হাসান মামুন
শেখ হাসিনা সরকারের তো বিদায় নেওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সেই নির্বাচন হলে কি তিনি ক্ষমতায় ফিরতে পারতেন? রেকর্ড সেটা বলে না। বলে না বলেই হাসিনা গং ওই ব্যবস্থা বাতিল করে দিয়েছিল। যদিও শুরুতে বলা হয়েছিল, ব্যবস্থাটির সংস্কারই তাদের লক্ষ্য। সেজন্য কিছু কাজও হয়েছিল সংসদের আওতায়। তারপর একটা সময়ে এসে ‘শেখের বেটি’ যা করার তা-ই করলেন। বিচার বিভাগের প্রশ্নবিদ্ধ সহায়তাও পেলেন তিনি।
এটা ছিল শেখ হাসিনার মূল অপরাধ। গণতন্ত্র বলতে এখানে নির্বাচন ছাড়া তো তেমন কিছু ছিল না। সুষ্ঠু নির্বাচনে জাতীয় সংসদ গঠন হলেও তা কার্যকর হতো না। বিরোধী দলও রাজপথে চলে যেত দৌড়ে দৌড়ে। স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হয়নি কখনোই। সেখানে কায়েম ‘এমপিরাজ’। প্রতিষ্ঠিত হয়নি সরকারের জবাবদিহি। আসেনি সুশাসন। তারপরও নির্বাচনটা সুষ্ঠুভাবে হওয়ার একটা ব্যবস্থা করা গিয়েছিল। তাতে ক্ষমতাসীন দলকে অপশাসনের দায়ে নামিয়ে দেওয়ার একটা সুযোগ অন্তত ছিল। সেটাকে সংবিধানের অংশ করতে আবার শেখ হাসিনার দলই রেখেছিল মুখ্য ভূমিকা। তারপর সুযোগ বুঝে আবার সেই ব্যবস্থাটি নেই করে দেওয়া হলো। কেন, সেটা কাউকে আর বুঝিয়ে বলতে হবে না।
শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবুর রহমানও গণতন্ত্রের ভিত্তিটা ধসিয়ে দিয়েছিলেন রাতারাতি বাকশাল (বাংলাদেশ কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগ) কায়েম করে। ওই একদলীয় ব্যবস্থায় তাকে শান্তিপূর্ণভাবে অপসারণের সুযোগ ছিল অনুপস্থিত। গণতান্ত্রিক অধিকারের লড়াই করতে করতে একটা জনগোষ্ঠীর স্বাধীনতা অর্জনের মতো ঘটনা ঘটেছিল যার নেতৃত্বে, তিনিই কিনা ক্ষমতা হাতে পেয়ে বাকশাল কায়েম করলেন। কারা তাকে ভুল বুঝিয়েছিল—এসব বলারও কোনো মানে নেই। কাজটার দায় তাঁরই।
তাঁর কন্যাও ওয়ান ইলেভেনের সুবাদে বিপুলভাবে জিতে এসে একটু ঘুরিয়ে বাকশালটাই কায়েম করলেন। অবশ্য কেউ বলেনি, তাঁকে ভুল বুঝিয়ে কেউ এ পথে নিয়ে গিয়েছিল। তাঁকে বোঝানোর সুযোগ তো ছিল না। তিনি বরং সবাইকে বোঝাতেন। প্রতিবেশী ভারত থেকে ঘুরে এসে কেবল কিছু সিদ্ধান্ত বদলেছিলেন। তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ ছিলেন ২০১৪ সালের নির্বাচনটা ইচ্ছামতো করতে ভারতের প্রতিনিধি দাঁড়িয়ে থেকে সহায়তা জুগিয়েছিলেন বলে। সম্পর্কটাকে তিনি নিয়ে গিয়েছিলেন ‘অনন্য উচ্চতা’য়। ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে গলা উঁচু করাটাও তাঁর আমলে ছিল অপরাধতুল্য। নরেন্দ্র মোদির সফরের সময় হওয়া বিক্ষোভ দমনে তাঁর লেলিয়ে দেওয়া পুলিশ আশ্রয় নিয়েছিল নিষ্ঠুরতার।
প্রকৃত বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে রেখে এক-একটি তামাশার নির্বাচনের আগে-পরে গুম-খুনের সংস্কৃতিও জারি রেখেছিল হাসিনা গং। মানুষের মুখ বন্ধ করতে নতুন আইনও বানাতে হয় তাঁকে। মোসাহেব তৈরি করতে হয় সাংবাদিকসহ সব গুরুত্বপূর্ণ পেশায়, যাদের কাজ ছিল হাসিনাতন্ত্রের পক্ষে ‘সম্মতি’ উৎপাদন। কিংবা তাঁর কুসুম কুসুম বিরোধিতা করে তাঁকেই আবার ‘বিকল্পহীন’ বলে প্রচার করা। বিদ্যুৎ, মেগা প্রকল্প ও ব্যাংকের মতো খাতে নজিরবিহীন আর্থিক অপরাধের আয়োজনও মানুষকে বেয়াকুফ বানিয়ে দিয়েছিল। উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছিল বৈষম্য। এর পক্ষেও খাড়া করা হচ্ছিল যুক্তি। বছরের পর বছর মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে বলা হতো, এটা তো ‘আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি’!
এ-সমস্ত কিছুর মধ্যেই ২০১৮ সালে বিরোধী দল বিএনপি নির্বাচনে গিয়েছিল হাসিনা সরকারের অধীনেই। সেটা ছিল সরকার ও ক্ষমতাসীন দলটির সংশোধিত হওয়ার শেষ সুযোগ। ৫০ শতাংশ আসনেও স্বাভাবিক নির্বাচন হতে দিলে বিএনপি অন্তত প্রধান বিরোধী দল হয়ে একটা ভূমিকা রাখতে পারতো সংসদে। তার ভেতর দিয়ে হয়তবা গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের একটা পথ বের করা যেত। সেই সুযোগটিও বানচাল করে দেওয়া হয় ‘রাতের ভোট’ আয়োজন করে। বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূতও একবার সম্ভবত মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলেন কথাটা। কথিত সেই ভোটের আগে তুচ্ছ মামলায় জেলে নেওয়া হয় খালেদা জিয়াকে। আর দখল করা হয় সবচেয়ে সফল বেসরকারি ব্যাংক। দেশ কোন দিকে যাচ্ছে, এগুলো ছিল তারই সংকেত। কুখ্যাত ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টও করা হয় সেই নির্বাচনের আগ দিয়ে।
শেখ হাসিনার আমলে মুক্তিযুদ্ধকে খেয়ে ফেলে বলা হচ্ছিল, বাকি সবাই ‘রাজাকার’। সরকারের কাজের বিরোধিতা করলে মুক্তিযোদ্ধাকেও বলা হতো ‘জামায়াত-শিবির’। ন্যায়সঙ্গত সামান্য কিছু দাবি তুললেও বলা হতো ‘ষড়যন্ত্রকারী’। দু’চার-পাঁচজন প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়ালেও তাতে আতংকিত হয়ে লেলিয়ে দেওয়া হতো হেলমেট বাহিনী। নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামা শিশু-কিশোরদের রক্তাক্ত করা হয়েছিল সবার চোখের সামনে। ১৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সী দেশের সম্পদ বলে বিবেচিত অংশটাকেই দেখা হচ্ছিল সন্দেহের চোখে। পদে পদে সুনাগরিকদের করা হচ্ছিল অপমান। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার পরোয়া না করে কেবল ভারতের সহায়তায় পার পেয়ে যাওয়ার কথা হাসিনা গং বলতে শুরু করেছিল প্রকাশ্যেই। বন্ধুবেশে হাজির অভিভাবকরাও তাদের সংযত হতে বলেনি কিংবা করতে পারেনি। এতই বেপরোয়া হয়ে গিয়েছিল তারা।
এমন একটা দেশে গণঅভ্যুত্থান হবে না তো কী হবে?
দুটি ঘটনার কথা এখানে উল্লেখ করব।
এক. গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জের এক রিকশাচালক গণঅভ্যুত্থানের মাস তিনেক আগে আমাকে বলেছিলেন, হাসিনাকে আপনারা নামাতে পারবেন না। এক লাখ লোক মারতে হলেও মেরে উনি ক্ষমতায় থাকবেন।
এর কিছুটা প্রমাণ তো দেখেছি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে। পতনের চূড়ান্ত মুহূর্তেও, আত্মীয়-স্বজনদের সবাইকে বিদেশ পাঠিয়ে দিয়ে তিনি চেয়েছিলেন সেনাবাহিনী নির্বিচারে আন্দোলনকারীদের হত্যা করুক। তার আগে হেলিকপ্টার উড়িয়েছিলেন খুঁজে খুঁজে মারার জন্য– যেমনটা করা হয় যুদ্ধক্ষেত্রে; অধিকৃত আফগানিস্তান, গাজার মতো জায়গায়।
দুই. গণঅভ্যুত্থানের বছর তিনেক আগে এক সিএনজি স্কুটারচালক অবশ্য বলেছিলেন, হাসিনার পতন হলে রাস্তাঘাটে কোনো পুলিশ থাকবে না। ট্রাফিক পুলিশও না। সেনাবাহিনীকে এসে থানা পাহারা দিতে হবে। নাম ধরে ধরে কিছু ভবন পুড়িয়ে দেওয়ার কথাও তিনি বলেছিলেন। স্পর্শকাতর বলে সেগুলোর নাম এখানে নিলাম না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দ্বিতীয় লোকটির কথা কতবার যে মনে এসেছে! তার মুখ অবশ্য স্মরণে নেই। এখন মনে হয়, ভাড়া পরিশোধের সময়ও মুখটি যদি ভালো করে দেখতাম, তাহলে হয়তবা স্মৃতিপটে আঁকা থাকতেন তিনি।
আমরা তো জানি, এসব মানুষ জুলাই আন্দোলনে অকাতরে নেমে এসেছিল হাসিনাশাহীর পতন ঘটাতে। জীবনেরও পরোয়া করেনি। শেখ হাসিনার বহুল আলোচিত সেই প্রেস কনফারেন্সের পর দিবাগত রাতে ঢাবি ক্যাম্পাসে বের হওয়া মিছিল, নাকি তার পরদিন ভিসির বাসভবনের সামনে ছাত্রলীগের গুন্ডাদের নির্বিচার প্রহারের দৃশ্য, নাকি রংপুরে আবু সাঈদের বীরোচিত আত্মদানের মুহূর্ত– কোনটি তাদের শিক্ষার্থীদের পাশে নেমে আসতে বাধ্য করেছিল, সেটা বলা মুশকিলের। শুধু বলতে হয়, কোনো না কোনো ইস্যুতে মানুষ নেমে আসতই স্রোতের মতো। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো। পুড়িয়ে দিতই শেখ হাসিনার ‘অ্যাবসলিউট পাওয়ার’; তাঁর বানিয়ে তোলা সিংহাসন। তাঁকে পালাতেই হতো সেখানে, যেখানে হতে পারে তাঁর নিরাপদ আশ্রয়।
কাদের নেতৃত্বে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে, সেটা দেখেছে মানুষ। কে কতটা কী ভূমিকা রেখেছে, সেটা নিয়ে কুতর্কও হতে দেখা গেছে। গণঅভ্যুত্থানের পর বেশি করে কাদের উত্থান ঘটেছে, সেটাও অস্পষ্ট নয়। অর্থনীতি স্থবির হয়েছে। অরাজকতা বেড়েছে। বাংলাদেশ প্রবেশ করেছে নতুন ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। এ অবস্থায় চাইলেও সুষ্ঠুভাবে দেশ পরিচালনা করা কঠিন। এদিকে রাষ্ট্র সংস্কারে অগ্রগতি হয়নি মোটেও। কতটা কী হবে, সেটাও অস্পষ্ট। তবে এসবের পাশাপাশি শেখ হাসিনা গংয়ের পতন ঘটেছে, এটা জ্বলন্ত সত্য। তারা ও তাদের নিয়োজিত মোসাহেবরা তো এই বিশ্বাসও নষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, হাসিনার পতন সম্ভব। ‘দিল্লি আছে, আমরা আছি’– ২০২৪ সালের ডামি নির্বাচনের আগে ওবায়দুল কাদেরের এমন উক্তি কি ভুলে যাওয়া সম্ভব?
দিল্লি এখন কী করে, সেটাও দেখার বিষয়। তাদের সব কিছু পুনর্বিবেচনা করা উচিত। একটা রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের পথ বেয়ে বাংলাদেশ অন্তত নির্বাচনী গণতন্ত্রে ফিরেছে। এর ভেতর দিয়ে আমরা পূর্ণাঙ্গ গণতন্ত্রের দিকে যেতে পারব কিনা, সেটা অবশ্য বিরাট প্রশ্ন। এর নিষ্পত্তি করতে হবে মাঠে উপস্থিত সব পক্ষকে—যার যার ভূমিকা রেখে।
মাঠে অবশ্য আওয়ামী লীগের ‘নিরপরাধ’ অংশটাও অনুপস্থিত। হাতে যদি ফৌজদারি কিংবা আর্থিক অপরাধের রক্ত/কালিমা লেগে না থাকে, তবে তাদের চেষ্টা করা উচিত অনুশোচনার ভেতর দিয়ে মাঠে ফেরার। অনুশোচনা তাদেরও করা উচিত, যারা সব দেখেশুনেও সেই আওয়ামী লীগ করতেন—যেটি অধঃপতিত। যে দল নির্বাচন ব্যবস্থাটিও দেশ থেকে উচ্ছেদ করেছিল। কেড়ে নিয়েছিল নিম্নতম নাগরিক অধিকার। তারপর যা যা করতে হয়, করেছিল। অন্যের কবর খুঁড়তে গিয়ে কবর খুঁড়েছিল আসলে নিজের।
নজিরবিহীন স্বৈরতন্ত্র কায়েম করতে গিয়ে যারা উৎখাত হয়ে পালিয়েছে, তাদের কবরও হয়ত হবে না এদেশে। তবে ‘অপরাধ করিনি’ বলে বিশ্বাসে ভর দিয়ে যারা রয়ে গেল, তাদের একটা রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রয়েছে। অবস্থান বদলে অর্জিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার কাজে যোগ দিয়ে তারা নিশ্চয়ই পারে জনগণের প্রত্যাশার দাম দিতে।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট