Image description

হিন্দুত্ববাদ বিজয় পেল তার জন্মভূমিতে

হিন্দুত্ববাদের জন্ম বিজিপি নেতা নরেন্দ্র মোদির জন্মস্থান গুজরাতে হয়নি। শিবাজীর জন্মস্থান মহারাষ্ট্রেও হয়নি। রাম মন্দিরের তীর্থভূমি উত্তরপ্রদেশও হয়নি। হিন্দুত্ববাদের জন্ম হয়েছিল পশ্চিমবাংলায়। সেটি কলকাতার হিন্দু সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা। হিন্দুত্ব শব্দটি প্রথমে আলোচনায় আসে বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জির উপন্যাস আনন্দমটে। এ উপন্যাসটি মুসলিম বিদ্বেষী উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িক ঘৃণা ছড়ানোর বই। আনন্দমটের একটি গান বন্দেমাতরমকে ভারতের জাতীয় সঙ্গীতে পরিণত করা হয়েছে। এটি এক পৌত্তলিক গান। এ গানে রয়েছে মাতৃভূমির পৌত্তলিক ধাঁচের বন্দনা। এখন এ গান গাইতে বাধ্য করা হচ্ছে মুসলিমদের। না গাইলে শাস্তির হুমকি দেয়া হচ্ছে। ব্রিটিশ আমলেও কলকাতার বাবু  হিন্দুরা এ গানকে অবিভক্ত বাংলার স্কুলে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাংলার মুসলিম নেতাদের প্রবল বিরোধীতায় সে চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছিল।  

ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির শুরু হয় এ বাংলাতেই। সে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির ঘৃণা পশ্চিম বাংলার বুকে যে কতটা প্রবল ভাবে বেঁচে আছে এবারের নির্বাচনে বিজিপি’র বিজয় সেটিই প্রমাণ করলো। ভারতীয় জনতা পার্টি তথা বিজেপি হলো এ কালের হিন্দুত্ববাদী দল জনসংঘের পরিবর্তিত রূপ।‌ আর জনসংঘের জন্ম হয় হিন্দু মহাসভার বিলুপ্তি ঘটিয়ে। এভাবে হিন্দুত্ববাদ বার বার দলের পরিবর্তন ঘটালেও অটল থেকেছে হিন্দুত্ববাদী আদর্শে। ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি শুরু হয় হিন্দু মহাসভার হতে। সে সংগঠনটির জন্ম কলকাতায়। এ সংগঠনের প্রথম সভাপতি ছিলেন বাঙালি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জী। তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি আশুতোষ মুখার্জির পুত্র। তিনি নিজেও কিছুদিনের জন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি ছিলেন। হিন্দুত্ববাদের জন্ম  কোন সাধু সন্নাসীর গৃহে হয়নি; বরং হয়েছে বাঙালি কুলিন হিন্দুর গৃহে। পরবর্তীতে হিন্দু সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সে ধারাকেই সমগ্র ভারতের বুকে ছড়িয়ে দেয় শীর্ষ বাঙালি হিন্দু রাজীনীতিবিদ, কবি সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীগণ। হিন্দুত্ববাদের অন্যতম শীর্ষ চরিত্র হলো মহারাষ্ট্রের শিবাজী। মারাঠা গোত্রপতি শিবাজী হিন্দু সম্প্রদায়িক রাজনীতির মধ্যমনি হয়ে উঠে এ কারণে যে, সে যুদ্ধ করেছিল মোগল সাম্রাজ্যের নির্মূলে। শিবাজীকে পূজনীয় করতে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং কংগ্রেস নেতা সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জি বাংলার বুকে প্রথম শিবাজী উৎসব চালু করেন। এথেকে বুঝা যায় হিন্দুত্ববাদ কিরূপে পরিচর্যা পায় উচ্চশিক্ষিত বাঙালির ঘরে। 

হিন্দু সম্প্রদায়িকতার শুরু শুধু রাজনীতিতে নয়, প্রবল ভাবে শুরু হয় বাংলা সাহিত্যেও। বাংলা সাহিত্যের সম্প্রদায়িকতার জনক ও প্রচারক হলো বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জী। বঙ্কিমচন্দ্র চ্যাটার্জী সম্পাদক রূপে ১৮৭২ সালে বঙ্গদর্শন নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। তার পত্রিকার বঙ্কিমের নিজের উপন্যাস ধারাবাহিক ছাপা হতো।  রবীন্দ্রনাথের কাছে অতি প্রিয় ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের সে সাম্প্রদায়িক লেখনী। রবীন্দ্রনাথ নিজে লিখেছেন, অধীর আগ্রহে তিনি অপেক্ষায় থাকতেন পত্রিকাটির নতুন সংখ্যার জন্য। ১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ নিজে বঙ্গদর্শনের সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। সাম্প্রদায়িকতার চর্চা দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, হেমচন্দ্র নবীনচন্দ্র, ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের মত প্রায় হিন্দু সাহিত্যিকদের লেখনীতে। বাঙালি হিন্দু মানসকে মুসলিম বিদ্বেষে বিষাক্ত করে তুলেছিল এসব কবি সাহিত্যিকগণ। সে হিন্দুত্ববাদী চেতনা নিয়েই রাজনীতিতে নামেন শ্যামা প্রসাদ মুখার্জি ও অনেক কংগ্রেস নেতা। সে মুহুর্তে বাংলার গ্রামে গঞ্জে, নগরে বন্দরে মুসলিমের বিরুদ্ধে বিষাক্ত ‌ঘৃণা, ক্রোধ, আক্রোশ ও নির্যাতন নিয়ে ময়দানে সক্রিয় ছিল হিন্দু জমিদারগণ। তখন ভারতে চলছিল ঔপনিবেশিক ইংরেজ শাসন। কিন্তু এই বাঙালি হিন্দু সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ ও জমিদারদের লড়াই যতটা ইংরেজ শাসকদের বিরুদ্ধে ছিল, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল প্রতিবেশী মুসলিমদের বিরুদ্ধে। বরং ব্রিটিশ রাজা পঞ্চম জর্জ ১৯১১ সালে যখন ভারত সফরে আসেন তখন রবীন্দ্রনাথ তার প্রতি বন্দনা ভরে “জনগণ মন অধিনায়ক হে ভারত বিধাতা” বলে গানটি লেখেন। পরে সেটি ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হয়।  

 

পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের নতুন রাজনৈতিক উপলব্ধি

মনে হচ্ছে, পশ্চিম বাংলার মুসলিমগণ প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উপর আস্থা হারিয়ে ফেলেছে। তাদের অনেকেই বিশেষ কোন দলের ভোট ব্যাংক হতে রাজী নয়। তারা নিজেরাই নিজেদের পথ দেখছে। পরীক্ষা নিরীক্ষা হচ্ছে নতুন মুসলিম নেতৃত্ব নিয়ে। পশ্চিমবাংলার শতকরা প্রায় ৩২ ভাগই মুসলিম। এক সময় এমন ছিল, মুসলিম ভোটে কংগ্রেস বিজয়ী হতো। মুসলিমগণ গণ্য হতো কংগ্রেসের ভোট ব্যাংক রূপে। কিন্তু কংগ্রেস মুসলিমদের জন্য কিছুই করেনি। এরপর মুসলিমগণ কংগ্রেস ছেড়ে কম্যুনিস্ট পার্টির দিকে ঝুঁকে। মুসলিমদের ভোট নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি পশ্চিম বাংলায় ৩৪ বছর শাসন করেছে। ‌ কিন্তু তারাও মুসলিমদের কল্যাণে কিছুই করেনি। এরপর মুসলিমদের ভোট নিয়ে ক্ষমতায় আসে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। মুসলিমদের সমর্থনের কারণেই মমতা ব্যানার্জি ১৫ বছর শাসন করতে পেরেছে। কিন্তু বাঙালি মুসলিমরা মমতা ব্যানার্জির উপর আশা হারিয়ে ফেলেছে।  কারণ, মমতা বানার্জি নিজে হিন্দুত্ববাদের দিকে ঝুকেছিল। হিন্দু ভোট আকৃষ্ট করার জন্য বিপুল অঙ্কের রাজস্বের অর্থে বিশাল মন্দির বানিয়েছিল। তাঁর সে কৌশল কাজ দেয়নি। হিন্দুরা তার ভোটি দেয়নি; বরং মুসলিমদের দূরে সরিয়েছে।

পশ্চিম বাংলা বিধানসভার আসন সংখ্যা ২৯৩। আসনগুলির অর্ধেকের বেশিতে মুসলিমরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। এবারে নির্বাচনে বিজেপি শতকরা ৪৬ ভাগ ভোট পেয়েছে। কিন্তু আসন পেয়েছে ২০৭ টি। অপরদিকে তৃণমূল পেয়েছে শতকরা ৪১ ভাগ ভোট কিন্তু আসল পেয়েছে মাত্র ৮০ টি। কংগ্রেস পেয়েছে শতকরা তিন ভাগ ভোট এবং আসন পেয়েছে দুটি। সিপিএম পেয়েছে শতকরা চার ভাগ ভোট এবং আসন পেয়েছে মাত্র একটি। লক্ষণীয় হলো, তৃণমূল যে ৮০টি সিট পেয়েছে তার মধ্যে ৭৩ টি সিটে মুসলিম ভোটের শতকরা ২৫ ভাগের বেশি। ‌ যেসব আসনে মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ২৫’য়ের কম, সেসব আসন থেকে তৃণমূল মাত্র ৭ টি আসন পেয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, তৃণমূল কতটা নির্ভরশীল মুসলিম ভোটের উপর।

 

উগ্র হিন্দুত্ববাদের জোয়ার: সম্ভাবনা নতুন রাজনৈতিক ভূমিকম্পের

ভারতীয় হিন্দুদের মুসলিম বিরোধী সাম্প্রদায়িকতা তুঙ্গে উঠে ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর। ব্রিটিশ শাসকগণ তাদের প্রশাসনিক স্বার্থে বাংলাকে দুই ভাগ করলে হিন্দু বাঙালিরা মনে করে, ব্রিটিশেরা সেটি করেছে মুসলিমদের স্বার্থে। বঙ্গ ভঙ্গ রদ করতে হিন্দুরা সন্ত্রাসী আন্দোলনের পথ বেছে নেয়। তীব্রতর করে উগ্র হিন্দুত্বের জোয়ার। উগ্র হিন্দু সাম্প্রদায়িকতার সে জোয়ার ঘুমন্ত বাঙালি মুসলিমদের জাগিয়ে তুলেছিল। সে প্রেক্ষাপটে ১৯০৬ সালে ঢাকায় জন্ম নেয় মুসলিম লীগ। মুসলিম লীগের নেতৃত্বে শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতিতে পিছিয়ে থাকা মুসলিমগণ জাগতে শুরু করে।  রাজনীতিতে শেরেবাংলা ফজলুল হক আবির্ভুত হন কৃষক প্রজা পার্টি নিয়ে।  ১৯৩৭ সালে আসে প্রথম প্রাদেশিক সরকারের নির্বাচন। সে নির্বাচনে হিন্দুরা মুসলিমদের হাতে পরাজিত হয়; মুসলিম লীগ ও  কৃষক প্রজা পার্টি -এ দুই দলের কোয়ালিশন মুখ্যমন্ত্রীর পদে বসেন শেরেবাংলা ফজলুল হক। ১৯৪৬ সালে আসে নতুন নির্বাচন; সে নির্বাচনেও মুসলিম লীগ কংগ্রেসকে হারিয়ে বিজয়ী হয়। প্রধানমন্ত্রী হন মুসলিম লীগ নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বাঙালি মুসলিমদের এ রাজনৈতিক জাগরণ ও বিজয় ভারতের মানচিত্রই পাল্টে দেয়। ধুলিস্যাৎ করে দেয় হিন্দুদের অখন্ড ভারত নির্মাণের সাধ। হিন্দুত্ববাদীদের আগ্রাসান থেকে বাঁচতেই মুসলিমগণ গড়ে পাকিস্তান।  

হিন্দুত্ববাদের এবারের জোয়ারও নীরবে থেমে যাবে না। হিন্দুত্বের এ প্রবল জোয়ার নিশ্চিত বাঙালি মুসলিমের মনেও জোয়ার তুলবে। উগ্র হিন্দুরা চাইবে পশ্চিম বাংলার মুসলিম প্রধান এলাকাগুলি কাশ্মীর বানাতে। সম্প্রতি এক বিজিপি নেতার ঘোষণা: “পরিস্থিত এমন করবো যে মুসলিমরা দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়।” সেরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে জুলুম নির্যাতনের মধ্য দিয়ে। তবে তাদের সে নৃশংস নীতি জাগিয়া তুলবে শুধু পশ্চিমবাংলা ও আসামের মুসলিমদের নয়, এমন কি বাংলাদেশের মুসলিমদেরও। ‌ কারণ বাংলাদেশ, পশ্চিমবাংলা ও আসামের মুসলিমদের মধ্যে যে ভৌগোলিক বিভাজন -সেটি কৃত্রিম ও সাম্প্রতিক। কোন রূপ বিভাজন নেই তাদের মনের জগতে। পশ্চিম বাংলার মুসলিমদের উপর আঘাত হানলে তাতে ক্রন্দন উঠবে বাংলাদেশের মুসলিম মনেও। একমাত্র ঈমানশূণ্য বেঈমানের মনই প্রতিদেশী দেশের মুসলিমের বিপদে নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে।  কারণ, মুসলিম উম্মাহ একটি দেহের ন্যায়। দেহের এক অংশে আঘাত হানলে ব্যাথীত হয় সমগ্র দেহ।

হিন্দুত্বের তাণ্ডব ইতিমধ্যে পশ্চিম বঙ্গের নানা স্থানে শুরু হয়ে গেছে। বিজিপির কর্মীরা হামলা শুরু করেছে মুসলিমদের ঘরবাড়ি ও দোকানপাটের উপর। ঘরবাড়ি ধ্বংসে বুল ডোজার রাস্তায় নামিয়েছে। মুসলিমগণ পথে ঘাটে হামলার শিকার হচ্ছে। সে হামলার চিত্র সোসাল মিডিয়াতে আসতে শুরু করেছে। মনে হচ্ছে বিজিপি পশ্চিম বাংলা ও আসাম জুড়ে এক বিশুদ্ধ জিহাদের ক্ষেত্র সৃষ্টি করতে যাচ্ছে। হিন্দুত্ববাদীদের সে হামলার মুখে বাঙালি মুসলিমের রাজনীতি তখন আর শুধু রাজনীতি থাকবে না, সেটি বিশুদ্ধ জিহাদে পরিণত হবে। আর যেখানে জিহাদ শুরু হয় সেখানে ফিরাশতাদের আগমন শুরু হয়। ফলে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে সাহায্য ও বিজয়ও আসে।  ১৯৪৭’য়ে তো সে বিজয়ই এসেছিল।  এরূপ অবস্থায় বাংলাদেশের মুসলিম স্বার্থে অঙ্গীকারহীন সেক্যুলারিস্টদের ক্ষমতায় থাকাও অসম্ভব হবে।    

হিন্দুত্ববাদের এ হিংসাত্মক রাজনীতি চল্লিশের দশকের ন্যায় জাগিয়ে তুলবে সমগ্র পূর্ব ভারতীয় মুসলিমদের। ঘুমন্ত মুসলিমদের জন্য এমন একটি ধাক্কা জরুরি ছিল। ব্রিটিশ আমলে হিন্দুত্ববাদ মুসলিম মনে যে জাগরণ এনেছিল তাতে দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে ভূমিকম্পের জন্ম দিয়েছিল। তাতে বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম দিয়েছিল সর্ববৃহৎ মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের। বাঙালি মুসলিমের রাজনীতিতে সেরূপ একটি ভূমিকম্প না এলে পাকিস্তানের সৃষ্টি অসম্ভব হতো। আশা করা যায় হিন্দুত্ববাদের এবারের প্লাবনও পূর্ব ভারতের ভূ-রাজনীতিতে নতুন ভূমিকম্পের জন্ম দিবে। তাতে নিশ্চিত পাল্টে যাবে এ অঞ্চলের মানচিত্র।