
আমাদের মান্যবর বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর সহজ সরল স্বীকারোক্তি দেখে একটি গল্প মনে পড়ে যায়। এটি ছিল কর্মক্ষেত্রের হিউমার বা জোকস! গল্পটির প্রেক্ষাপট ত্রিশ বা চল্লিশ বছর আগেকার। জাহাজিদের জন্য সেটি ছিল অ্যানালগ যুগ! সবেমাত্র মোবাইল এসেছে, কিংবা তারও কিছুকাল আগের সময়! কল রেইট তখনো অনেক বেশি। সাগরে অবস্থানরত জাহাজ থেকে কিংবা বিদেশি বন্দর থেকে বাসায় ফোন করলে ‘হেলো, হেলো’ বলতে বলতেই পকেট থেকে অনেকগুলো কড়কড়ে ডলার চলে যেত।
সাগরে লম্বা নাইওর বা ভয়েস শেষে বন্দরে যখন জাহাজ ভিড়ত, তখন জাহাজের অফিসার এবং নাবিকরা চট্টগ্রাম শহরে নিজের কিংবা স্বজনদের বাসায় যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে পড়তেন। এ রকম একটি জাহাজের দৃশ্যপট। চিফ ইঞ্জিনিয়ার তার সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ারকে বলেন, ‘তুমি একটু জাহাজে থেকো, আমি একটু বাসার দিকে যাচ্ছি।’ এটি বলেই ঘড়ির কাঁটা কোনোমতে বিকাল ৫টায় পৌঁছাতেই নিজের বাসার দিকে রওনা হন। এরপর সন্ধ্যা ৬টা-সাড়ে ৬টার দিকে সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার থার্ড ইঞ্জিনিয়ারকে একই নির্দেশ দিয়ে জাহাজ ছেড়ে চলে যান! এরপর একই কায়দায় বসদের অনুসরণ করে পরের জনকে দায়িত্ব চাপিয়ে ৮টা-৯টার দিকে জাহাজ ছাড়েন থার্ড ইঞ্জিনিয়ার। রাত ১০টার দিকে ফোর্থ ইঞ্জিনিয়ারকে ইতস্তত করতে দেখে ফিফথ ইঞ্জিনিয়ার বলেন, ‘স্যার, আপনি বাসায় চলে যান। জাহাজে কিচ্ছু হবে না। আমিই সামাল দিতে পারব।’ রাত ১২টার দিকে ফিফথ ইঞ্জিনিয়ার একমাত্র ক্যাডেট ইঞ্জিনিয়ারকে রেখে নিজেও জাহাজ থেকে নেমে পড়লেন। তখন ক্যাডেট ইঞ্জিনিয়ার আল্লাহকে ডেকে বলেন, ‘হে পরওয়ার দেগার। এই গরিব আদমির ওপরে কীভাবে জুলুমটা করা হয়েছে, তা তুমিই দেখলা মাবুদ! এখন ইঞ্জিনে সমস্যা হলে আমি কিছুই করতে পারব না। কাজেই তোমার ইঞ্জিন মাবুদ তুমিই দেখো। এই ফাঁকে আমি একটু ঘুমাইয়া লই!’
আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের চোখে-মুখে সেই ক্যাডেট ইঞ্জিনিয়ারের অসহায়ত্ব দেখতে পেলাম। মালুম হচ্ছিল যে এই দায়িত্বটি ওনার ওপর জুলুম হয়ে পড়েছে! গত সপ্তাহে এক ইন্ডিয়ান পাইলট গাঁজা খেয়ে বিমান চালাচ্ছিলেন। সংগত কারণেই মাঝ আকাশে বিমানের অত্যধিক ঝাঁকুনি দেখে যাত্রীরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন! আমাদের মন্ত্রী মহোদয়ের এসব বাণী শুনে দেশবাসীর অবস্থা অনেকটা ওই হতভাগা বিমানের যাত্রীদের মতোই হয়েছে!
মন্ত্রী সাব ভুলে গেছেন যে তিনিও একটি বিমানের পাইলট বা যাত্রীবাহী জাহাজের কাপ্তানের মতো। ‘ওহ ক্যাপ্টেন মাই ক্যাপ্টেন’ এ রকম এক কাপ্তানের মুখ থেকে এ রকম হতাশার কথা জনগণকেও আরো নিদারুণ হতাশায় ফেলে দিয়েছে! গ্যাস সংকট নিয়ে আবার অর্থমন্ত্রী মুখ পুছে জানালেন, আমাদের হাতে কোনো জাদু নেই, সময় লাগবে দুই বছর।
মাননীয় মন্ত্রীগণ! আজ আপনারা মহাত্মন হয়েছেন, তবে জাতির জন্য নেলসন ম্যান্ডেলা হয়ে পড়েন নাই যে এভাবে সময় চাইলেই জাতি দিয়ে দেবে? মন্ত্রীদের মধ্যে যারাই এই ক্রাইসিস নিয়ে কথা বলেছেন, তারাই হতাশ করেছেন। জোনায়েদ সাকি তো কনটেইনারে(?) ভরে এলএনজি নিয়ে আসার চিন্তা করছেন! দারুণ রোমান্টিক কথা, রংধনু থেকে কনটেইনারে করে লাল রঙ এনে তোমার পায়ে আলতা পরাব তাই! মনে হলো, সাকির ওপরে কবির সেই রোমান্টিসিজম ভর করেছে! আর সেই ‘কনটেইনার’ (এলএনজি ট্যাংকার নহে) চায়নায় বানাতে নাকি দুই বছর লাগবে!
এ কথা বিজ্ঞ প্রতিমন্ত্রীর মুখে শুনে প্রমাদ গুনলাম! কারণ বিশ্ববাজারে এ রকম বিশেষায়িত এলএনজি জাহাজ আছে ৮৩৮টি, যেগুলো ভাড়ায় পাওয়া যায়। সাধারণত কার্গোর মালিক ক্যারিয়ার ব্যবস্থা করে ডেলিভারি পোর্টে পাঠিয়ে দেন! কাজেই এই জনগণ কেন আস্থা রাখবে যে এই মন্ত্রীরা তাদের সমস্যার আদৌ সমাধান করতে পারবেন বা সেই তাগিদ তাদের আছে?
প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর দাবি জানিয়েছেন, মন্ত্রীদের বেতন ১০ লাখ এবং এমপিদের বেতন ৫ লাখ হওয়া উচিত। আমিও এর বিপক্ষে নই। তবে কোনো কোনো মন্ত্রী যে পারফরম্যান্স দেখাচ্ছেন, তাতে তো মনে হয় জনগণের এই ১ লাখ টাকাই জলে যাচ্ছে!
তারপরও গালাগাল করে মনের ঝাল মেটানোর জন্য আমরা মন্ত্রীদের সামনে পাই। কিন্তু এর চেয়েও বড় পাপী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব, বিপিসি, আরজিপিএসসহ সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টগুলোর চেয়ারম্যান, মহাপরিচালক, পরিচালক, নির্বাহী প্রকৌশলীরা রয়েছেন। ওনাদের সবার ওপর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জনগণের জীবনযাত্রায় অত্যাবশ্যকীয় এই সেবাটি সুচারু রূপে পালন করার জন্য! এ কারণে জাতি তাদের সে রকম বিদ্যাবুদ্ধি দিয়ে সুসজ্জিত করেছে!
এ দেশের কৃষকটি, এ দেশের শ্রমিকটি, গার্মেন্টসের নারী কর্মীটি কিংবা সিঙ্গাপুর অথবা কুয়ালালামপুরের তপ্ত রোদে ঘর্মাক্ত শরীরে কাজ করা প্রবাসী ভাইটি তাদের কষ্টের টাকা দিয়ে বুয়েট, মেডিকেল কলেজ, ঢাকাসহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আপনাদের বড় বড় বিশেষজ্ঞ বানিয়েছে!
এটা একটা ‘গিভ অ্যান্ড টেইক’ ছিল, যা আপনারা বেমালুম ভুলে গেছেন ব্রাদার এবং ভগিনীগণ! বিনিময়ে এদের চাওয়া খুবই সামান্য। এরা চান যে এদের গতরটি একটু গরম হলে মাথার উপরে ফ্যানটি যেন চলে। রাতের অন্ধকারে বাতিটি যেন জ্বলে। আর পরিবারের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার জন্য চুলাটি যেন জ্বলে! ওদিকে নিজের ধন-মাল, ইজ্জত-আব্রু যেন একটু হেফাজতে থাকে।
কিন্তু এরা দেখতে পান যে নিজেদের সেবক তৈরি করতে গিয়ে প্রভু বানিয়ে ফেলেছে! আর এই প্রভুরা এমন জায়গায় উঠে গেছেন যে দেশের কোনো আইন, কোনো উকিল-মোক্তার-বিচারকরা এদের টিকিটিও ধরতে পারবে না! মরার পরে যে কবর, হাশর, জাহান্নামের ভয় সেটিও এদের মন থেকে উবে গেছে! এই ভয়টিও খুব জরুরি ছিল। এগুলো বেশি বললে আবার আপনাকে জঙ্গি তকমা লাগিয়ে দেবে!
গুটিকয় মানুষের মাত্রাতিরিক্ত লোভ, গাফিলতি, অবহেলা বা অদক্ষতার কারণেই কোটি কোটি বনি আদম ভুগছেনÑএদের মধ্য রোগী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, নারী, শিশু রয়েছেন। এদের সবাই যখন গরমে ছটফট করেন, তখন হয়তোবা এই কালপ্রিটরা এয়ার কন্ডিশনারের শীতল বাতাসে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমাচ্ছেন!
আমরা দাবি করি, আমরা সমস্যার রুট কজ অ্যানালাইসিস করি! অথচ সমস্যার মূল বীজটি যেখানে আছে, আমরা সেখানে কখনোই হাত লাগাই না! যে দেশের বিরাটসংখ্যক মানুষ লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ডুবে আছেন, সেই দেশে বিদ্যুৎমন্ত্রী কেমন করে এয়ার কন্ডিশনারের শীতল বাতাসে ঘুমান?
প্রধানমন্ত্রী কি এমন একটা নির্দেশ জারি করতে পারবেন, যতদিন দেশের লোডশেডিং ব্যবস্থার সন্তোষজনক উন্নতি না হয়, ততদিন মিন্টু রোডের মন্ত্রিপাড়ায় প্রতি রাতে কমপক্ষে দুই ঘণ্টা লোডশেডিং দিয়ে রাখবেন? শুধু নিরাপত্তার কারণে রাস্তার বাতিগুলো জ্বালিয়ে রাখতে হবে! তাহলেই সাধারণ মানুষের দুর্দশাটি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, আই উইল মেইক পলিটিকস ডিফিকাল্ট ফর দ্য পলিটিশিয়ান! জনাব রহমান! এই কাজটি করার ক্ষমতা আল্লাহপাক আপনাকে দিয়েছেন!
গতকাল বিএনপির খাঁটি ভক্ত এক ভাইয়ের সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে দীর্ঘক্ষণ কথা হলো। ভাইটি একটি দামি কথা বললেন, শহীদ জিয়ার জানাজা ছিল সে সময় পর্যন্ত সবচেয়ে বড়! ম্যাডামের জানাজা আগেরটি ছাপিয়ে যায়। কর্মবহুল জীবন শেষে তারেক রহমানের সেই শেষ বিদায়টি নিজের বাবা-মায়ের চেয়ে বড় হবে, নাকি ভিন্ন চিত্র হবেÑসেটি নির্ভর করবে তার এসব কাজের ওপর!
পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ নয়Ñএকসঙ্গে কাজ করুন, সমস্যাটি আসলেই জটিল
জুলাই বিপ্লবের বড় তিন স্টেকহোল্ডার বিএনপি, জামায়াত এবং ছাত্র সমন্বয়ক বা এনসিপি। সৌভাগ্যক্রমে এই তিনটি রাজনৈতিক শক্তির একটি সরকারে এবং বাকি দুটি বিরোধী দলে অবস্থান করছে। কিছুটা মতভিন্নতার পরও জুলাই সনদ সবার মধ্যে একটি সেতুবন্ধ হতে পারে! বর্তমান পাওয়ার সেক্টরে যে দুরবস্থা, তা সৃষ্টি করেছে মাফিয়া সরকার তার সৃষ্ট অলিগার্কদের দিয়ে। কাজেই এই পরিস্থিতি থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে হলে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে!
এ ক্ষেত্রে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। পক্ষে-বিপক্ষের সবার জেনুইন পরামর্শ অকুণ্ঠ চিত্তে গ্রহণ করতে হবে! অন্তর্বর্তী সরকারের অনুমোদিত মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি ২০২৫-এ বর্ণিত কাঠামোয় বেসরকারি উৎপাদক সরাসরি বড় শিল্প ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারবেÑএই সুপারিশটি বাস্তবায়ন করলে বর্তমান সমস্যার তীব্রতা অনেক কমে যাবে। জামায়াতে ইসলামীও তাদের পরামর্শ প্যাকেজটিতে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংটি শিগগির সম্ভব চালুর পরামর্শ রেখেছেন।
আমাদের পারস্পরিক ক্ষোভ, হতাশা, মতভিন্নতা যতই থাকুক না কেনÑআমরা যে একটা সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিংয়ে বাঁধা আছি, তা ভুলে যাওয়া ঠিক হবে না! আমরা সমালোচনা করব এই এসপিএমকে আরো মজবুত করার জন্যÑধ্বংস বা দুর্বল করার জন্য নয়।
সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) নিয়ে আসলে কী হচ্ছে
এটিকে এসবিএম বা সিঙ্গেল বয়া মুরিংও বলা হয়। সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) হলো সমুদ্রে স্থাপিত একটি বিশেষ ভাসমান স্থাপনা, যার মাধ্যমে বড় তেলবাহী জাহাজ থেকে সমুদ্রের তলদেশে স্থাপিত পাইপলাইনের মাধ্যমে তেল সরাসরি মহেশখালীর সংরক্ষণাগারে নেওয়া যায় এবং সেখান থেকে চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে সরবরাহ করা যায়; এটি কক্সবাজারের মহেশখালী-মাতারবাড়ী উপকূলের বঙ্গোপসাগরে স্থাপন করা হয়েছে এবং প্রায় ১৪৬ কিলোমিটার অফশোর (সমুদ্রের তলদেশে) ও ৭৪ কিলোমিটার মাটির উপরের পাইপলাইনের সঙ্গে যুক্ত।
এসপিএমটি চালু হলে বড় মাদার ট্যাংকার থেকে সরাসরি তেল খালাসের ফলে লাইটার ট্যাংকারের ওপর নির্ভরতা কমবে, তেল খালাসের সময় ১১-১৪ দিন থেকে প্রায় ৪৮ ঘণ্টায় নামবে এবং মাদার ট্যাংকারকে ১১-১৪ দিন আটকে রাখার ক্ষতিপূরণ, লাইটারেজ ও পরিবহন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর মাধ্যমে বছরে কয়েকশ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রশ্ন হলোÑকেন এই কাজটি করতে পারছি না
২০১৫ সালে প্রায় ৪,৯৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্পের চুক্তি হয় এবং ২০১৮ সালের মধ্যে তা সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল তিন দফায় চার বছর বাড়ানো হলে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৮,৩৪১ কোটি টাকায় দাঁড়ায়। এখানে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকা লুটপাট হয় মাফিয়া রানির বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী এবং তার কোষাধ্যক্ষ কাজলের মাধ্যমে।
প্রকল্পটির ২০২৩ সালের প্রথম পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ব্যর্থ হওয়ার পর ২৪ জুন ২০২৪ দ্বিতীয় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চালানো হয়! সৌদি আরব থেকে আসা জাহাজের প্রায় ৮২,০০০ টন ক্রুড অয়েল খালাসের সময় পাইপলাইনে লিক দেখা দেয় এবং সাগরে তেল ছড়িয়ে পড়ে। এরপরও প্রকল্পটির সফল টেস্টিং ও কমিশনিং সম্পন্ন হয়নি এবং প্রজেক্ট কম্পলিশন রিপোর্ট (পিসিআর) চূড়ান্ত হয়নি।
দীর্ঘদিন চুপ থাকার পর ১৯ ডিসেম্বর ২০২৫ অপারেশন এবং মেইনটেন্যান্স (O&M) টেন্ডার আহ্বান করা হয় । এ সময়টিকে বেছে নেওয়া হয়েছে বিশেষ মতলব থেকে! সময়টি বড়দিন ও নববর্ষের আন্তর্জাতিক ছুটির সঙ্গে ওভারল্যাপ করে। অন্যদিকে আমাদের জাতীয় নির্বাচন ও পরবর্তী সরকার গঠনের সঙ্গেও সময়টি মিলে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি হলো, নির্বাচনের কারণে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা স্থগিত করে দেয় এবং একাধিক পশ্চিমা দেশ বাংলাদেশ ভ্রমণের বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছিল।
বিশেষ পরিস্থিতির মধ্যে নেদারল্যান্ডসের SMIT LAMNALCO ও মিসরের MARIDIVE-সহ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো সময় বৃদ্ধির আবেদন করলেও তা মঞ্জুর করা হয়নি। ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, নতুন সরকারের শপথগ্রহণের দিনই দরপত্র গ্রহণ ও খোলা হয়। প্রায় ১১টি প্রতিষ্ঠান নথি সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত মাত্র তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়।
পরে তিন দরদাতার মধ্যে মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানকে কারিগরিভাবে উপযুক্ত (Technically Responsive) ঘোষণা করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির নিজ দেশের বাইরে এবং তৃতীয় পক্ষের মালিকানাধীন এসপিএম পরিচালনার প্রয়োজনীয় প্রমাণিত অভিজ্ঞতা নেই; পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে অতীতের কয়েকটি তেল দূষণ ও অন্যান্য বিতর্কিত ঘটনার সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তাছাড়া আন্তর্জাতিক ওয়েল মেজরদের (Oil Major) ভেটিংয়েও কোম্পানিটির কমপ্লায়েন্স রেকর্ড খুব সুবিধার নয়! সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নিজ দেশে প্রায় ১২ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের দুর্নীতি কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। এর সবগুলোর সাপোর্টিং ডকুমেন্টস আমাদের হাতে মজুত আছে!
অন্যদিকে, SMIT LAMNALCO টেন্ডারের সময় বৃদ্ধি ও পুনঃদরপত্রের জন্য একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করেছে এবং সরকারি ক্রয় বিধিমালা (পিপিআর) অনুযায়ী বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত পরবর্তী কার্যক্রম স্থগিত রাখার বিধান প্রযোজ্য বলে দাবি করেছে।
যে প্রকল্পটি চার বছর ধরে অচলাবস্থায় পড়ে আছে, সেই প্রকল্পটিকে একটি নির্ভরযোগ্য হাতে তুলে দিতে মাত্র ১৫ দিন সময় বাড়ানো গেল না কেন??? বিশ্ববিখ্যাত একটি কোম্পানি (ওয়েল মেজরদের কাছে যাদের গ্রহণযোগ্যতা খুবই উঁচুতে) বিপিসির এই অস্বচ্ছ কাজ-কারবার এবং লুকোচুরি মেনে নিতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ দাখিল করেছে ।
বিদেশি কোম্পানির এ রকম অভিযোগ বোধ হয় এটাই প্রথম। ইন্টারন্যাশনাল টেন্ডার নিয়ে এ ধরনের ছল-চাতুরী আমাদের সম্পর্কে একটা বাজে ধারণা বিশ্বময় ছড়িয়ে দিচ্ছে! অসাধু চক্রটি তড়িঘড়ি করে যাদের কাজটি হ্যান্ডওভার করেছে, তাদের দেশীয় এজেন্ট সম্পর্কে জানতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ পাওয়া গেছে। এটি ইন্ট্রাকো গ্রুপÑএই প্রতিষ্ঠানটির মালিক গত ফ্যাসিস্ট সরকারের বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রীর টেন্ডারবিহীন ভোলা প্রকল্পের অংশীদার ও ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত।
যে ত্রুটি বা গলদটি এই চক্র ঢাকতে চাচ্ছে, তা খুঁজে বের করার জন্যই অপারেশন এবং ম্যানেজমেন্টের দায়িত্ব গ্লোবালি রিকগনাইজড একটি কোম্পানির হাতে দেওয়া উচিত! তা না হলে নিম্নমানের একটি কোম্পানির হাতে এই দায়িত্ব দিলে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে! তাতে আমাদের পোর্ট ফ্যাসিলিটিজের ইমেজ আরো ধসে পড়বে এবং তা শোধ করতে হবে বেশি দামে জাহাজ ভাড়া করে!
এ অবস্থায় জাতীয় স্বার্থে প্রথমে এসপিএম প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ টেস্ট রান, ত্রুটি নির্ণয়, পিএসআর-সম্পন্ন এবং পূর্ববর্তী ঠিকাদারের দায় নির্ধারণ করা প্রয়োজন। পিপিআরের বিধান অনুসরণ করে বর্তমান দরপত্র প্রক্রিয়া পুনর্বিবেচনা এবং প্রয়োজন হলে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক পুনঃদরপত্রের মাধ্যমে বিশ্বমানের অভিজ্ঞ এসপিএম অপারেটর নির্বাচন করাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে অধিকতর যুক্তিসংগত হবে।
এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর এখনই সরাসরি হস্তক্ষেপ করা উচিত। কারণ সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ ফোঁড়ের সমান!