সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর জন্য এর তাৎপর্য ও কৌশলগত প্রভাব নিয়ে নানামুখী মতামত সামনে আসছে। অনেক বিশ্লেষক এই চুক্তির উপযোগিতা বা বাস্তবায়নের সম্ভাব্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারা এটিকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন যেন চুক্তিটি নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্রের উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও কৌশলগত পরিকল্পনাকে প্রতিহত করার লক্ষ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছে এবং এজন্য এটি পূর্ণ কার্যকারিতা পাওয়ার আগেই এটিকে দুর্বল করে দেওয়া উচিত। আবার কেউ কেউ চুক্তিটিকে সাম্প্রদায়িক প্রকৃতির বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছেন।
চুক্তিটির উদ্দেশ্য ও প্রকৃতি যে মূলত আত্মরক্ষামূলক—এই মৌলিক বিষয়টিকে এ ধরনের ব্যাখ্যায় উপেক্ষা করা হচ্ছে। যেসব পক্ষ চুক্তি স্বাক্ষরকারী অসাম্প্রদায়িক তিনটি রাষ্ট্রের প্রতি বৈরী মনোভাব পোষণ করে অথবা ভবিষ্যতে এই দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার পরিকল্পনা করছে, তারা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে একটি যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা হিসেবে এই চুক্তির গুরুত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই।
তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা ও সামরিক হুমকি এবং অদূর ভবিষ্যতে সম্ভাব্য হুমকি মোকাবিলার লক্ষ্যে জোট গঠন করা আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রগুলোর একটি বৈধ অধিকার । আন্তর্জাতিক কূটনীতির ইতিহাসে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত রীতি। যারা নিজেদের জাতীয় নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার পাশাপাশি বৃহত্তর ভূ-কৌশলগত পরিবেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি হুমকির প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে অভিন্ন কৌশলগত মূল্যায়ন পোষণ করে, সেসব দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের মধ্যেই এ ধরনের জোট গড়ে ওঠে। মক্কা চুক্তি স্বাক্ষরকারী তিনটি মিত্র দেশ এই মূল্যায়নটি যৌথভাবে ধারণ করে।
এই মূল্যায়নের ভিত্তি হলো—অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধবিগ্রহ, এসব সংঘাতের ফলে সৃষ্ট সম্ভাব্য কৌশলগত শূন্যতা, ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা এবং কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান আঞ্চলিক ব্যবস্থার ক্ষয়। ঐতিহাসিকভাবে এই ব্যবস্থাটি এমন একটি অঞ্চলের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল, যার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৈশ্বিক ও কৌশলগতভাবে অপরিহার্য কেবল এর ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূ-আর্থিক গুরুত্বের কারণেই নয়, বরং এর কেন্দ্রীয় অবস্থান এবং দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের কারণেও।
এই তিনটি রাষ্ট্রের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অপরিসীম। এগুলোর পারস্পরিক সক্ষমতা এমনভাবে পরস্পরের পরিপূরক যে তা আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং সংঘাতজনিত কারণে সৃষ্ট যেকোনো কৌশলগত শূন্যতা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে। এই জোটের মাধ্যমে দেশ তিনটি এমন এক প্রধান কৌশলগত শক্তিতে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, যা নিজেদের বা বৃহত্তর অঞ্চলের বিরুদ্ধে আসা যেকোনো হুমকি মোকাবিলায় সক্ষম। এছাড়া অভিন্ন কৌশলগত লক্ষ্য পোষণকারী অন্যান্য রাষ্ট্রকেও এই জোটে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
কিছু বিশ্লেষণে এই চুক্তির কৌশলগত দিকগুলো পুরোপুরি অনুধাবন না করে জোটে সৌদি আরবের গুরুত্ব ও ভূমিকাকে কেবল তার আর্থিক সক্ষমতা এবং নিজস্ব নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রচেষ্টার মধ্যেই সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়েছে। অথচ জোটের অন্য অংশীদারদের তুলনায় সৌদি আরবের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব কোনো অংশেই কম নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে তা তাদের চেয়েও বেশি।
কেউ কেউ দাবি করেন, সৌদি আরব তার স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা রক্ষার জন্য সর্বদাই একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার খুঁজেছে এবং এই প্রচেষ্টাকে তারা কেবল সৌদি আরবের ক্ষেত্রেই একটি অনন্য বিষয় হিসেবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব রাষ্ট্রই একই উদ্দেশ্যে একই বিষয় প্রত্যাশা করে। তবে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রে সৌদি আরবের অবস্থান এমন যে, এটি তার সমর্থন ও অনুমোদন পেতে আগ্রহী রাষ্ট্রগুলোর জন্য একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সৌদি আরবের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব বেশ কিছু বিষয়ের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে, যার মধ্যে আছে এর কৌশলগত অবস্থান, ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে গুরুত্ব, বিশাল তেলসম্পদ, আর্থিক শক্তি, নীতিমালার ক্ষেত্রে পরিমিতিবোধ ও বাস্তববাদিতা, কূটনৈতিক ভূমিকা, ব্যাপক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক সক্ষমতা।
এই কৌশলগত অবস্থানের কারণে সৌদি আরব বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, আরব উপসাগর ও বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যকার সম্পর্কের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তার করে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাটি লোহিত সাগরে সৌদি আরবের অবস্থানের কৌশলগত গুরুত্বকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। একইসঙ্গে জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প পথ হিসেবে দেশটির বন্দর ও সহায়ক অবকাঠামোর প্রস্তুতি এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ও বিতরণ ব্যবস্থায় একটি প্রধান লজিস্টিক কেন্দ্র হিসেবে এর ভূমিকাও সামনে এসেছে।
তেল এখনো সৌদি আরবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। দেশটির রয়েছে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম প্রমাণিত তেলের মজুত এবং ওপেকের শীর্ষস্থানীয় তেল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর তালিকায় দেশটি ধারাবাহিকভাবে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছে। এ ছাড়া সৌদির হাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, যার ফলে অন্যান্য অনেক বড় উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় তারা দ্রুতগতিতে উৎপাদন বাড়াতে বা কমাতে সক্ষম।
এই সক্ষমতা সৌদিকে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামের ওপর বিশেষ প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিয়েছে। সৌদির তেল উৎপাদন-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে, যা উন্নত ও উন্নয়নশীল উভয় ধরনের দেশের মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন খরচ, সরকারি রাজস্ব এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম।
সৌদি আরব কেবল তেল রপ্তানিকারক একটি দেশ নয়, বরং বিশ্ব জ্বালানি বাজার ব্যবস্থাপনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেও ভূমিকা রাখে। বর্তমানে দেশটি তার ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি বড় অংশ গড়ে তুলছে ‘ভিশন ২০৩০’-এর সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এর আওতায় তারা তেলভিত্তিক সম্পদকে দীর্ঘস্থায়ী অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাবের শক্তিতে রূপান্তর করছে এবং একইসঙ্গে বিনিয়োগ, পর্যটন, বিনোদন, লজিস্টিকস, উৎপাদন শিল্প, খনিজ সম্পদ আহরণ, নবায়নযোগ্য ও পারমাণবিক শক্তি এবং প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতগুলোতে নিজেদের কার্যক্রম সম্প্রসারিত করছে।
কৌশলগত অবস্থান ও তেলসম্পদ সৌদি আরবের ভূ-কৌশলগত ও ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্বের প্রধান নিয়ামক হলেও দেশটির ধর্মীয় মর্যাদাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। মুসলিম বিশ্বের ‘কিবলা’র (নামাজের সময় পবিত্র কাবা শরিফের দিকে মুখ করার দিক) এবং ইসলামের পবিত্রতম দুটি শহরের অবস্থান এই দেশে। প্রতি বছর লাখ লাখ মুসলমান হজ ও ওমরাহ পালন এবং পবিত্র স্থানগুলো পরিদর্শন করতে এখানে সমবেত হন। এই অনন্য ধর্মীয় গুরুত্ব সৌদি আরবকে এমন এক আন্তর্জাতিক মর্যাদা প্রদান করেছে, যা অন্য কোনো রাষ্ট্রের নেই।
এই পবিত্র স্থানগুলোর আয়োজন, ব্যবস্থাপনা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সৌদি আরবের জন্য সম্মানজনক এবং একইসঙ্গে একটি গুরুদায়িত্ব। ধর্মীয় এই দায়িত্ব সৌদি আরবকে আফ্রিকা, এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশের বিভিন্ন সরকার, মুসলিম সম্প্রদায় এবং ইসলামি সংগঠনগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ করে দিয়েছে। ইসলামি বিশ্বে একটি প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে দেশটির ধর্মীয় অবস্থান বাড়তি সুবিধা দিয়েছে।
পাশাপাশি আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শক্তি ও মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে সৌদির অবস্থান, জ্বালানি সম্পদের বিশাল উৎপাদনকারী ও শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হওয়া এবং জি২০-সহ (বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলোর জোট) বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সংস্থার সক্রিয় সদস্য হওয়ার বিষয়টিও এই প্রভাবকে সুদৃঢ় করেছে। সব মিলিয়ে প্রভাব-প্রতিপত্তি ও কৌশলগত গুরুত্বের এমন সব উপাদানের পারস্পরিক সমন্বয় খুব কম দেশেরই আছে।
ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক উভয় প্রেক্ষাপটেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি চীন, রাশিয়া, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিশ্বের অধিকাংশ দেশের (ইসরাইল ছাড়া) সঙ্গে বহুমুখী কৌশলগত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলেছে সৌদি আরব। এই সম্পর্ক পারস্পরিক স্বার্থ ও সুবিধার ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত এবং এর লক্ষ্য হলো রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্থিতিশীলতা ও বৃহত্তর কৌশলগত পরিসরকে সুদৃঢ় করা।
বিশ্বাস ও নির্ভরযোগ্যতার ওপর ভিত্তি করে বিচক্ষণতার সঙ্গে নিজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতি পরিচালনা করে থাকে সৌদি আরব। দেশটি এই অঞ্চলের সংঘাত ও যুদ্ধ নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে। ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতকবলিত এই অঞ্চলকে সংকট থেকে উত্তরণের পথে সহায়তা করতে দেশটি তার কূটনৈতিক প্রভাব কাজে লাগায়। এই কর্মপন্থা সৌদি আরবকে এমন এক অস্থিতিশীল আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত শক্তিতে পরিণত করেছে, যা ক্রমেই বহুকেন্দ্রিকতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
কৌশলগত গুরুত্বের বিষয়টি বিবেচনায় রেখেও দেশটি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলেছে এবং নিজের শক্তি বৃদ্ধির জন্য সেই গুরুত্বের উৎসগুলোকে কাজে লাগাচ্ছে। নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অর্জন এবং একটি নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চলে নিজেদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনাগুলোর সাফল্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন জোট বা মিত্রতা একটি বাড়তি সুবিধা হিসেবে কাজ করে।
লেখক : প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল
সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থার সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত। ‘কিং ফয়সাল ফাউন্ডেশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও ট্রাস্টি এবং ‘কিং ফয়সাল সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ’-এর চেয়ারম্যান
আরব নিউজ অবলম্বনে মোতালেব জামালী