গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার দীর্ঘ দুঃশাসনের অবসান ঘটাতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি এবং প্রায় ৩০ হাজার মানুষের পঙ্গুত্বের বিনিময়ে বাংলাদেশের মানুষ যে নতুন দিনের স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন ফিকে হয়ে আসছে। অন্তর্বর্তী সরকারও দেশকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে মোটাদাগে ব্যর্থ হয়েছে। শেষ দিকে অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ড ও গতিপথে দৃশ্যমান পরিবর্তন আসে বলে সমালোচকদের অনেকে মনে করেন।
তারপরও দেশের মানুষ আশা করেছিল, বিএনপি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে দেশকে নতুন পথে এগিয়ে নেবে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আশাও যেন ভঙ্গ হতে শুরু করেছে। গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন ও অর্থনৈতিক মুক্তির যে প্রত্যাশা নিয়ে মানুষ পরিবর্তন চেয়েছিল, সেসব ক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা নিয়ে ইতোমধ্যেই নানা প্রশ্ন উঠেছে।
অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, ক্ষমতা গ্রহণের এত অল্প সময়ের মধ্যে বিএনপি সরকার যেভাবে সমালোচনার মুখে পড়েছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরল। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরও সরকারের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড, নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ব্যর্থতা এবং গণতন্ত্র ও সুশাসন নিয়ে বিতর্ক জনমনে হতাশা তৈরি করেছে বলে সমালোচকদের অনেকে মনে করেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, ‘বিএনপি সরকার এত দ্রুত কেন পথ হারাল?’ এর পেছনে প্রধানত ছয়টি কারণ রয়েছে—
১. গণভোট নিয়ে বিএনপির অবস্থান
ইউনূস সরকারের ব্যর্থতা ভুলে গিয়ে দেশের মানুষ আশা করেছিল, গণভোটের রায় বাস্তবায়নের মাধ্যমে মৌলিক সংস্কার হবে এবং ৫৫ বছর পর বাংলাদেশ সঠিক পথে এগোনোর সুযোগ পাবে। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত গণভোটটি তাই ছিল রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে জনগণের বিশেষ প্রত্যাশার প্রতিফলন। নির্বাচনের আগে তারেক রহমান গণভোট নিয়ে প্রথম দিকে নীরব থাকলেও পরে এক জনসভায় ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে আহ্বান জানান। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির অনেক প্রার্থী গণভোটের পক্ষে প্রচার করেননি; কেউ কেউ ‘না’ ভোটের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে প্রায় ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ বৈধ ভোট ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে পড়ে।
কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো, গণভোটের রায়কে কার্যত অস্বীকার করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম বড় প্রতারণা করেছেন তারেক রহমান ও তার সরকার। শুধু তা-ই নয়, সরকারের অন্যতম সমালোচিত মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন, বিএনপি গণভোটে রাজি হয়েছিল শুধু জাতীয় নির্বাচন যেন পিছিয়ে না যায়, সেজন্য। তার এই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণার দালিলিক প্রমাণ বলে যে কেউ মনে করতে পারেন।
২. দেশব্যাপী চাঁদাবাজি, দখল ও দুর্নীতি
বিএনপি সরকার সবচেয়ে বেশি বিতর্কিত হয়েছে দলটির সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, তাদের পরিবারের সদস্য এবং কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও লুটপাটের অভিযোগে। এসব কর্মকাণ্ডের অভিযোগ নতুন নয়; ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বিকাল থেকেই বিভিন্ন স্থানে এ ধরনের অভিযোগ সামনে আসতে শুরু করে। সরকার গঠনের পরও অভিযোগের ব্যাপকতা নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। ঢাকা থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যবসায়ী, দোকানদার ও সাধারণ মানুষ চাঁদাবাজির চাপে অতিষ্ঠ। একটি দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে পুলিশের একটি গোয়েন্দা তালিকার বরাতে ঢাকার ৪৫টি থানার এলাকায় প্রায় ১ হাজার ২০০ চাঁদাবাজের কথা বলা হয়। তাদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় স্পষ্ট ১৯৭ জনের ১৮১ জন বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এরই মধ্যে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে একাধিক মন্ত্রীর ছেলে ও পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার কমিশন-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। খোদ ঢাকার মধ্যে রাড্ডা ক্লিনিক গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটিয়েছেন বিএনপির নেতারা। সরকারের সব পর্যায়ের নেতাকর্মীরা জড়িত থাকার কারণে এই সমস্যার সমাধান আশা করা বোকামি।
৩. সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ
সরকার গঠনের পরপরই বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ এবং সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগের অভিযোগ বিএনপি সরকারকে সমালোচনার মুখে ফেলে। সংবাদপত্রের খবর অনুযায়ী, সরকার ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেয়; তাদের সবাই বিএনপির নেতা ছিলেন—১১ জন কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এবং ৩১ জন জেলা পর্যায়ের নেতা। এছাড়া ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ১১টি সিটি করপোরেশনে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। (ডেইলি স্টার, ১৬ মার্চ ২০২৬)। নির্বাচন কমিশনসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে বিএনপির ১২ নেতা-কর্মীর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়েও সমালোচনা হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উপাচার্য, দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, ক্রিকেট বোর্ডের নিয়োগ—সবই দলীয় বিবেচনায় হয়েছে বলে অভিযোগ। এসব সিদ্ধান্ত দলীয়করণবিরোধী নির্বাচনি অঙ্গীকারের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক বলেই ’২৪-পরবর্তী বাংলাদেশে জনগণ এগুলোকে ভালোভাবে নিচ্ছে না।
৪. জননিরাপত্তার সংকট
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় ১১ হাজার ১৬৫টি মামলা হয়েছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৪০৪ জন নারী ও কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন; তাদের মধ্যে ৮৮ জন সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) চলতি বছরের ৭ জুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে অন্তত ৬০৫ জন নিহত হয়েছেন এবং নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ধর্ষণের ২০৯টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব পরিসংখ্যান জননিরাপত্তা ও নারী-শিশুর সুরক্ষা নিয়ে গভীর উদ্বেগের কারণ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ নিজেকে সফল দাবি করলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি তার ব্যর্থতার কারণে সবচেয়ে বেশি সমালোচনার শিকার হচ্ছেন।
৫. নতুন মোড়কে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন
হাসিনা সরকারের পতনের অন্যতম একটি কারণ ছিল মানুষের বাক্স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া। আইন করে সরকারের সমালোচনাকারীদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন করা। সরকার ছয় মাস না যেতেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন সংশোধনের প্রস্তাব করে হাসিনার পথ বেছে নিয়েছে। এরই মধ্যে অনেক বিরোধী দলের নেতাকর্মীকে প্রথমে গ্রেপ্তার করে তারপর মামলা দিয়ে নির্যাতন করেছে। এমনকি মিম তৈরি করলে এবং ফেসবুক পোস্টে লাইক-কমেন্ট করলেও গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএসএসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সাংবাদিকদের হয়রানি ও হামলার ২০০টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে ৩৮৩ জন সাংবাদিক আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে ৩৩ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে সাইবার নিরাপত্তা আইনে ১৫টি মামলা দায়েরের কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টার (বিজেসি) আয়োজিত আলোচনায় সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা বিশেষ করে ভুল তথ্য, মানহানি ও পরোয়ানা ছাড়া গ্রেপ্তার এবং অনলাইন কনটেন্ট সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ জানান। একটা গণতান্ত্রিক দেশে এটা কখনোই জনগণ মেনে নেবে না। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী দেশে সরকারের এ ধরনের আচরণ স্বৈরশাসনের নামান্তর।
৬. অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় ব্যর্থতা
বিএনপি সরকারের একটি বড় সংকট হলো অযোগ্য লোকদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া। খোদ বিএনপির মধ্যেই কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত চরম ক্ষোভ রয়েছে যে, গত ১৭ বছরে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাদের মূল্যায়ন না করে বিএনপির নেতৃত্ব টাকার বিনিময়ে সব ক্ষেত্রে অযোগ্য লোকদের সুযোগ দিয়েছে। সঠিক লোকদের সঠিক পদে না বসানোর কারণে কোনো টেকসই ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে সরকার। তারই ফলস্বরূপ বিদ্যুৎ, গ্যাসের সংকট ও দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতির কারণে খুব দ্রুত জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে দলটি। আশঙ্কাজনক বিষয় হচ্ছে, এস আলমসহ যেসব মাফিয়া অর্থনীতিকে লুট করেছে, বর্তমান সরকার সেসব মাফিয়াকে আবার বিভিন্নভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া।
রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পরে প্রায় ২০ কোটি জনগণ যে দেশের আশায় বুক বেঁধেছিল, বিএনপি সরকার তা প্রায় ছয় মাসেই ভেঙে দিয়েছে।
আমি মনে করি, এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। শেষ সুযোগটা চাইলে সরকার এখনো নিতে পারে। আর সেই সুযোগটা হলো, গণভোটের গণরায় মেনে নিয়ে সব মৌলিক সংস্কার বাস্তবায়ন করা, দুর্নীতিগ্রস্ত ও অসৎ মন্ত্রী-এমপিদের অবিলম্বে বাদ দিয়ে জিয়াউর রহমানের মতো সব জায়গায় সৎ ও যোগ্য লোক নিয়োগ দেওয়া এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের সংশোধনীর প্রস্তাব বাদ দিয়ে জনগণের বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
এই কাজগুলো করতে ব্যর্থ হলে এই সরকারের করুণ পতন অনিবার্য। আর সেটা দেশের জন্য করুণ পরিণতি ডেকে আনবে। সিদ্ধান্ত এখন সরকারের—তারা কি এই ভুল পথেই হাঁটবে, নাকি জিয়াউর রহমানের আদর্শের পথে হাঁটবে?
লেখক: উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়া, কানাডা