Image description

তনভিয়া বড়ুয়া

“Ab hamari mann ki bat suno.”

গত এক দশক ধরে ভারতের রাজনৈতিক পরিসরে 'Mann Ki Baat' ছিল সরকারের একমুখী যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। এবার সেই ভাষাকেই উল্টে দিয়ে আন্দোলনকারী তরুণরা জানিয়ে দিল, এবার তারা কথা বলতে চায়, আর সেই কথাই সবাইকে শুনতে হবে।

ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে শুরু হওয়া এই আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল নিট-ইউজি প্রশ্নফাঁস, পরীক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি (যা ইতিমধ্যে তারা আদায় করে নিয়েছে)। গত কয়েক সপ্তাহের এই আন্দোলন জেন জি কীভাবে রাজনীতি নিয়ে কথা বলে, নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে এবং ডিজিটাল যুগে প্রতিবাদ করে, তার নতুন উদাহরণ হয়ে উঠেছে।

এই আন্দোলনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক, এখানে রাস্তার প্রতিবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। যে প্রজন্মকে দীর্ঘদিন 'স্ক্রিনে আটকে থাকা' বলে সমালোচনা করা হয়েছে, সেই প্রজন্মই এবার দেখাল, স্ক্রিন এবং রাস্তা একসঙ্গে ব্যবহার করেও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।

প্রচলিত রাজনৈতিক আন্দোলনে প্ল্যাকার্ডে সাধারণত লেখা থাকে দাবি, অভিযোগ বা স্লোগান। কিন্তু জেন জি-দের এই আন্দোলনে দেখা গেল অন্য ছবি। সেখানে লেখা ছিল, "Modi ji, please break up with us." সম্পর্কের ভাষায় লেখা এই বাক্যটি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব তুলে ধরছে না। বরং ব্যক্তিগত সম্পর্কের জনপ্রিয় ইন্টারনেট সংস্কৃতিকে ব্যবহার করে সরকার এবং তরুণদের সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক প্রশ্ন তুলছে।

আরেকটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, "Regime so narcissistic it makes my ex look like a green flag." সামাজিক মাধ্যমে সম্পর্ক নিয়ে ব্যবহৃত জনপ্রিয় শব্দবন্ধ 'green flag' এবং 'toxic ex'-কে রাজনৈতিক ভাষায় রূপান্তর করা হয়েছে এখানে। ফলে রাজনীতির কঠিন ভাষা বদলে গিয়ে পৌঁছে গেছে সেই প্রজন্মের কাছে, যারা প্রতিদিন একই ধরনের মিম, রিল এবং পোস্টের মধ্যে বড় হয়েছে।

প্রতিবাদকারীরা বদলেছেন প্রতিবাদের দৃশ্যও। কেউ লিপস্টিক লাগাতে লাগাতে পুলিশের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। কেউ বলছেন, "Serving face at the protest because the government couldn't serve justice." অর্থাৎ ব্যক্তিগত স্টাইল এবং রাজনৈতিক প্রতিবাদকে আলাদা করে দেখা হচ্ছে না। ফ্যাশন, মেকআপ, প্রতিবাদ—সবকিছু একই ফ্রেমে চলে এসেছে।

 

এই আন্দোলনের সবচেয়ে লক্ষণীয় দিক, এখানে রাস্তার প্রতিবাদ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভাষা একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। যে প্রজন্মকে দীর্ঘদিন 'স্ক্রিনে আটকে থাকা' বলে সমালোচনা করা হয়েছে, সেই প্রজন্মই এবার দেখাল, স্ক্রিন এবং রাস্তা একসঙ্গে ব্যবহার করেও রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়।

 

সোশ্যাল মিডিয়ার 'fit check' বা 'outfit reveal' ট্রেন্ডও পৌঁছে গেছে আন্দোলনে। একটি রিলে দেখা গেল, পোশাক দেখানোর ভিডিও হঠাৎ কেটে গিয়ে শুরু হচ্ছে টিয়ার গ্যাস থেকে বাঁচতে দৌড়ানোর দৃশ্য। অন্য একটি ভিডিওতে টিয়ার গ্যাসের 'রিভিউ' করা হচ্ছে যেন সেটি কোনো নতুন রেস্তোরাঁর খাবার। অনেকের চোখে এগুলি নিছক মিম বা মজার ভিডিও। কিন্তু জেন জি-রা দেখিয়ে দিল, হাস্যরস প্রতিবাদকে হালকা করে না, বরং সেই প্রতিবাদকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়।

কেউ 'One Piece' মাঙ্গা হাতে দাঁড়িয়েছেন। কেউ স্পাইডার-ম্যান, আয়রন ম্যান বা হাল্কের পোশাক পরে ব্যারিকেডের উপর বসে আছেন। এগুলি বিশ্বজুড়ে তরুণদের প্রতিবাদে ব্যবহৃত সাংস্কৃতিক প্রতীকগুলিকে ভারতীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নিয়ে আসার চেষ্টাও বটে।

যে মিম আগে শুধুই ইনস্টাগ্রামে দেখা যেত, সেটি এবার প্ল্যাকার্ডে লেখা হচ্ছে। যে সংলাপ আগে রিলে ব্যবহার হতো, সেটি এখন স্লোগানের জায়গা নিচ্ছে। ফলে আন্দোলনটি একইসঙ্গে রাস্তা এবং অ্যালগরিদম—দুই জায়গাতেই উপস্থিত হয়েছে।

একটি প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, "Fell in Love, Fell in Fascism." প্রেম, সম্পর্ক এবং ডেটিং অ্যাপের পরিচিত ভাষাকে রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে মিলিয়ে দিয়েছে জেন জি। তারা এমন ভাষায় নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছে, যা তাদের প্রতিদিনের কথাবার্তা ও সোশ্যাল মিডিয়ার জগতের সঙ্গে মিলে যায়। একইভাবে "Accountability? Bhag Amit yeh toh out of syllabus Hain"—পরীক্ষার 'out of syllabus' প্রশ্নের অভিজ্ঞতাকে প্রশাসনিক জবাবদিহির সঙ্গে যুক্ত করে একটি ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য তৈরি করা হয়েছে।

আরও একটি বহুল আলোচিত প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, "Can you find the Democracy mitron?" প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বহুল ব্যবহৃত সম্বোধন 'Mitron'-কেই ব্যবহার করে এই বার্তা লেখা হয়েছে। অর্থাৎ নতুন কোনো স্লোগান তৈরি না করে, পরিচিত রাজনৈতিক শব্দ ও বাক্যকেই নতুন প্রেক্ষাপটে ব্যবহার করে নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরছে জেন জি।

আবার একটি ভাইরাল অডিও ক্লিপে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কণ্ঠস্বরের আদলে চলচ্চিত্র 'Saiyaara'-র গান তৈরি করা হয়। পরে সেই গান লাউডস্পিকারে বাজিয়ে আন্দোলনকারীরা গাইতে শুরু করেন। একটি রিলে লেখা ছিল, "U think lathi kha k ghar me chup jaayenge. Ab gaana bhi gayenge wo bhi Modi ji k awaj me."

এইভাবে ডিজিটাল মাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতিবাদের বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া অবশ্য নতুন নয়। বরং এর একটি রাজনৈতিক ইতিহাস রয়েছে। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদী এমন কয়েকজন বিশ্বনেতার মধ্যে ছিলেন, যাঁরা শুরু থেকেই রাজনৈতিক প্রচারে সোশ্যাল মিডিয়াকে বড় অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব এবং অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিজেপি নিজেদের বার্তা দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক যোগাযোগে এই ডিজিটাল আধিপত্য কার্যত একতরফাই ছিল।

কিন্তু বারো বছর পরে একই অস্ত্রই এবার ব্যবহার করছে সেই প্রজন্ম, যারা মোদীর রাজনৈতিক উত্থানের সময় হয়তো স্কুলে পড়ত। তবে এবার একটি বড় পার্থক্য রয়েছে। আন্দোলনের বার্তা কোনো রাজনৈতিক দলের আইটি সেল থেকে তৈরি হচ্ছে না। বরং অসংখ্য তরুণ নিজেদের রিল, মিম, স্টোরি ও পোস্টের মাধ্যমে আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এই সব মিলিয়েই তৈরি হচ্ছে আন্দোলনের নতুন ভাষা।

 

যন্তর মন্তরের এই আন্দোলনে রিল, মিম, এআই অডিও, ফ্যানডম, পপ কালচার আর সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম—সব মিলেমিশে এক নতুন ধরনের প্রতিবাদের ছবি তৈরি করে। তারা বক্তৃতার ভাষায় নয়, মিমের ভাষায় কথা বলে। তারা পোস্টার লেখে ইনস্টাগ্রামের ক্যাপশনের মতো। তারা স্লোগান বানায় রিলেশন শিপের জোকস থেকে। তারা পপ কালচার ধার করে রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি করে।

 

একটি পোস্টারে লেখা ছিল, "Modi melody khao, hamara future nahi." প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয় হওয়া 'Melodi' মিমের উল্লেখ করে আন্দোলনকারীরা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

টিয়ার গ্যাস নিয়েও তৈরি হয়েছে অসংখ্য মিম। একটি পোস্টে লেখা ছিল, "Modi ki tear gas bilkul pure hai, 0 per cent ethanol." আবার অন্য একটি জনপ্রিয় মিমে দেখা যায়, "I'm too busy being a diva, I can't hear you." টিয়ার গ্যাস, পুলিশি ব্যারিকেড বা লাঠিচার্জের মতো ঘটনাগুলিকেও জেন জি নিজেদের পরিচিত মিম ও ইন্টারনেটের ভাষায় তুলে ধরছে। এতে প্রতিবাদের বাস্তবতা যেমন সামনে এসেছে, তেমনই হাস্যরসের মাধ্যমে সেই অভিজ্ঞতাও আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি পুরনো পোস্টে লেখা ছিল, "Nothing is more important than the welfare and future of our youth." সেই পোস্টের জবাবে ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের একটি ছবি দিয়ে লেখেন, "Hi, my name is Nothing." মাত্র একটি বাক্যের মাধ্যমেই আন্দোলনকারীরা সরকারের পুরনো প্রতিশ্রুতি এবং বর্তমান পরিস্থিতির মধ্যে থাকা ফারাক তুলে ধরার চেষ্টা করছেন।

একইভাবে ২০১৮ সালে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর করা একটি টুইট "I want this government to be criticised. Criticism makes democracy strong: PM."—আবার নতুন করে ভাইরাল হয়। আন্দোলনকারীরা সেই বাক্য টি-শার্টে ছাপিয়ে পরে যন্তর মন্তরে আসেন। আন্দোলনকারীরা প্রধানমন্ত্রী মোদীর নিজের পুরনো বক্তব্যকেই নতুনভাবে ব্যবহার করেছেন। নতুন কোনো স্লোগান তৈরির বদলে, আগের সেই বক্তব্যকেই বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে মিলিয়ে প্রতিবাদের ভাষা বানানো হয়েছে।

এখানে প্রতিবাদ এবং কনটেন্ট তৈরি একে অপরের থেকে আলাদা নয়। আন্দোলনকারীদের অনেকেই জানিয়েছেন, তাঁরা ভাইরাল হওয়ার জন্য ভিডিও করেন না; বরং ভিডিও করা, আপলোড করা এবং প্রতিবাদ—এই তিনটি তাদের কাছে একই প্রক্রিয়ার অংশ। এর ফলে আন্দোলনের প্রতিটি মুহূর্ত কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লক্ষ লক্ষ মানুষের মোবাইল স্ক্রিনে পৌঁছে যায়।

যন্তর মন্তরের এই আন্দোলনে রিল, মিম, এআই অডিও, ফ্যানডম, পপ কালচার আর সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম—সব মিলেমিশে এক নতুন ধরনের প্রতিবাদের ছবি তৈরি করে। তারা বক্তৃতার ভাষায় নয়, মিমের ভাষায় কথা বলে। তারা পোস্টার লেখে ইনস্টাগ্রামের ক্যাপশনের মতো। তারা স্লোগান বানায় রিলেশন শিপের জোকস থেকে। তারা পপ কালচার ধার করে রাজনৈতিক বক্তব্য তৈরি করে।

ভারতের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে পোস্টার, গান, কবিতা এবং নাটক বহুবার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। জেন জি সেই ধারাতেই নতুন সংযোজন করেছে মিম, রিল, এআই, ট্রেন্ডিং অডিও এবং ভাইরাল টেমপ্লেট। আর এই কারণেই জন্তর মন্তরের আন্দোলন হয়তো ভবিষ্যতের ভারতীয় রাজনৈতিক যোগাযোগের এক নতুন অধ্যায় হিসেবে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকবে।

(লেখাটি ইনস্ক্রিপ্ট থেকে নেওয়া)