। এতে থাকতে হবে দেশীয় বিনিয়োগ, ঋণ, পরিচালন ব্যয় ও বাস্তবসম্মত আয়ের প্রাক্কলন। বন্দর, বিদ্যুৎকেন্দ্র, সড়ক ও ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের আলাদা আলাদা সুনির্দিষ্ট সংখ্যা-পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ। সব মিলিয়ে একটি বড় অঙ্ক দেখালে চলবে না।
ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ কী পাবে
প্রতিবেদনে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর নেই। বাংলাদেশকে ‘সেভেন সিস্টার্স’-এ যাওয়ার পথ হিসেবে ব্যবহার করার বিনিময়ে ভারত ঠিক কী দেবে? সম্ভাব্য লাভ অনেক; কিন্তু সম্ভাবনা মানেই তা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা নয়।
বন্দর ফি, পরিবহন আয়, গুদামভাড়া ও লজিস্টিকস সেবার আয় বাংলাদেশের হতে পারে। জাহাজ-সংযোগ ও শিল্প বিনিয়োগ বাড়লে বাংলাদেশি রপ্তানিকারকরাও লাভবান হবেন। তবে এসব লাভ নির্ভর করে কার্গোর পরিমাণ, মূল্য, অংশগ্রহণ ও বাজারে প্রবেশাধিকারের ওপর।
বাণিজ্যিকভাবে ন্যায্য একটি চুক্তিতে নিচের বিষয়গুলো থাকা উচিত :
- বাংলাদেশের স্বার্থ আলোচনায় যা নিশ্চিত করতে হবে
- আর্থিক টেকসই যে মাশুলে সংশ্লিষ্ট খরচ উঠে আসে এবং যুক্তিসংগত মুনাফাও থাকে
- অব্যবহৃত সক্ষমতা থেকে সুরক্ষা নির্ভরযোগ্য কার্গো-প্রতিশ্রুতি বা উপযুক্ত ঝুঁকি-ভাগাভাগির ব্যবস্থা
- দেশীয় কর্মসংস্থান বাংলাদেশি পরিবহনকারী, লজিস্টিকস প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক সুযোগ
- রপ্তানি বৃদ্ধি বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশাধিকারে বাস্তব ও বলবৎযোগ্য উন্নতি
- আঞ্চলিক প্রবেশাধিকার ভারতের ভেতর দিয়ে নেপাল ও ভুটানে ট্রানজিটের আলোচনাসাপেক্ষ সুযোগ
- অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ক্ষয়ক্ষতি, যানজট ও বাড়তি স্থাপনার জন্য ন্যায্য অবদান
- জাতীয় কর্তৃত্ব শুল্ক, পরিদর্শন, নিরাপত্তা ও প্রবেশের শর্তের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ
ট্রানজিট থেকে আয় শুধু আকর্ষণীয় রাজনৈতিক শিরোনামের জন্য ঠিক করা উচিত নয়। শুল্ক অতিরিক্ত বেশি হলে কার্গো আসা কমে যেতে পারে। অতিরিক্ত কম হলে বাংলাদেশের ভূগোলের অর্থনৈতিক মূল্য বিদেশি ব্যবহারকারীদের হাতে চলে যাবে। বাজার কত শুল্ক সইতে পারবে এবং বাংলাদেশের কত আদায় করা দরকার, তা স্বাধীন বিশ্লেষণের মাধ্যমে ঠিক করতে হবে।
আসল মাপকাঠি হলো নিট জাতীয় লাভ। হিসাব করতে হবে এসব বাদ দিয়ে—পরিচালন ব্যয়, ঋণের সুদ, রক্ষণাবেক্ষণ খরচ, পরিবেশগত বিবেচনা, অন্য খাতে সরকারি অর্থ ব্যবহারের হারানো সুযোগ।
করিডোর মানেই শিল্পোন্নত অর্থনীতি নয়
ইন্ডাস্ট্রিয়াল ভ্যালু চেইন ধারণাটি ভালোভাবে বোঝা দরকার। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য গেলেই বাংলাদেশে শিল্প গড়ে ওঠে না। একটি কনটেইনার বন্দর হয়ে সড়ক ধরে চলে যেতে পারে। পথে দেশের ভেতরে খুব সামান্য মূল্য সংযোজন হয়।
মাতারবাড়ী শিল্পায়নের মাধ্যম হতে হলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ লাগবে। বিনিয়োগ দরকার শিল্প, সরবরাহ-শৃঙ্খল, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও উদ্যোক্তা তৈরিতে। সরকারকে প্রশ্ন করতে হবেÑকারখানা কে বানাবে? দক্ষ শ্রমিক কে নিয়োগ দেবে? উচ্চমূল্যের উৎপাদন-ধাপের লাভ কে পাবে?
সীমান্তের ওপারে যদি উৎপাদন বাড়তে থাকে আর বাংলাদেশ শুধু ট্রানজিট পথ হয়ে থাকে, তাহলে লাভের ভাগাভাগি অসম থেকে যাবে। তাই জাপানের ভূমিকা মাপতে হবে বাংলাদেশের উৎপাদন-সক্ষমতায় তার বিনিয়োগ দিয়ে।
চুক্তিতে যা লিখিত থাকতে হবে
বাণিজ্যিক চলাচলের ওপর বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। চুক্তিতে স্পষ্ট করে নির্ধারণ করতে হবে—পণ্যের ধরন, পরিদর্শন প্রক্রিয়া, দায়বদ্ধতা, বীমা, পরিবেশগত বিষয় ও বিরোধ নিষ্পত্তির পদ্ধতি।
বাণিজ্যিক ট্রানজিট যেন গোপন নিরাপত্তাগত সুবিধা বা প্রবেশাধিকারের উৎস হয়ে না যায়।
বাংলাদেশের আরো কিছু অধিকার স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত থাকা উচিত—জরুরি অবস্থায় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার, নিজের আইন প্রয়োগের অধিকার এবং নির্দিষ্ট বিরতিতে শুল্ক পর্যালোচনার অধিকার।
এসব সুরক্ষা থাকলে বাণিজ্য অনির্ভরযোগ্য হয়ে যায় না। স্পষ্ট নিয়ম বরং বাণিজ্যকে শক্তিশালী করে, আবার সার্বভৌমত্বও রক্ষা করে। দুর্বলতা আসে অস্পষ্টতা থেকে, বিশেষ করে যখন এক পক্ষের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব অনেক বেশি।
মাতারবাড়ী বন্দর একাধিক অংশীদারের বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক ব্যবসার জন্যও খোলা থাকা উচিত। একটিমাত্র দেশের কার্গোর ওপর নির্ভর করলে বাংলাদেশের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে যেতে পারে। রাজনৈতিক বিপর্যয় ঘটলে প্রত্যাশিত আয়ও ঝুঁকিতে পড়বে।
সরকারকে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে
অসম চুক্তি নিয়ে জনরোষের সম্ভাবনা উপেক্ষা করলে সরকার বড় ভুল করবে। নাগরিকদের কিছু বিষয় জানার অধিকার আছে। যেমন : বিদেশিদের ব্যবসায়িক স্বার্থে সরকার কেন ঋণ নেবে? কেন সেই ঋণের গ্যারান্টি দেবে? বিনিময়ে দেশ কতটা কাজ ও অর্থ পাবে?
কোনো প্রকল্পে প্রতিশ্রুতি দেওয়ার আগে সরকারের উচিত জনগণকে চুক্তির শর্ত জানানো, যথাযথ সমীক্ষা করা এবং সংসদে আলোচনার সুযোগ দেওয়া।
প্রকাশিত বিবরণে থাকতে হবে রাজস্বের পরিমাণ, ঋণ, খরচের ভাগ এবং কার্গো প্রত্যাশামতো না এলে কী প্রভাব পড়বে।
আরো কিছু বিষয় আছে। যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হবে এবং যারা পরিবেশগত পরিবর্তনের ক্ষতি সইবে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। তাদের ন্যায্য ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।
ভারত কেন প্রবেশাধিকার চায়, তা বোঝা সহজ। জাপান কেন এই অঞ্চলে শিল্প-নেটওয়ার্ক চায়, তাও বোঝা সহজ। বাংলাদেশকেও নিজের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে ঠিক করতে হবে। যে প্রস্তাব দুই পক্ষের জন্য লাভজনক নয়, তা নতুন করে ভেবে দেখতে হবে। ভারতের সঙ্গে ভালো কূটনৈতিক সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে, কিছু না পেয়ে শুধু দিয়ে যেতে হবে।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের সাভানা স্টেট ইউনিভার্সিটি ব্যবসা, সাংবাদিকতা ও গণযোগাযোগ বিভাগের অধ্যাপক