
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি মৌলিক শিক্ষা হলো, সংবিধান কোনো মৃত দলিল নয়; সে সমাজের সঙ্গে বেড়ে ওঠে, বদলায়, আবার প্রয়োজনে নিজেকে সংযতও রাখে। কে. সি. হুইয়ার (K. C. Wheare) তার ‘মডার্ন কনস্টিটিউশনস’ গ্রন্থে দেখিয়েছেন, ভালো সংবিধান পরিবর্তনের পথ খোলা রাখে অথচ ক্ষণস্থায়ী উত্তেজনার হাতে খেলনা হয়ে যায় না। জেমস ব্রাইস (James Bryce) সংবিধানকে নমনীয় (flexible) ও অনমনীয় (rigid)—এই দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন। যে সংবিধান সাধারণ আইনের মতো সহজে বদলানো যায়, তা ক্ষণিকের সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধীন; আর যে সংবিধান একেবারে অনড়, তা একদিন বিস্ফোরিত হয়। টমাস জেফারসন বিশ্বাস করতেন, প্রতিটি প্রজন্মের নিজের সংবিধান রচনার অধিকার আছে। জেমস ম্যাডিসন (James Madison) ‘ফেডারালিস্ট’ প্রবন্ধে যুক্তি দিয়েছিলেন, সংশোধনের পদ্ধতি এমন হতে হবে, যা অতি সহজও নয়, অতি কঠিনও নয়; সহজ হলে সংবিধান অস্থিতিশীল হয়, কঠিন হলে আবিষ্কৃত ত্রুটিও চিরস্থায়ী হয়ে যায়।
তাত্ত্বিক বিচারে রাষ্ট্রগুলো সাধারণত দুটি পথে সংবিধান পরিবর্তন করে। প্রথম পথ হলো সংশোধন (Amendment)—অর্থাৎ বিদ্যমান কাঠামোর ভেতরে থেকে সংবিধানে নির্ধারিত পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা। দ্বিতীয় পথ হলো নতুন করে রচনা (Rewrite), যেখানে গণপরিষদ বা সংবিধান সভার মাধ্যমে জাতি নতুন একটি মৌলিক চুক্তিতে উপনীত হয়। ১৯৫৮ সালের ফ্রান্স কিংবা ১৯৯৬ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা দ্বিতীয় পথের উদাহরণ। আবার ভারতের সুপ্রিম কোর্ট কেশবানন্দ ভারতী মামলায় (১৯৭৩) ‘মৌলিক কাঠামো’ (Basic structure) তত্ত্বের মাধ্যমে বলেছে, সংশোধনের ক্ষমতা যত বিস্তৃতই হোক, সংবিধানের আত্মাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা তার নেই। জার্মানির মৌলিক আইনেও কিছু নীতিকে চিরন্তন ধারার (Eternity clause) মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ সংস্কার না সংশোধন, প্রশ্নটি শুধু শব্দের নয়; প্রশ্নটি হলো, কার ক্ষমতায়, কোন প্রক্রিয়ায় এবং কতটা জনসম্মতিতে সংবিধান বদলাবে।
বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা এ প্রশ্নের গুরুত্ব স্পষ্ট করে। ১৯৭২ সালে যে সংবিধান প্রণীত হয়েছিল, তার ১৪২ অনুচ্ছেদে সংশোধনের পদ্ধতি নির্ধারিত ছিল। পরবর্তীকালে সংবিধানের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিধান বদলানোর ক্ষেত্রে শুধু সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা যথেষ্ট থাকেনি; জনগণের সরাসরি সমর্থনের প্রমাণ হিসেবে গণভোটের (Referendum) শর্ত যুক্ত হয়েছিল। এর দর্শনটি সরল ছিল : সংবিধান যেহেতু জনগণের নামে রচিত, সেহেতু এর মৌলিক অংশ বদলাতে হলে জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার পরে গণভোটের সেই শর্ত তুলে দেয় এবং গণভোট ছাড়াই সংবিধানে বড় বড় পরিবর্তন আনা হয়। ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ক্ষমতার ওপর জনসম্মতির যে প্রাচীরটি দাঁড়িয়েছিল, তা ভেঙে পড়ে। এই ইতিহাস আমাদের শেখায়, সংবিধান সংশোধনের প্রক্রিয়ায় সংখ্যার জোর একা যথেষ্ট নয়; বৈধতার (Legitimacy) প্রশ্নটিও সেখানে সমান জরুরি।
এই প্রেক্ষাপটেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসের তৃতীয় পর্ব হিসেবে হাজির হয়েছে। প্রথম পর্ব ছিল স্বাধীনতা ও ১৯৭২ সালের সংবিধান, দ্বিতীয় পর্ব ছিল সংশোধনীর ধারাবাহিকতায় সেই সংবিধানের রূপান্তর আর তৃতীয় পর্বে জুলাইয়ের মানুষ চেয়েছে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রব্যবস্থাকে মেরামত করতে। সেই লক্ষ্যে জুলাই সনদের ভিত্তিতে একটি রাজনৈতিক ঐকমত্য (Political consensus) গড়ে উঠেছিল। কিন্তু সেই ঐকমত্য ছিল অসম্পূর্ণ। কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত দিয়েছিল আর সেই ভিন্নমত কখনো মীমাংসিত হয়নি। আমার মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের উচিত ছিল সেই পর্যায়েই নোট অব ডিসেন্টকে ডিসেন্ট না রেখে একটি সম্মত সূত্রে (Consensus formula) নিয়ে আসা। সেটি হয়নি। দ্বিতীয় ঘাটতিটি আরো গুরুতর : সনদ কোন প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়িত হবে, সে কথা স্পষ্ট করা হয়নি। ধরে নেওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতে যারা নির্বাচিত হবেন, তারাই সংবিধান বদলাবেন। আজকের বিতর্কের শিকড় এই দুই ফাঁকেই প্রোথিত।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিএনপি বাংলাদেশের বিপুল জনসমর্থনপুষ্ট একটি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন নিয়ে গঠিত একটি নির্বাচিত সরকারের ইচ্ছা, কর্মপদ্ধতি, আদর্শ ও লক্ষ্য সংবিধানে প্রতিফলিত হবে, এটাই স্বাভাবিক। তাই বিএনপি যে পথে হাঁটছে, তা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বিএনপি বলছে, জুলাই সনদ তারা অক্ষরে অক্ষরে পালন করবে; তবে যেসব বিষয়ে তাদের নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলোতে নৈতিকভাবে তারা বাধ্য নয়—এ দাবিও তারা যুক্তিসংগতভাবেই করতে পারে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের প্রশ্নেও একই কথা প্রযোজ্য। সংস্কার পরিষদ নাম দিয়ে সংবিধানকে আরো বৃহত্তর পরিসরে বদলানোর যে ভাবনা, তাতে বিএনপি কখনো সমর্থন দেয়নি। আমাদের লোকবচনে যেমন বলা হয়, এ যেন ‘লাউ আর কদুর’ তফাত। আবার কেউ কেউ বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের স্থিতিশীলতা ও নির্বাচন নিশ্চিত করতে বিএনপি তখন কৌশলগত সম্মতি জানিয়েছিল। রাজনৈতিক দলের কৌশল তার কর্মসূচিরই অংশ; সেখানে নৈতিকতা বা অনৈতিকতার প্রশ্ন তোলার অবকাশ নেই। স্থিতাবস্থা রক্ষার যে অভিযোগ বিএনপির বিরুদ্ধে তোলা হচ্ছে, আমার বিবেচনায় তা যথার্থ নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানে একটি প্রচলিত কথা আছে, ‘পাবলিক ওপিনিয়ন ইজ নেইদার পাবলিক নর ওপিনিয়ন’ (Public opinion is neither public nor opinion)। জুলাই সনদ আইনগতভাবে গৃহীত হয়েছে, কিন্তু যে জনগণের নামে আজ এর বাস্তবায়ন দাবি করা হচ্ছে, তারা কি এর ধারা-উপধারা ও বিস্তৃত বিষয়বস্তু জানে? তারা কী বোঝে, কী খবর রাখে? বাস্তবতা হলো, জনগণের সম্মতি এখানে অনেকটাই ধরে নেওয়া (Presumed)। জনমতের দিকনির্দেশ সেখানে অস্পষ্ট। এর বিপরীতে বিএনপি জনগণের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে ঘোষিত একত্রিশ দফা নিয়ে গিয়েছিল এবং আস্থা অর্জন করেছে। সেই একত্রিশ দফায় সংবিধান সংশোধনের কথা স্পষ্ট বলা আছে। সংকীর্ণ দলীয়করণের ঊর্ধ্বে উঠে সব রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা আছে, আইনি সংস্কারের মাধ্যমে সেসব প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা আছে, সংসদীয় কমিটির শুনানি ও ভেটিংয়ের পর গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পদে নিয়োগের কথা আছে। বিচার বিভাগ নিয়ে অঙ্গীকার আরো পরিষ্কার : মাসদার হোসেন মামলার রায়ের আলোকে বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হবে, একটি জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা হবে, অধস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও শৃঙ্খলা সুপ্রিম কোর্টের হাতে ন্যস্ত থাকবে, সুপ্রিম কোর্টের জন্য পৃথক সচিবালয় থাকবে, বিচারপতিদের অভিশংসনে সংবিধান-বর্ণিত সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা হবে এবং সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদের আলোকে সুনির্দিষ্ট যোগ্যতা ও মানদণ্ডের ভিত্তিতে বিচারপতি নিয়োগের আইন হবে। অতীতে এই সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের প্রশ্নে যে সংকট ঘনিয়ে এসেছিল, প্রধান বিচারপতিকে পর্যন্ত যে বিদায় নিতে হয়েছিল, তা আমাদের স্মৃতিতে আছে। বলা যায়, সুপ্রিম কোর্টের আদেশ বা অধ্যাদেশ বাতিল নয়, বরং তাকে আরো সুন্দর ও শক্তিশালী করাই বিএনপির বক্তব্য।
এখানে লক্ষণীয় যে, নীতিগত প্রশ্নে বিএনপি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বড় কোনো বিরোধ নেই। বিএনপি নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মাধ্যমে ভোটের অধিকার ও স্বচ্ছ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চায়। প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার নির্বাহী ক্ষমতার সঙ্গে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার চেক অ্যান্ড ব্যালান্স (Checks and Balances) প্রতিষ্ঠার প্রশ্নেও দলের ভেতরে কোনো দ্বিমত নেই; নির্বাহী, আইন ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা এবং দায়িত্বের সুসমন্বয়ও সেই ভাবনারই অংশ। কেউ পরপর দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, এ বিষয়েও বিএনপি দ্বিমত পোষণ করে না। আর বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থার পাশাপাশি বিশিষ্ট নাগরিক, শিক্ষাবিদ, পেশাজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, সমাজবিজ্ঞানী ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাবও আছে। এই চারটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তেমন কোনো সংঘাত নেই। সংঘাত বাস্তবায়নের পদ্ধতিতে। উচ্চকক্ষ কীভাবে নির্বাচিত হবে? বিএনপির প্রস্তাব, সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টনের ধাঁচে ভারসাম্যমূলক অনুপাতে রাজনৈতিক দলগুলো আসন পাবে। জামায়াত ও অন্যান্য দল দাবি করছে, আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর (Proportional Representation) পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হতে হবে। এই পার্থক্য প্রক্রিয়াগত, মৌলিক নয়। অথচ দুঃখজনক হলো, সংসদের ভেতরে এর সমাধান খোঁজার বদলে দলগুলো রাজপথে নেমেছে। তবে একে ভিন্নভাবেও দেখা যায়। অনেকের মতে, এই লংমার্চ সরকার পতনের লক্ষ্যে নয়; বরং সংসদীয় পদ্ধতিকে এগিয়ে নেওয়ার দাবিই এর ভেতরে কাজ করছে, আর সেটি একটি ভালো লক্ষণ। আলজাজিরাও মন্তব্য করেছে, সরকারি ও বিরোধী দলের এই বিতর্ক অনেকটাই অপ্রয়োজনীয়; দলগুলোকে আলোচনার টেবিলেই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে।
বিরোধী দলগুলো যখন জুলাই সনদের ভিত্তিতে ‘সংস্কারের’ কথা বলে, আর বিএনপি যখন ‘সংশোধনের’ কথা বলে, তখন দুইয়ের মধ্যকার ব্যবধান আপাতদৃষ্টিতে যত বড় মনে হয়, বাস্তবে তত নয়। সূক্ষ্মভাবে বিচার করলে দেখা যায়, বিষয় দুটি পরস্পরের পরিপূরক, সাংঘর্ষিক নয়। গণভোটের প্রশ্নটিও সেই আলোকেই দেখা দরকার। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ এখন নতুন করে সংযোজিত, ফলে সরকার ইচ্ছা করলে যেকোনো সময় গণভোট দিতে পারে। আইনগত অধিকার তার আছে। কিন্তু একজন রাষ্ট্রবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, নতুন করে আরেকটি গণভোটের পথে যাওয়া অপ্রয়োজনীয়। এর আগে একটি গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে; তার বিপরীতে আরেকটি গণভোট দৃষ্টিকটু দেখাবে, অর্থের অপচয় ঘটাবে এবং রাজনৈতিক বিতর্ককে আরো উসকে দেবে। তার চেয়ে বিএনপির উচিত সব কৌশল, সব মেধা ও সব উদ্যোগ ব্যয় করে বিরোধী দল এবং সুশীল সমাজকে একত্র করা এবং আলোচনার ভিত্তিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন করা। সংবিধান সংশোধন কমিটিতে বিরোধী দলগুলোর জন্য পাঁচটি আসন রাখা হয়েছে, কিন্তু তারা তা গ্রহণ করেনি; নিজেদের দাবিতে অটল রয়েছে। এই অনমনীয়তা জাতীয় ঐক্যের পরিপূরক নয়। সরকার ও বিরোধী দলের পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সুসম্পর্কের মধ্য দিয়েই এই সংকটের সমাধান হতে হবে। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স শুধু সংবিধানের অনুচ্ছেদে নয়, সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্কের ভেতরেও থাকা চাই।
ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ লর্ড হেইলশাম (Lord Hailsham) একদা ‘নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র’ (Elective Dictatorship) শব্দবন্ধে সতর্ক করেছিলেন, নির্বাচনের ম্যান্ডেট যদি সংযমহীন হয়, তবে সংসদীয় গণতন্ত্রও একপ্রকার স্বৈরতন্ত্রে গড়িয়ে যেতে পারে। বিএনপির সামনে তাই সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো, নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে—এমন ধারণার অবকাশ না রাখা। জনমতের ভিত্তিতে, সুপারিশ ও পরামর্শের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধিত হওয়াই শ্রেয়। মূল কথা হলো, রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সংস্কার করে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা কায়েম করা। এই জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব বিএনপি অতীতেও করেছে, আজও সেই আলোকেই সংশোধন করতে চাইছে। সেই লক্ষ্যে সংস্কার ও সংশোধনকে প্রতিপক্ষ না ভেবে দুটিকে একই যাত্রার দুই পাটাতন ভাবাই বিবেচকের কাজ। কারণ, সংখ্যাগরিষ্ঠতা বৈধ ক্ষমতা দেয়, কিন্তু সর্বজনগ্রাহ্যতা দেয় না; সর্বজনগ্রাহ্যতা অর্জন করতে হয় সংলাপ, সহনশীলতা আর পারস্পরিক বিশ্বাসের মধ্য দিয়ে। যে সংবিধান শুধু একটি দলের আস্থায় দাঁড়ায়, সে দল বদলালেই কেঁপে ওঠে; আর যে সংবিধান সব পক্ষের সম্মতিতে দাঁড়ায়, সে সরকার বদলালেও অটল থাকে। ইতিহাসের শিক্ষা এটাই।
সংবিধান একটি জাতির সবচেয়ে গভীর প্রতিশ্রুতি। সে এক মিনিটের জন্য রচিত হয় না; সে রচিত হয় চিরকালের জন্য, অনাগত প্রজন্মের জন্য। আজ যারা ক্ষমতায় আছেন আর যারা ক্ষমতার বাইরে, উভয়ই একদিন ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়াবেন, এই প্রশ্ন নিয়ে : তোমরা কি আমাদের জন্য একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র রেখে গেলে? জুলাইয়ে যারা প্রাণ দিয়েছেন, তারা কোনো দলের পতাকা নয়, একটি ন্যায়সংগত রাষ্ট্রের স্বপ্ন নিয়ে রাজপথে নেমেছিলেন। সেই স্বপ্নের প্রতি সম্মান জানাতে হলে বিরোধিতার মাঝেই ঐক্যের সেতু খুঁজে নিতে হবে। নদীর দুই পাড় যত দূরেই থাকুক, তাদের মাঝখানে একই স্রোত বয়ে যায়। সেই স্রোতের নামই জাতীয় ঐকমত্য।
লেখক : রাজনীতি বিশ্লেষক, সাবেক অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়