আনুশেহ আনাদিল
দেশের মানুষ সারা বছরে সরকারকে বিপুল পরিমাণ অর্থ প্রদান করে। আমরা আয়কর দিই, ভ্যাট দিই; এছাড়া শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক এবং অসংখ্য অন্যান্য কর ও ফি দিয়ে থাকি। ব্যবসায়ীরা ভ্যাট সংগ্রহ করে তা সরকারের কাছে জমা দেয়। ব্যক্তিরা তাদের আয়ের ওপর কর দেন। আর সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই তাদের ভোগ করা পণ্য ও সেবার মাধ্যমে পরোক্ষ কর পরিশোধ করেন।
জানা যায়, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশে সরকারি রাজস্ব হিসেবে আনুমানিক ৪.১০ লাখ কোটি টাকা সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে আনুমানিক ১.৫৬ লাখ কোটি টাকা এসেছে ভ্যাট থেকে এবং ১.৪৩ লাখ কোটি টাকা এসেছে আয়কর থেকে। বাকি রাজস্বের বড় অংশ এসেছে মূলত শুল্ক ও অন্যান্য উৎস থেকে। অর্থাৎ শুধু ভ্যাট ও আয়কর মিলেই এক বছরে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব এসেছে। মোট ৪.১০ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের অর্থ হলো প্রতিদিন প্রায় ১,১২৪ কোটি টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে।
আমার প্রশ্ন: এই সব টাকা কোথায় যায়?
সরকারের কাছে আমার একটি খুবই সহজ প্রশ্ন: এই সব টাকা কোথায় যায়? আমি এই প্রশ্ন এজন্য করছি না যে আমি কর দিতে আপত্তি করি। শুধু 'জাত্রা'-এর মাধ্যমেই আমি প্রতি বছর প্রায় ১.৫ কোটি টাকা কর ও ভ্যাট দিই। এর পাশাপাশি আমি আমার ব্যক্তিগত কর এবং আমার অন্যান্য ব্যবসা ও কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট করও পরিশোধ করি। আইন অনুযায়ী যা দিতে হয়, আমি তা দিই। আর তাই আমার বিশ্বাস, আমার হাত থেকে টাকা বেরিয়ে যাওয়ার পর সেটির কী হয়—তা জানার পূর্ণ অধিকার আমার আছে।
আমার ব্যবসাকে যদি হিসাব রাখতে হয়, ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়, নথিপত্র সংরক্ষণ করতে হয় এবং সরকারের কাছে তার আর্থিক অবস্থা ব্যাখ্যা করতে হয়, তাহলে সরকার কেন আমাকে একই মাত্রার জবাবদিহি দেবে না?
এর পাশাপাশি সমান গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি প্রশ্ন আছে—সবার কাছ থেকে কি তাদের ন্যায্য অংশ আদায় করা হচ্ছে? বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে লাভজনক কোম্পানিগুলো কি আইন অনুযায়ী তাদের প্রাপ্য সম্পূর্ণ কর দিচ্ছে? রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসাগুলো কি ছোট ও মাঝারি ব্যবসার মতোই একই মানদণ্ডে বিচারিত হচ্ছে? যখন কোম্পানিগুলো কর ছাড়, মওকুফ বা বিশেষ সুবিধা পায়, তখন কি সেই সিদ্ধান্তগুলো জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করা হয়? কর ফাঁকি এবং দুর্নীতির মাধ্যমে কত সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়ে যাচ্ছে? ব্যবসায়ীরা কি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিয়ে অবৈধভাবে তাদের করের বোঝা কমাতে পারে? আর যদি এমন হয়, তাহলে কতটি মামলা তদন্ত, বিচার ও শাস্তির আওতায় আসে? আমি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ করছি না। আমি সরকারের কাছে সেই প্রমাণ উপস্থাপনের আহ্বান জানাচ্ছি, যা জনগণকে এই ব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখতে সাহায্য করবে।
একটি ন্যায্য করব্যবস্থা এমন নীতির ওপর দাঁড়াতে পারে না যে, যারা নিয়ম মানে তারা কর দেবে। আর যাদের অর্থ, প্রভাব বা যোগাযোগ বেশি, তারা দরকষাকষি করে বেরিয়ে যাবে। আমি যদি সততার সঙ্গে কর দিই, তাহলে আমি জানতে চাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় করপোরেশনগুলোও একই কাজ করছে কি না। আমি জানতে চাই, ব্যবসা যত ছোট ও দুর্বল হয়, আইন কি তত কঠোর হয়ে ওঠে; আর ব্যবসা যত বড় ও শক্তিশালী হয়, আইন কি তত নমনীয় হয়ে যায়।
জনগণ এর বিনিময়ে কী পেল?
বছরে ৪ লাখ কোটি টাকারও বেশি সংগ্রহ করার পর, সরকারকে পরবর্তী প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে: বাংলাদেশের মানুষ এর বিনিময়ে কী পেল? শিক্ষায় কত গেল? জনস্বাস্থ্য খাতে কত গেল? পুলিশ ও জননিরাপত্তায় কত গেল? সশস্ত্র বাহিনীতে কত গেল? সরকারি বেতন, ভাতা ও পেনশনে কত গেল? সড়ক, সেতু ও অবকাঠামোতে কত গেল? কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায় কত গেল? পরিবেশ সুরক্ষা ও আমাদের নদীগুলোতে কত গেল? সামাজিক সুরক্ষায় কত গেল? সরকারি ঋণের সুদ পরিশোধে কত গেল? আর অপচয়, দুর্নীতি, অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো চুক্তি এবং ব্যর্থ প্রকল্পের মাধ্যমে কতটা হারিয়ে গেল?
শুধু বাজেট ঘোষণা যথেষ্ট নয়। সাধারণ নাগরিকেরা বুঝতে পারে না—এমন হাজার হাজার পৃষ্ঠার কারিগরি নথি প্রকাশ করাও অর্থবহ স্বচ্ছতা নয়। বাংলাদেশের প্রতিটি করদাতার এমন একটি সহজ, জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্মে প্রবেশাধিকার থাকা উচিত, যেখানে দেশের অর্থ কীভাবে সংগ্রহ করা হয় এবং কীভাবে ব্যয় করা হয়—তা দেখা যাবে।
সরকারি রাজস্বের প্রতি ১০০ টাকা কোথায় যায়, তা আমাদের দেখতে পারা উচিত। সংগ্রহ থেকে বরাদ্দ, আর বরাদ্দ থেকে বাস্তব ব্যয়—এই পুরো পথ আমরা অনুসরণ করতে পারা উচিত। যদি কোনো সড়কের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়, তাহলে আমাদের টেন্ডার, ঠিকাদার, মূল ব্যয় এবং সেই ব্যয় কতবার বেড়েছে তা দেখান। আসলে কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে এবং সড়কটি শেষ হয়েছে কি না, তা দেখান। আর যখন জনগণের টাকা উধাও হয়ে যায় কিন্তু প্রতিশ্রুত জনসেবা আর দেখা যায় না, তখন কে দায়ী—তাও দেখান।
একই নীতি সরকারের সর্বত্র প্রযোজ্য হওয়া উচিত। হাসপাতালের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা হলে সেটি দিয়ে কী কেনা হয়েছে তা দেখান। শিক্ষার জন্য বরাদ্দ করা অর্থ কীভাবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের কাছে পৌঁছেছে তা দেখান। পুলিশের জন্য বরাদ্দ অর্থের কতটা বেতন, সরঞ্জাম, অবকাঠামো ও প্রশাসনে গেছে তা দেখান। সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে প্রকৃত জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য সুরক্ষিত রেখে করদাতাদের ব্যয়ের বৃহৎ খাতগুলো দেখতে পারা উচিত। যেকোনো মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা বা রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান অর্থ ব্যয় করলে নাগরিকদের সেই অর্থের গতিপথ অনুসরণ করতে পারা উচিত।
জনগণের টাকা এবং দ্বিমুখী জবাবদিহি
এটি আমাদের টাকা। এটি কোনো রাজনৈতিক দলের নয়, কোনো মন্ত্রীর নয়, কোনো আমলার নয়, এমনকি কোনো সরকারি ঠিকাদারেরও নয়—এটি বাংলাদেশের মানুষের। আর জবাবদিহি দুই দিকেই কাজ করতে হবে। সরকার করদাতাদের কাছ থেকে স্বচ্ছতা দাবি করে, করদাতাদেরও সরকারের কাছ থেকে স্বচ্ছতা দাবি করতে হবে। সরকার আমাদের আয় ঘোষণা করতে বলে, আমাদেরও দেখতে পারা উচিত সরকার কত সংগ্রহ করছে। সরকার আমাদের ব্যবসার হিসাব নিরীক্ষা করে, জনগণেরও সরকারের হিসাব নিরীক্ষা করতে পারা উচিত। সরকার আমাদের অর্থের হিসাব না দিতে পারলে আমাদের শাস্তি দেয়, কিন্তু সরকার যখন আমাদের অর্থের হিসাব দিতে ব্যর্থ হয়, তখন কে জবাবদিহির আওতায় আসে?
বাংলাদেশের ছোট ব্যবসাগুলো প্রতিদিন সংগ্রাম করে। আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি করি, বেতন দিই, ভাড়া দিই, সরবরাহকারীদের অর্থ পরিশোধ করি। আমরা ভ্যাট সংগ্রহ করি, হিসাব রাখি, মুনাফার ওপর কর দিই। আর ভুল করলে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ, নিরীক্ষা ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হয়। দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যবসাগুলোও একই ধরনের নজরদারির মুখে পড়ে কি না, এবং কর কর্মকর্তারা দুর্নীতির জন্য জবাবদিহির আওতায় আসেন কি না—তা জানার অধিকার আমাদের আছে। বাংলাদেশ আসলে কত রাজস্ব সংগ্রহ করা উচিত, বাস্তবে কত করছে এবং সেই টাকা কোথায় যাচ্ছে—তা জানার অধিকার আমাদের আছে।
স্বচ্ছতা সরকারের ওপর কোনো আক্রমণ নয়; স্বচ্ছতাই হলো জনগণের আস্থা অর্জনের উপায়। ভাবুন তো, যদি প্রতি বছর বাংলাদেশের মানুষ একটি সহজ জাতীয় বিবৃতি পেত, যেখানে লেখা থাকত: আপনাদের কাছ থেকে আমরা এই পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করেছি। এরা কর পরিশোধ করেছে এবং এরা কর ছাড় পেয়েছে। আপনাদের টাকা আমরা এই এই খাতে ব্যয় করেছি। আমরা এই বিষয়গুলো অর্জন করেছি এবং এইগুলোতে ব্যর্থ হয়েছি। আর যারা জনগণের টাকা চুরি করেছে বা অপব্যবহার করেছে, তাদের এই পরিণতি হয়েছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাছ থেকে নাগরিকদের এমনই জবাবদিহি প্রত্যাশা করা উচিত। আমি কর দিই। লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশিও তাদের কর দেন—প্রতিদিন, সরাসরি ও পরোক্ষভাবে। ২০২৫–২৬ সালে সরকার আনুমানিক ৪.১০ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহ করেছে। তাই বাংলাদেশ সরকারের কাছে আমার দুটি সহজ প্রশ্ন:
আপনারা আমাদের আয়ের প্রতিটি টাকা হিসাব করতে বলেন। তাহলে আপনারা কি আমাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্রতিটি টাকার হিসাব দেবেন?
আর আপনারা কি নিশ্চিত করছেন যে বাংলাদেশের ক্ষুদ্রতম দোকানদার থেকে শুরু করে সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে প্রভাবশালী করপোরেশন—সবাই সত্যিই একই নিয়ম মেনে চলছে?
- আনুশেহ আনাদিল: সংগীতশিল্পী ও লেখক