Image description

সায়েদুল আশরাফ কুশল

 

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে এক গভীর ও উদ্বেগজনক সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একদিকে শিশু-কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে, তারা জড়িয়ে পড়ছে কিশোর গ্যাং থেকে শুরু করে ভয়ংকর সব অপরাধে; অন্যদিকে শিশুরাই সবচেয়ে বেশি হত্যা, ধর্ষণ ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। অর্থাৎ, শিশু-কিশোররা একইসঙ্গে অপরাধী এবং অপরাধের শিকার—উভয় দিক থেকেই এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

 

একজন মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ হিসেবে সমাজের এই অবক্ষয়ের পেছনে আমি বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ এবং এর থেকে উত্তরণের পথ দেখতে পাই।

 

কিশোররা কেন অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠছে?

 

শিশু-কিশোরদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পেছনে মূল কারণগুলোকে আমি কয়েকটি ভাগে দেখি। প্রথমত, পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তন এবং সন্তানকে সময় দিতে না পারা। বর্তমান সময়ে অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রয়োজনে বাবা-মা দুজনেই চাকরি করছেন, যা মোটেও খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন দিনের একটি দীর্ঘ সময় সন্তান অভিভাবকহীন থাকে। আমাদের সমাজে সাধারণত ঘরের কাজের দায়িত্ব শুধু মায়ের ওপরই বর্তায়। একজন কর্মজীবী মা দিনশেষে ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর, বাবা যদি তাকে গৃহস্থালি কাজে সাহায্য না করেন, তখন সন্তানের প্রতি যথাযথ মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হয় না। বিশেষ করে যেসব পরিবারে বাবা অনুপস্থিত থাকেন (যেমন- প্রবাসে থাকেন), সেসব পরিবারের কিশোরদের বিপথগামী হওয়া হার তুলনামূলক বেশি।

 

 

 

দ্বিতীয় কারণটি হলো, সাংস্কৃতিক সংঘাত ও 'আইডেন্টিটি ক্রাইসিস' বা আত্মপরিচয়ের সংকট। আজকের শিশুরা একসঙ্গে দেশীয়, ভারতীয়, কোরিয়ান এবং পশ্চিমা সংস্কৃতি দেখে বড় হচ্ছে। চারপাশের এত ভিন্ন ভিন্ন প্রভাবের কারণে তারা দ্বিধায় পড়ে যায়—তাদের নিজস্ব পরিচয় কী? বন্ধুদের কাছে নিজেকে ‘কুল’ প্রমাণ করতে বা অন্যের মনোযোগ আকর্ষণ করতে গিয়ে তারা অনেক সময় ভুল পথে পা বাড়ায়।

 

 

 

 

সমাজে অপরাধ থাকবেই, কিন্তু সেই অপরাধকে শাস্তির ভয়ের মাধ্যমে প্রশমিত করে রাখা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। এখানেই আমাদের রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। আজ দেশে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো শাস্তি দৃশ্যমান নয়।

 

 

 

 

তৃতীয়ত, আমাদের সমাজে সার্বিকভাবে নৈতিকতা বা ইথিকসের চরম স্খলন ঘটেছে। আজ থেকে ২০-৩০ বছর আগেও মানুষের মধ্যে যে লজ্জা বা সংকোচবোধ ছিল, তা এখন অনেক কমে গেছে। ধর্মীয় অনুশাসনও এখন অনেকটাই লোক দেখানো। এর প্রমাণ আমরা পাই যখন দেখি তথাকথিত ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসাতেও বলাৎকার বা যৌন নির্যাতনের মতো ভয়ংকর অনিয়ম ঘটছে।

 

চতুর্থ এবং অন্যতম ভয়াবহ কারণ হলো, সোশ্যাল মিডিয়া এবং পর্নোগ্রাফির অবাধ বিস্তার। বর্তমানে ১০-১১ বছরের শিশুরাও খুব সহজেই পর্নোগ্রাফিতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যা তাদের মস্তিষ্ককে ছোটবেলা থেকেই বিকৃত করে দিচ্ছে।

 

এর পাশাপাশি আমাদের নাটক, সিনেমা বা ওয়েব সিরিজগুলোরও একটি বড় নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। মিডিয়াতে যখন ভায়োলেন্স বা সহিংসতাকে খুব স্বাভাবিক বা আকর্ষণীয় হিসেবে দেখানো হয়, তখন শিশুরা সেটাকে অনুকরণ করতে চায়। হলিউডের ‘জোকার’ সিনেমার মতো অনেক কনটেন্ট পরোক্ষভাবে এই বার্তাই দেয় যে, সমাজ হয়তো একজন অপরাধীকেই বেশি মনোযোগ বা স্বীকৃতি দেয়। দিনশেষে প্রতিটি মানুষই যেহেতু মনোযোগ বা ভ্যালিডেশন চায়, তাই অপরিণত বয়সের ছেলেমেয়েরা এগুলো দেখে অপরাধের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

 

শিশুরা কেন এত বেশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছে?

 

পত্রিকার পাতা খুললেই আমরা দেখছি শিশু হত্যা, ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর হত্যার মতো নারকীয় ঘটনা। শিশুরা কেন এত বেশি টার্গেট হচ্ছে? এর খুব সহজ অথচ নির্মম উত্তর হলো—শিশুরা নিষ্পাপ এবং দুর্বল।

 

সমাজের একটি চিরাচরিত নিয়ম হলো, সবল সবসময় দুর্বলের ওপর অত্যাচার করে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়ালে সে পাল্টা আঘাত করবে, কিন্তু একটি শিশুর সেই ক্ষমতা নেই। সমাজে যখন পর্নোগ্রাফির প্রভাব বা অন্যান্য কারণে মানুষের মধ্যে পাশবিকতা ও বিকৃত যৌন লালসা বৃদ্ধি পায়, তখন সেই মানুষগুলো তাদের সমবয়সী বা প্রাপ্তবয়স্ক কাউকে না পেয়ে হাতের কাছে থাকা সবচেয়ে দুর্বল ও সহজলভ্য শিকারটিকে বেছে নেয়। সেটি হতে পারে ৮-১০ বছরের একটি নিষ্পাপ শিশু। আমার চেম্বারে চিকিৎসা নিতে আসা এমন অন্তত ১৬ জন মেয়েকে আমি পেয়েছি, যারা খোদ নিজের জন্মদাতা বাবার দ্বারাই ধর্ষণের শিকার হয়েছে! সমাজের পারভার্শন বা বিকৃতি আজ কোন তলানিতে ঠেকেছে, এটি তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।

 

রাষ্ট্র ও সমাজের দায়বদ্ধতা

 

সমাজে অপরাধ থাকবেই, কিন্তু সেই অপরাধকে শাস্তির ভয়ের মাধ্যমে প্রশমিত করে রাখা রাষ্ট্রের প্রধান দায়িত্ব। এখানেই আমাদের রাষ্ট্র চরমভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। আজ দেশে অপরাধ বিস্তারের অন্যতম কারণ হলো শাস্তি দৃশ্যমান নয়।

 

 

 

 

অপরাধীদের মনে শাস্তির ভয় ঢোকাতে হবে। তারা যখন দেখে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, তখন তাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া এই মহামারি রোখা সম্ভব নয়।

 

 

 

 

যাদের জীবনে হারানোর কিছু নেই, যাদের সুস্থ বিনোদনের অভাব এবং যারা মাদক বা পর্নোগ্রাফিতে ডুবে আছে, তাদের কাছে শুধু নীতিবাক্য আওড়ালে কোনো কাজ হবে না। তাদের মনে শাস্তির ভয় ঢোকাতেই হবে। কেউ যদি একটি শিশুর গায়ে হাত তোলে বা কোনো অপরাধ করে, তবে তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অপরাধীরা যখন দেখে যে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়, তখন তাদের মধ্যে কোনো ভয় কাজ করে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা ছাড়া এই মহামারি রোখা সম্ভব নয়।

 

করণীয় কী?

 

এই অন্ধকার পরিস্থিতি থেকে আমাদের আগামী প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।

 

আমার প্রথম পরামর্শ থাকবে অভিভাবকদের প্রতি—আপনার সন্তানদের সময় দিন। বাবা-মা উভয়েই চাকরি করলে ঘরের কাজগুলো নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিন, যেন সন্তানকে দেওয়ার মতো কোয়ালিটি সময় আপনাদের হাতে থাকে। সন্তানের শুধু পরীক্ষার রেজাল্ট বা পড়াশোনা নিয়ে কথা না বলে, প্রতিদিন অন্তত আধা ঘণ্টা তাদের সাথে গল্প করুন। ‘তুমি কেমন আছো?’, ‘তোমাকে কেউ কষ্ট দিচ্ছে কি না?’—এই সাধারণ প্রশ্নগুলো সন্তানের মনের জানালা খুলে দেয়।

 

বাচ্চাদের খুব অল্প বয়সে হাতে স্মার্টফোন তুলে দেবেন না। বয়সের প্রয়োজনে ফোন দিতে হলেও সে ইন্টারনেটে কী দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে, কাদের বন্ধু বানাচ্ছে—সেই জায়গাগুলোতে কড়া নজরদারি রাখুন।

 

বাচ্চাদের ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত করুন। মাঠে গিয়ে খেলাধুলা করলে তাদের মানসিক জোর বৃদ্ধি পায় এবং আত্মপরিচয়ের সংকট কমে আসে। পাশাপাশি, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শুধু পুঁথিগত বিদ্যা নয়, নৈতিকতার শিক্ষাও জোরদার করতে হবে। একজন ভালো মানুষ হওয়ার সুবিধাগুলো তাদের বোঝাতে হবে।

 

পৃথিবীর কোনো সমাজেই অপরাধ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু আমরা যদি পরিবারে সন্তানের মনের যত্ন নিই, স্কুলগুলো যদি নৈতিকতার ভিত গড়ে দেয় এবং রাষ্ট্র যদি অপরাধের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করে, তবে অবশ্যই শিশু-কিশোরদের এই অপরাধ প্রবণতা এবং তাদের ওপর হওয়া নির্যাতন অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভব।

 

  • ডা. সায়েদুল আশরাফ কুশল: সাইকিয়াট্রিস্ট, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান লাইফস্প্রিং-এর প্রতিষ্ঠাতা।