আহমেদ সোহেল (বাপ্পী)
এই লেখাটি লিখতে বসে আমার হাত থেমে গেছে বারবার। কি-বোর্ডের ওপর আঙুল রেখে শুধু তাকিয়ে থেকেছি শূন্যে। লেখার ছন্দ হারিয়ে ফেলেছি। আবেগ আমাকে বারবার গ্রাস করেছে, উত্তেজনা আমাকে কাঁপিয়েছে, বিমর্ষতা আমাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। কারণ, আমার পাশের ঘরেই এখন খেলছে আমার আট বছরের মেয়ে সোহা। প্যারিসের এই নিরাপদ ঘরে সে তার পুতুল সাজাচ্ছে, গুনগুন করছে। বাংলা সে বোঝে। তার বাবার দেশ, মায়ের দেশ। বাংলাদেশকে সে ভালোবাসে। কিন্তু ‘ধর্ষণ’ শব্দটির অর্থ সে জানে না। আমি চাই না সে জানুক। তাই পর্দা টেনে দিয়ে, বুকের ভেতর পাথর চেপে বসে আছি; লিখছি আর মুছছি, লিখছি আর মুছছি।
কারণ, যা লিখছি তা শুধু একটি সংবাদ নয়। এটি সোহার বয়সী একটি শিশুর গল্প। রামিসা আক্তার। বয়স সাত বছর। ঢাকার পল্লবীতে, তার মায়ের ডাকের মাত্র কয়েক হাত দূরে; সেই শিশুকে ধর্ষণ করে ছুরি দিয়ে মাথা বিচ্ছিন্ন করে হত্যা করা হয়েছে।
বাবা হিসেবে আমি এই লেখা লিখতে পারছিলাম না। আমার জীবনে এটি সম্ভবত প্রথম ঘটনা, যেখানে আমি সোহার কোনো প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছি। সে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘বাবা, তুমি কি কাঁদছ?’ আমি বলেছিলাম, ‘না মা, চোখে ধুলো পড়েছে।’ সেই মিথ্যাটুকু বলতে গিয়েও গলা কেঁপে গিয়েছিল। তাকে কীভাবে বোঝাই যে দেশটাকে সে এত ভালোবাসে, সেই দেশে তার বয়সী একটি মেয়েকে এইভাবে হত্যা করা হয়েছে? কীভাবে বলি? একজন বাবা হিসেবে আমার ভুবন ভেঙে যাচ্ছিল; অথচ আমাকে হাসতে হচ্ছিল, স্বাভাবিক থাকতে হচ্ছিল।
ধীরে ধীরে শুধু একটি সমাজ নয়, যেন পুরো মানবতাকেই ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। অসুস্থ মানসিকতার বিষাক্ত ধোঁয়ায় ভারী হয়ে উঠছে চারপাশের আকাশ-বাতাস। মানুষের ভেতরের কোমলতা হারিয়ে যাচ্ছে, নির্মমতা হয়ে উঠছে স্বাভাবিক, আর অমানবিকতা লিখে চলেছে তার সবচেয়ে জঘন্য ইতিহাস। যখন এই ঘটনার ভিডিও দেখছেন, একবার ভাবুন ঠিক সেই মুহূর্তে আপনার মেয়ে, বোন, ভাগ্নি কিংবা কাছের মানুষের সঙ্গে একই ঘটনা ঘটলে কেমন লাগত? পারবেন সেটা অনুভব করতে?
একটি সাত বছরের নিষ্পাপ শিশু; যে বয়সে পুতুল নিয়ে খেলার কথা, বাবার হাত ধরে স্কুলে যাওয়ার কথা, মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়ার কথা; সেই শিশুকে নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়া হলো। আর তার বাবার বুকফাটা আর্তনাদ আজ আমাদের সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর বাস্তবতাকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তিনি বিচারও চান না। কারণ তিনি জানেন, এই দেশে বিচার চাওয়াটাও যেন এক ধরনের বিলাসিতা। কতটা ভেঙে গেলে, কতটা অসহায় হয়ে গেলে একজন বাবা তার সন্তানের হত্যার বিচার চাওয়ার আশাটুকুও হারিয়ে ফেলেন? এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারব না। শুধু জানি; এই প্রশ্নটি আমাদের সকলের বিরুদ্ধে।
গত ১৯ মে, মঙ্গলবার সকাল। রামিসার মা তার মেয়েকে স্কুলে পাঠাবেন বলে খুঁজছিলেন। পাশের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে পড়ে থাকতে দেখলেন মেয়ের ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়া। দরজায় নক করলেন। কেউ খুলল না। ভেতরে তখন ঘটে চলেছে ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস হত্যাকাণ্ড। আসামি সোহেল রানা যেন পালাতে পারে, সেজন্য তার স্ত্রী স্বপ্না ভেতর থেকে দরজা আটকে রইল। আর একটি মা বাইরে দাঁড়িয়ে নক করতে থাকলেন, জানতেও পারলেন না যে তার মেয়ে তখন আর নেই।
এই দৃশ্যটি পড়তে গিয়ে আমি থামতে বাধ্য হয়েছি। বুকের ভেতর কেউ যেন মুষ্টি দিয়ে আঘাত করছিল। একজন মা; যার মেয়ে মাত্র কয়েক হাত দূরে; কিছুই জানতে পারলেন না। এই অসহায়ত্বের কোনো ভাষা নেই। পরে পুলিশ উদ্ধার করেছে রামিসার মস্তকবিহীন দেহ, খাটের নিচ থেকে। বিচ্ছিন্ন মাথা পাওয়া গেছে শৌচাগারে।
আমি আর লিখতে পারছিলাম না। থামলাম। জানালা দিয়ে তাকালাম বাইরে; প্যারিসের আকাশ পরিষ্কার। সোহা ঘরে খেলছে। তার অজান্তেই আমার চোখ ভিজে গেল।
এর পরদিন, রামিসার বাবা আবদুল হান্নান মোল্লা গণমাধ্যমের সামনে এলেন। তার মুখ ভাঙা। চোখ শূন্য। কণ্ঠ কাঁপছে; কিন্তু ভেতরে যে আগুন, সেটা স্পষ্ট। তিনি বললেন, আমি বিচার চাই না। আপনারা বিচার করতে পারবেন না। আপনাদের বিচার করার কোনো রেকর্ড নেই। এটা বড়জোর ১৫ দিন চলবে। এরপর আরেকটা বড় ঘটনা ঘটবে, এটা ধামাচাপা পড়ে যাবে। শেষ।
এই কথাগুলো পড়ে আমি স্তব্ধ হয়ে গেছি। একজন বাবা, যার সাত বছরের মেয়েকে এইভাবে হত্যা করা হয়েছে, তিনি বিচার চাইছেন না। কারণ তিনি জানেন, বিচার হবে না। এর চেয়ে বড় অভিযোগ কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হতে পারে না। এই একটি বাক্যে একটি পুরো জাতির বিচারব্যবস্থার মৃত্যুসনদ লেখা হয়ে গেছে।
এ কেমন রাষ্ট্র, এ কেমন সমাজ; যেখানে মানুষ অপরাধের চেয়ে বিচারহীনতাকেই বেশি ভয় পায়? নিরাপত্তাহীনতা আর অসহায়ত্ব কোন গভীর অন্ধকারে গিয়ে পৌঁছেছে যে মানুষের কান্নাও আজ আর কাউকে নাড়িয়ে দেয় না? একটি শিশুর নিথর দেহের পাশে বাবার সেই করুণ আর্তনাদ কি সত্যিই দায়িত্বশীলদের কানে পৌঁছায় না? নাকি এই সমাজ এতটাই পাথর হয়ে গেছে যে শিশুদের রক্তেও আর বিবেক জাগে না?
কিন্তু এই অবিশ্বাস কি একদিনে তৈরি হয়েছে? না, এটি তৈরি হয়েছে বছরের পর বছর ধরে, একটির পর একটি ঘটনায়, প্রতিটি অবিচারের স্তরে স্তরে।
নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছরের আমেনা আক্তার; সরিষার হলুদ ফুলের মাঝে পড়ে ছিল তার নিথর দেহ। প্রথম ধর্ষণের পর পরিবার সালিশে গিয়েছিল, ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছিল প্রভাবশালীরা। বাবা অভিযোগ করলেন; তাই অস্ত্রের মুখে বাবার হাত থেকে মেয়েকে ছিনিয়ে নিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হলো। সেই বাবাও কি বিচার পেয়েছেন? প্রধান আসামি আজও পলাতক।
নোয়াখালীর আছিয়া; সেই গৃহবধূর ওপর পাশবিক নির্যাতনের ভিডিও সারাদেশকে কাঁদিয়েছিল। মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়েছিল। মামলা হয়েছিল। তারপর? আরেকটি ঘটনা এলো, আছিয়াকে ভুলে গেল।
আর রসু খাঁ? ২০০৯ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সেই নরঘাতক, যে ১১ জন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যা করেছিল; তার বিচার কোথায় আজ? সেই মামলা কোন গহ্বরে হারিয়ে গেছে, সাধারণ মানুষ জানে না।
এই নামগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এগুলো প্রমাণ; প্রমাণ যে এই দেশে বিচার চাওয়াটাও বিলাসিতা।
এই বিচারহীনতার পেছনে আছে একটি সুশৃঙ্খল অপব্যবস্থা। থানায় মামলা দায়ের করতে গেলে অর্থ লাগে। এটি বাংলাদেশে কারও অজানা নয়। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট প্রভাবশালীদের চাপে বদলে যাওয়ার অভিযোগ পুরনো। আদালতে মামলা উঠলে শুনানি পিছিয়ে যায়, সাক্ষীরা ভয় পায়, ভুক্তভোগী পরিবার চাপের মুখে চুপ করে যায়।
জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিলের (ইউএনএফপিএ) মূল্যায়ন বলছে, বাংলাদেশে যৌন সহিংসতার মাত্র তিন থেকে পাঁচ শতাংশ ঘটনা আনুষ্ঠানিক অভিযোগে পরিণত হয়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সাক্ষী সুরক্ষায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা প্রায় অনুপস্থিত। ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের রুল অব ল’ ইন্ডেক্সে ১৪০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে নিচের দিকে।
আর এই ব্যর্থ ব্যবস্থার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকে রাজনৈতিক ছায়া। নরসিংদীর আমেনার মামলায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার নাম গ্রেপ্তার তালিকায় এসেছে। অপরাধী যদি ক্ষমতার ছায়ায় থাকে, তাহলে মামলার গতি ধীর হয়। এটি এই দেশের চিরচেনা সত্য।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান বলেছেন, প্রথম অপরাধের বিচার না হলে দ্বিতীয় অপরাধের সাহস জন্মায়। বাংলাদেশে এই সত্য বারবার প্রমাণিত হচ্ছে রক্তের বিনিময়ে।
মানবতা আজ সত্যিই গভীর অসুস্থতায় আক্রান্ত। আর আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে মানুষ হওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছি। যে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে ছোট নাগরিককে রক্ষা করতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের দাবি অর্থহীন।
সারাদেশের মানুষ আজ রাস্তায়। সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল। একটাই কথা, ‘উন্নয়ন চাই না, জীবনের নিরাপত্তা চাই।’
এই স্লোগান কোনো দলের নয়। এটি একটি জাতির বুকফাটা আর্তি। পদ্মা সেতু আছে, মেট্রোরেল আছে; কিন্তু একটি সাত বছরের শিশু তার মায়ের ডাকের মাত্র কয়েক হাত দূরে নিরাপদ নয়। এই সত্যের সামনে কোনো উন্নয়নের পরিসংখ্যান দাঁড়াতে পারে না।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। আন্তর্জাতিক ইসলামিক চিন্তাবিদ ড. তাহের-উল-কাদরি বলেছেন, একজন নিরপরাধকে হত্যা করা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যার সমান। ধর্মীয় বিধান ও মানবিক বিবেক, দুটোই একই সত্য বলছে। শুধু রাষ্ট্র শুনছে না।
এই লেখা শেষ করতে গিয়ে আমি আবার সোহার দিকে তাকালাম। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছোট্ট মুখটা শান্ত। নিশ্বাস পড়ছে ধীরে ধীরে। রামিসাও এইরকমই ঘুমাত একসময়। তার মাও হয়তো এভাবেই তাকিয়ে থাকতেন মেয়ের মুখের দিকে; সেই শান্ত ঘুমন্ত মুখের দিকে, যে মুখে স্বপ্ন ছিল, ভবিষ্যৎ ছিল। আজ সেই মা খালি ঘরে বসে আছেন। সেই ছোট্ট স্যান্ডেল জোড়া হয়তো এখনো পড়ে আছে কোথাও। রামিসার স্কুলব্যাগটা হয়তো এখনো দরজার পাশে ঝুলছে যে স্কুলে সে আর কোনোদিন যাবে না।
আমি জানি না সোহাকে একদিন এই লেখা পড়াতে পারব কিনা। কিন্তু যদি পারি তাহলে বলব, তোমার বাবা চুপ থাকেননি। কারণ চুপ থাকা মানে অপরাধীর পাশে দাঁড়ানো। নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ নয়।
রামিসার বাবার সেই কথা আমাদের তাড়া করুক প্রতিটি রাতে- ‘আমি বিচার চাই না। এটা বড়জোর ১৫ দিন...এরপর ধামাচাপা পড়ে যাবে।’
তাকে ভুল প্রমাণ করতে হবে। এবার নয়। এই একটিবার নয়। চিরতরে। রামিসার হত্যার বিচার চাই। আমেনার জন্য বিচার চাই। আছিয়ার বিচার চাই। আর চাই, পরবর্তী রামিসার জন্ম না হোক এই দেশে।
একটি রাষ্ট্র তখনই বাঁচে, যখন সে তার সবচেয়ে ছোট নাগরিককে বাঁচাতে পারে। সাত বছরের রামিসাকে বাঁচাতে পারেনি এই রাষ্ট্র। এই লজ্জা ঢাকার কোনো পথ নেই।
লেখক: মানবাধিকার কর্মী, লেখক, গবেষক ও পর্যবেক্ষক; সীমান্তহীন গণতন্ত্র