দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যখন দৃশ্যমান অভিযান শুরু করে, তখন সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তির একটি অনুভূতি জন্ম নেয়। দীর্ঘদিন ধরে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুস, কমিশন বাণিজ্য কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দৌরাত্ম্যে অতিষ্ঠ মানুষ বিশ্বাস করতে চান—অবশেষে হয়তো পরিবর্তন আসছে। অভিযানের খবর, গ্রেফতার, তল্লাশি, অবৈধ সম্পদের হিসাব কিংবা প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান জনমনে আশার সঞ্চার করে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে আসে—এসব অভিযান কি কেবল দৃশ্যমানতা সৃষ্টি করছে, নাকি সত্যিই দুর্নীতির শিকড়ে আঘাত হানতে সক্ষম হচ্ছে?
বাংলাদেশে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান নতুন কোনো বিষয় নয়। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সরকার প্রশাসনিক শুদ্ধি অভিযান, বিশেষ অভিযান কিংবা দুর্নীতিবিরোধী কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। কখনো উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা, কখনো রাজনৈতিক নেতা, কখনো ব্যবসায়ী, আবার কখনো স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক ফলও দেখা গেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দুর্নীতির সামগ্রিক চিত্রে মৌলিক পরিবর্তন খুব কমই লক্ষ্য করা গেছে। এর অর্থ এই নয় যে অভিযান অপ্রয়োজনীয়; বরং এটি প্রমাণ করে, অভিযান একা কখনোই দুর্নীতি নির্মূলের কার্যকর উপায় হতে পারে না।
দুর্নীতি মূলত একটি ব্যক্তিগত অপরাধ নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সমস্যা। কোনো ব্যক্তি ঘুস নিলে তাকে শাস্তি দেওয়া অবশ্যই জরুরি। কিন্তু সেই ব্যক্তি কেন ঘুস নেওয়ার সুযোগ পেলেন, কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়ে গেল, কেন জবাবদিহি দুর্বল, কেন নজরদারি কার্যকর হলো না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের না করলে দুর্নীতি নতুন মুখ নিয়ে আবার ফিরে আসবে।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন সংবাদ শিরোনামে শুধু গ্রেফতারের ছবি থাকবে না; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার গল্প থাকবে, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগ ক্রমশ কমে এসেছে। দৃশ্যমান অভিযানের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অদৃশ্য কিন্তু টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। কারণ অভিযান মানুষের মনে আশা জাগায়, কিন্তু স্থায়ী সংস্কারই সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দেয়।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখানেই। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা হলেও দুর্নীতি সংঘটিত হওয়ার পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে। ফলে ব্যক্তি বদলায়, কিন্তু ব্যবস্থা বদলায় না। ফলাফল হয় সাময়িক; স্থায়ী নয়।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বহু বছর ধরে বলে আসছে, দুর্নীতি কমাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রাপ্তির স্বাধীনতা, কার্যকর বিচারব্যবস্থা, স্বাধীন গণমাধ্যম এবং নাগরিক অংশগ্রহণ। যে দেশগুলো দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলকভাবে সফল—যেমন ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড কিংবা সিঙ্গাপুর—সেখানে দুর্নীতিবিরোধী লড়াই মূলত প্রতিষ্ঠানভিত্তিক। ব্যক্তি পরিবর্তনের চেয়ে নিয়ম ও ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করাই সেখানে অগ্রাধিকার পেয়েছে।
সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। স্বাধীনতার পর দেশটি দুর্নীতিতে জর্জরিত ছিল। কিন্তু তারা শুধু দুর্নীতিবাজদের শাস্তি দেয়নি; একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কাঠামো বাস্তবসম্মত করেছে, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে, তদন্ত সংস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখেছে এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিরপেক্ষ করেছে। ফলে দুর্নীতি দমনের সংস্কৃতি রাষ্ট্রের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কার্যকারিতা বাড়াতে হলে একই ধরনের কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। কারণ দুর্নীতির উৎস অনেক ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক জটিলতা, অস্বচ্ছতা এবং অতিরিক্ত ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ। একটি লাইসেন্স, একটি অনুমোদন, একটি জমির নথি কিংবা একটি সরকারি সেবা পেতে যদি নাগরিককে অপ্রয়োজনীয়ভাবে বহু স্তর অতিক্রম করতে হয়, তাহলে দুর্নীতির সুযোগ স্বাভাবিকভাবেই সৃষ্টি হয়।
বিশ্বব্যাংক এবং ওইসিডি (OECD)-এর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ডিজিটাল সেবা ও ই-গভর্ন্যান্স প্রশাসনিক দুর্নীতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে সক্ষম। কারণ প্রযুক্তিনির্ভর সেবায় ব্যক্তিনির্ভর যোগাযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত হয় এবং জবাবদিহি বাড়ে। বাংলাদেশে অনলাইনে ভূমি সেবা, ই-জিপি, কর প্রদান, পাসপোর্ট, জন্মনিবন্ধনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। তবে এখনো বহু খাতে ডিজিটাল ব্যবস্থার পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক প্রভাব ও দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রযুক্তি তখনই কার্যকর হবে, যখন সেটি প্রশাসনিক সংস্কারের সঙ্গে সমন্বিত হবে।
দুর্নীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র সরকারি ক্রয়, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন। আন্তর্জাতিকভাবে দেখা গেছে, সরকারি ব্যয়ের পরিমাণ যত বেশি, সুশাসনের প্রয়োজনও তত বেশি। বড় প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, সময়ক্ষেপণ, নিম্নমানের কাজ কিংবা কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই করে না; রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থাও দুর্বল করে। তাই প্রকল্প অনুমোদন থেকে বাস্তবায়ন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে স্বাধীন নিরীক্ষা, উন্মুক্ত তথ্যপ্রকাশ এবং নাগরিক নজরদারির ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।
দুর্নীতিবিরোধী লড়াইয়ে স্বাধীন গণমাধ্যমের ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বহু দেশে বড় বড় দুর্নীতির ঘটনা প্রকাশ করেছে। একইভাবে তথ্য অধিকার আইন, উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার এবং হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা আইনের কার্যকর প্রয়োগ দুর্নীতি প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। যে কর্মকর্তা বা নাগরিক দুর্নীতির তথ্য প্রকাশ করেন, তিনি যদি নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন, তাহলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ কখনোই শক্তিশালী হবে না।
এখানে রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রশ্নও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান তখনই বিশ্বাসযোগ্য হয়, যখন আইনের প্রয়োগ ব্যক্তি, দল বা পরিচয়ভেদে ভিন্ন হয় না। আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর না হয়, তাহলে জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হয়। আইনের নিরপেক্ষতা দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের সবচেয়ে বড় শক্তি।
দুর্নীতি কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি নৈতিকতারও সংকট। একটি সমাজে যখন মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করে যে ঘুস ছাড়া কাজ হয় না, প্রভাব ছাড়া অধিকার পাওয়া যায় না কিংবা অনিয়মই সাফল্যের সহজ পথ, তখন দুর্নীতি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়। এই সংস্কৃতি ভাঙতে হলে পরিবার, শিক্ষা, গণমাধ্যম, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান—সবাইকে ভূমিকা রাখতে হবে। সততা শুধু পাঠ্যবইয়ের নৈতিক শিক্ষা নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনারও মৌলিক দর্শন হওয়া উচিত।
জাতিসংঘের দুর্নীতিবিরোধী কনভেনশন (UNCAC) স্পষ্টভাবে বলেছে, দুর্নীতি প্রতিরোধে দমনমূলক ব্যবস্থা যেমন জরুরি, তেমনি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগই ক্রমাগত সংকুচিত হবে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। তদন্ত সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বাড়ানো, সরকারি সেবায় পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল রূপান্তর, সম্পদ বিবরণীর কার্যকর যাচাই, সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, স্থানীয় সরকারে সামাজিক নিরীক্ষা, নাগরিক অভিযোগ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ এবং দুর্নীতির মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বিশেষায়িত আদালতের সক্ষমতা বাড়ানো—এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
এর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মসম্পাদন মূল্যায়নকে আরও কার্যকর করতে হবে। যে কর্মকর্তা সততার সঙ্গে কাজ করবেন, তাঁকে যেমন স্বীকৃতি দিতে হবে, তেমনি অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে হবে। পুরস্কার ও শাস্তির এই ভারসাম্য ছাড়া কোনো প্রশাসনিক সংস্কার দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
অর্থনীতিবিদ ডগলাস নর্থ বলেছিলেন, একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর গুণগত মানের ওপর। এই বক্তব্য বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য। দুর্নীতিবিরোধী অভিযান যদি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের পথে এগিয়ে না যায়, তাহলে তা সাময়িক আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে; কিন্তু ইতিহাস বদলাতে পারবে না।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনগণের প্রত্যাশা শুধু কয়েকটি আলোচিত অভিযান নয়; তারা এমন একটি রাষ্ট্র দেখতে চায়, যেখানে ন্যায়বিচার কেনাবেচার বিষয় নয়, সরকারি সেবা ঘুসের ওপর নির্ভর করে না, যোগ্যতা প্রভাবের কাছে পরাজিত হয় না এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে কার্যকর থাকে। এই প্রত্যাশা পূরণ করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়।
দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সাফল্য তখনই আসবে, যখন সংবাদ শিরোনামে শুধু গ্রেফতারের ছবি থাকবে না; বরং এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার গল্প থাকবে, যেখানে দুর্নীতি করার সুযোগ ক্রমশ কমে এসেছে। দৃশ্যমান অভিযানের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অদৃশ্য কিন্তু টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। কারণ অভিযান মানুষের মনে আশা জাগায়, কিন্তু স্থায়ী সংস্কারই সেই আশাকে বাস্তবে রূপ দেয়। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎও নির্ভর করবে এই মৌলিক সত্যটি আমরা কত দ্রুত উপলব্ধি করতে পারি তার ওপর।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।