আমীন আল রশীদ
পুলিশের পোশাকের পর এবার বদলে যাচ্ছে র্যাবের নাম। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে পুলিশের পোশাকের রঙ বদল করা হয়। গত বছরের নভেম্বর থেকে ধাপে ধাপে লৌহবর্ণ (আয়রন গ্রে) ইউনিফর্ম চালু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে মহানগর ও বিশেষায়িত ইউনিটে তা কার্যকর হয় এবং পরবর্তী সময়ে জেলা ও রেঞ্জ পর্যায়ে বিস্তারের পরিকল্পনা ছিল।
ওই পরিবর্তনকে বাহিনীর আধুনিকায়ন ও নতুন ভাবমূর্তি গঠনের অংশ হিসেবে দেখা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবায়নের পরপরই নতুন পোশাক নিয়ে অসন্তোষ দেখা দেয়। মাঠপর্যায়ের অনেক সদস্যের অভিযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। কেউ কেউ বলেন, রঙের কারণে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে। আবার দীর্ঘদিনের প্রচলিত খাকি পোশাক থেকে সরে আসায় বাহিনীর ঐতিহ্য ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়। ব্যবহারিক দিক থেকেও আবহাওয়া ও দায়িত্বের ধরন অনুযায়ী পোশাকটি কতটা উপযোগী— তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। (সমকাল, ২১ এপ্রিল ২০২৬)।
এ অবস্থায় বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পরে পুলিশের আগের পোশাক ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। নতুন প্রস্তাবে ইউনিট ভেদে শার্টের রঙে ভিন্নতা আনা হচ্ছে। মহানগর পুলিশের জন্য হালকা জলপাই এবং অন্যান্য ইউনিটের জন্য গাঢ় নীল শার্ট নির্ধারণের চিন্তা রয়েছে। সব ক্ষেত্রেই প্যান্ট খাকি রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে একরঙা পোশাকের পরিবর্তে সমন্বিত রঙের ইউনিফর্ম চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা ব্যবহারিক সুবিধা ও আলাদা পরিচিতি— দুটিই নিশ্চিত করবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রশ্ন হলো, অন্তর্বর্তী সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে কেন পুলিশের পোশাক পরিবর্তন করলো? পোশাক বদলালেই পুলিশের চরিত্র বা আচরণ বদলে যাবে; পুলিশে অনেক বেশি পেশাদার ও মানবিক হবে— এই ধারণাটা কার মাথা থেকে এসেছিল?
পুলিশের পোশাকের মতোই র্যাবের নাম পরিবর্তনেরও সিদ্ধান্ত হয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেই। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন কয়েক আগেই সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে তৎকালীন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সংস্থাটির নতুন নাম হবে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ বা এসআইএফ। সবশেষ গত সোমবার (১৮ মে) র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও র্যাবের নাম পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন।
অবশ্য অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত গুম কমিশন এই বাহিনীটি বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর গুলশানে গুম কমিশনের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘‘বলপূর্বক গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অবসান ঘটাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনগত সংস্কারের জন্য তারা যেসব সুপারিশ করেছেন, সেখানে র্যাব বিলুপ্তির বিষয়টিও রয়েছে।’’
প্রসঙ্গত, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালে গঠিত পুলিশের এই এলিট ফোর্স অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাস, বিশেষ করে জঙ্গি ও উগ্রপন্থা দমনে সাফল্যের শুরুতে দারুণভাবে প্রশংসিত হয়। অনেক বড় বড় সন্ত্রাসী ও অপরাধী র্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়। ওইসব ঘটনা বিনাবিচারে হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হলেও অপরাধ দমনে সাধারণ মানুষের কাছে র্যাব দ্রুতই আস্থা অর্জন করে। কিন্তু ধীরে ধীরে তারা বিতর্কিত হতে শুরু করে। পুলিশের মতো এই বাহিনীকেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও বলেছেন, র্যাবকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কারণেই বিতর্কিত হয়েছে। পক্ষান্তরে এটিও ঠিক যে, র্যাবকে যখনই সরকার পুলিশের মতো ব্যবহার করেছে, তখনই এই বাহিনীর সদস্যদের একটি বড় অংশ নানারকম অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে। কারণ যখনই কোনও বাহিনী বা সংস্থাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সেই বাহিনীর ভেতরে আর নৈতিকতা থাকে না। চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ে। তাদের জবাবদিহির জায়গা সংকুচিত হয়ে যায়। তারা নিজেদেরকে আইনের ঊর্ধ্বে ভাবা শুরু করে। র্যাবের ক্ষেত্রে তা-ই হয়েছে এবং নারায়ণগঞ্জের সাত খুনসহ অনেক ঘটনায় বাহিনীটি বিতর্কিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের ঘটনাটি অনেক বেশি ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর হওয়ায় ওই ঘটনায় বিচার হয়েছে। কিন্তু বিচারের বাইরে থেকে গেছে আরও অসংখ্য ঘটনা।
র্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ জোরালো হতে থাকায় ২০২১ সালে বাহিনীর সাবেক ও তৎকালীন সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ) ও পররাষ্ট্র দফতরের এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা কর্মকর্তাদের মধ্যে র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদও ছিলেন। র্যাবের ওপর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এখনও বহাল। যদিও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ মনে করেন, কয়েকজন কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের জন্য প্রতিষ্ঠান দোষী হতে পারে না।
তার কথায় এটি স্পষ্ট যে, সরকার বাহিনী হিসেবে র্যাবকে বিলুপ্ত করবে না। কিন্তু এই বাহিনীর যে কাজ, সেটি অব্যাহত রাখবে। আবার বাহিনীটি যাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার আওতায় না থাকে, সেটিও নিশ্চিত করা দরকার। এসব বিবেচনায় নিয়েই র্যাবের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।
যে বাহিনীর অনেক সদস্যের হাতে নিরীহ মানুষের রক্তের দাগ, যে বাহিনী বিনা বিচারে মানুষ হত্যার জন্য অভিযুক্ত, যে বাহিনীর অনেকের বিরুদ্ধেই একপক্ষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা খেয়ে আরেকপক্ষের লোককে ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ ভুরি ভুরি— সেই বাহিনীর নাম বদলালেই তাদের খাসলত বদলে যাবে কিনা, সেটি বড় প্রশ্ন।
এর কিছুটা জবাব অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন। তিনি জানান, এলিট ফোর্স পরিচালনা এবং তাদের জবাবদিহি নিশ্চিতে আইন করা হবে। বাস্তবতা হলো, র্যাব যদি ঠিকমতো পুলিশ আইনটাই মেনে চলতো বা পুলিশ আইনেই যদি তাদেরকে সঠিকভাবে পরিচালনা করা যেতো, তাহলেও তারা এত বিতির্কিত হতো না। কেন বিদ্যমান আইনের মধ্যে রেখে তাদেরকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেল না। কেন তাদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার তথা প্রতিপক্ষ দমনে সশস্ত্র ক্যাডার হিসেবে ব্যবহার করা হলো এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে কিনা, সেই প্রশ্নের উত্তর জানা জরুরি।
দ্বিতীয়ত, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গঠিত পুলিশ সংস্কার কমিশন এই বাহিনীর সংস্করে যে ১১৩টি সুপারিশ দিয়েছিল, বর্তমান সরকার কি সেই সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করবে বা ওই প্রতিবেদন আমলে নেবে? জুলাই অভ্যুত্থান এবং তার আগেও বছরের পর বছর ধরে যে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপারে সাধারণ মানুষের এন্তার অভিযোগ ছিল, সেই বাহিনীর ভেতরে কি আদৌ কোনও ইতিবাচক পরিবর্তন আসছে বা এই বাহিনীকে সত্যিকারের জনবান্ধন বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে বর্তমান সরকার কতটা আন্তরিক?
মনে রাখতে হবে, জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক কর্মী, শিক্ষার্থী, সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ যেমন নিহত হয়েছেন, তেমনই অনেক পুলিশ সদস্যও নিহত হয়েছেন। পুলিশের ওপর বছরের পর বছর ধরে মানুষের যে রাগ-ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছিল, এই ঘটনার পেছনে কি তার কোনও দায় নেই? পুলিশ কি এটা উপলব্ধি করতে পারছে যে, রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হিসেবে তারা যদি সত্যিই জনবান্ধব হতে না পারে, জনগণের বন্ধু না হোক, অন্তত তারা যদি গণবিরোধী হওয়ার প্রবণতা থেকে বের হতে পারে—তাহলে কী পরিণতি হবে? শুধু পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল, কিছু লোকের চাকরিচ্যুতি আর পোশাকের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীতে সত্যিকারের সংস্কার হবে?
বাস্তবতা হলো, পুলিশের সমস্যা এত বেশি যে, একদিনে, এক মাসে বা এক বছরেও হয়তো এগুলো ঠিক করা যাবে না। কিন্তু পরিবর্তনের সূচনা হওয়া প্রয়োজন। সেই সূচনাটা বিএনপি সরকার এখনও করতে পেরেছে কিনা তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের অনেক অভিযোগ আছে। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে পুলিশ বাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসন। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরে নির্বাচি বর্তমান বিএনপি সরকারও কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থ তথা ক্ষমতায় টিকে থাকার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে নাকি তারা এই ঘোষণা দেবে যে, র্যাব, পুলিশ এমনকি সশস্ত্র বাহিনীকেও তারা রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে না এবং প্রতিটি বাহিনী তাদের আইনের ভেতরে থেকে স্বাধীনভাবে কাজ করবে? সরকারের তরফে এই ঘোষণা না আসা পর্যন্ত র্যাবের নাম বদল কিংবা পুলিশের আগের পোশাকে প্রত্যাবর্তন— এর কোনও কিছুতেই দেশ ও জনগণের কিছু যাবে আসবে না। বরং রাষ্ট্রীয় বাহিনী, সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতি, অনিয়ম ও দলবাজির বৃত্তেই ঘুরপাক খেতে থাকবে।
লেখক: সাংবাদিক ও লেখক