গণঅভ্যুত্থানের পর একটি দেশে যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবর্তন আসে, তা যেমন নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে, তেমনি মারাত্মক বিশৃঙ্খলা ও অনিশ্চয়তার সৃষ্টি করতে পারে। ইতালীয় দার্শনিক অ্যান্তোনিও গ্রামশি অন্তর্বর্তীকালীন সংকটের ধারণায় বলেছেন, পুরোনো ব্যবস্থা মারা যাচ্ছে, কিন্তু নতুন ব্যবস্থার জন্ম হতে পারছে না; এই অন্তর্বর্তী সময়ে নানা ধরনের রোগাক্রান্ত লক্ষণ (Morbid Symptoms) দেখা যায়। গণঅভ্যুত্থানের পর দুই বছর চলে গেলেও সেই বিশৃঙ্খলা ও শূন্যতা যেন পূরণ করা যাচ্ছে না। গণঅভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া লাখো মানুষ আশা করেছিল নিপীড়নমূলক স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের অবসানের মধ্য দিয়ে পুরোনো ব্যবস্থার পরিবর্তন হবে। মানুষের আকাঙ্ক্ষা থাকলেও নতুন ব্যবস্থা জন্ম নিতে পারছে না। দিন দিন যেন সেই আশা ফিকে হয়ে আসছে। কিন্তু পুরোনো ব্যবস্থা থেকে যে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা আরো নানা মাত্রায় দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনাপ্রবাহ থেকে আমরা এই লক্ষণগুলো দেখতে পাচ্ছি।
দেড় দশকের রাজনৈতিক আন্দোলনের ব্যর্থতার পর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে তরুণদের চাকরির আকাঙ্ক্ষা থেকে গড়ে উঠেছিল হাসিনাবিরোধী গণআন্দোলন। নির্যাতিত বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা এই আন্দোলনে যোগ দিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল। বহু রাজনৈতিক নেতাকর্মী নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছিল দুঃশাসনের অবসানের জন্য। কিন্তু এই আন্দোলন হয়েছিল একটি অরাজনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে। শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসেছিল কোটা প্রথার নামে দলবাজি ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে সরকারি চাকরির নিয়োগের অবসানের দাবিতে। তারা স্লোগান দিয়েছিল—‘কোটা নয় মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ চাই।’
এই তরুণরা দেখছে, দুই বছরের মাথায় আবার সরকারি চাকরিতে মেধার বদলে ভিন্নরকম এক কোটার মধ্যে তাদের ঢোকানো হচ্ছে। সরকার যেন তরুণদের মনের ভাষা আর পড়তে পারছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। সেই পরীক্ষা নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি ১৪ হাজার ৩৮৪ শিক্ষক নিয়োগের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হয়। নির্বাচন ও সরকার পরিবর্তনের কারণে এই শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়। শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে তাদের যোগদানের নিয়োগপত্র দেওয়া হয়। এরপর দেখা দেয় গোলমাল। সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে এখনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি। পুলিশ ভেরিফিকেশন রিপোর্টের কারণে তাদের নিয়োগ আটকে আছে। প্রশ্ন হলো, পুলিশ ভেরিফিকেশনে কী এমন তথ্য পাওয়া গেছে, যার কারণে বিপুলসংখ্যক তরুণের নিয়োগ আটকে গেল? যদি কোনো ব্যক্তি ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত না থাকেন বা মামলা না হয়, তাহলে এ দেশের কোনো নাগরিকের যোগ্যতা থাকার পরও কি চাকরি থেকে বঞ্চিত করা যায়? না যায় না। এভাবে কোনো নিয়োগ আটকে দেওয়া স্পষ্টভাবে একজন নাগরিকের অধিকারের লঙ্ঘন।
নিয়োগপত্র না পাওয়া অনেক তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকারবিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন কিংবা সমর্থক ছিলেন, এ কারণে তাদের বাদ দেওয়া হয়েছে। আবার কারো পরিবারের কোনো সদস্য বিরোধী রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাকেও বাদ দেওয়া হয়েছে । প্রশ্ন হলো, বিরোধী দলের রাজনীতি করা বা সমর্থন করা কি বাংলাদেশের কোনো আইনে অপরাধ? বিরোধী দল সমর্থন করলে তিনি যে সরকারি দায়িত্ব পালনে অযোগ্য হবেন, এ সিদ্ধান্ত কীভাবে একজন পুলিশ কর্মকর্তা নিতে পারেন। একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার সব মানুষের সরকার। যারা ক্ষমতাসীন দলকে ভোট দেয়নি তাদেরও সরকার। এবারের নির্বাচনে ৩৮ শতাংশ মানুষ বিরোধী দলকে ভোট দিয়েছে। তাহলে তারা কি সবাই সরকারের শত্রু। আরো ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, সরকারি চাকরির নিয়োগের সব প্রক্রিয়াকে দলীয় বিবেচনার মধ্যে ফেলা হচ্ছে।