Image description

 জিল্লুর রহমান

নীরবতার নিচে জমে ওঠা শব্দ : কিশোর গ্যাং, রাজনীতি, উন্নয়ন আর ক্ষমতার অদৃশ্য ফাটল

১. কিশোর গ্যাং : সমাজের আয়নায় আমাদের মুখ কিশোর গ্যাং নিয়ে আমরা যত কথা বলি, তার বেশির ভাগই শাস্তি, অভিযান, গ্রেপ্তার-এই ত্রিভুজে আটকে থাকে। যেন সমস্যাটা রাস্তার, সমাধানটা থানার। কিন্তু বাস্তবতা অনেক গভীর এবং কিছুটা অস্বস্তিকরও-এই গ্যাংগুলো আসলে আমাদের সমাজেরই একধরনের ‘বিকল্প প্রতিষ্ঠান’ হয়ে উঠছে। যেখানে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, অভিভাবক ব্যস্ত হয়ে পড়ছেন টিকে থাকার লড়াইয়ে, স্কুল হয়ে উঠছে কেবল পরীক্ষার ফলাফলের কারখানা, সেখানে কিশোররা নিজেদের পরিচয় খুঁজে নেয় ‘দলে’।

এই দল তাদের নিরাপত্তা দেয়, পরিচয় দেয়, কখনো কখনো অর্থও দেয়। সবচেয়ে বড় কথা, তাদেরকে ‘দেখা’ হয়। যে সমাজে ভালো কাজ করে কেউ চোখে পড়ে না, সেখানে ভয় সৃষ্টি করাই দৃশ্যমান হওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায়। আমরা বলি তারা পথভ্রষ্ট; তারা ভাবে, এটাই পথ।

এই মানসিকতার ভিতরে আছে একধরনের নীরব প্রতিবাদ, একধরনের স্বীকৃতির দাবি।

এখানে শুধু আইনশৃঙ্খলা নয়, সাংস্কৃতিক সংকটও কাজ করছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাব, দ্রুত জনপ্রিয় হওয়ার সংস্কৃতি, ‘ভাইরাল’ হওয়ার লোভ; এসবও কিশোরদের মনোজগতে প্রভাব ফেলছে। তারা দেখে-ক্ষমতা মানে প্রভাব, আর প্রভাব মানে ভয় বা প্রদর্শন।

ফলে ছোট ছোট গ্রুপগুলো নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় নামে কে বেশি ‘ডমিনেন্ট’, কে বেশি ‘কন্ট্রোল’ করতে পারে এলাকা।

এখানেই প্রথম ফাঁকটা তৈরি হয়, সমাজের সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের সম্পর্কের ফাঁক। এই ফাঁক যদি পূরণ না হয়, তাহলে আইনশৃঙ্খলার ভাষা দিয়ে যতই চাপা দেওয়া হোক, সমস্যা ঘুরেফিরে আসবেই। কারণ এটি কেবল অপরাধের গল্প নয়; এটি স্বীকৃতির গল্প, পরিচয়ের গল্প এবং ভবিষ্যৎ হারানোর গল্প।

২. রাজনীতি, প্রতিনিধিত্ব এবং ব্যক্তিগত অবস্থানের সূক্ষ্ম ভারসাম্য

এই প্রেক্ষাপটেই রাজনীতির প্রশ্নটি সামনে আসে।

কারণ যেখানে সমাজে ফাঁক তৈরি হয়, রাজনীতির কাজ সেখানে সেতু তৈরি করা। আমার স্ত্রী ফাহমিদা হকের সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনয়ন বা নির্বাচিত হওয়া নিয়ে আমি যে প্রতিক্রিয়া দিয়েছি, সেটি মূলত এই জায়গাটাকেই স্পর্শ করে-কীভাবে একজন মানুষ সামাজিক সম্পৃক্ততা থেকে রাজনৈতিক দায়িত্বে প্রবেশ করেন।

তিনি দীর্ঘদিন লেখালেখি করেছেন, সামাজিক উদ্যোগে যুক্ত ছিলেন, মানুষের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলো তাঁকে একটি দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে, যা সংসদে কাজে লাগতে পারে। কিন্তু এখানেই প্রশ্ন আসে-আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি কি এই ধরনের অংশগ্রহণকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত?

আমাদের বাস্তবতায় প্রায়ই ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পেশাগত অবস্থান এক হয়ে যায়। তখন যোগ্যতার চেয়ে পরিচয়ের গুরুত্ব বেড়ে যায়। এই প্রবণতা রাজনীতিকে দুর্বল করে এবং জনগণের মধ্যে সন্দেহ তৈরি করে। তাই আমি স্পষ্টভাবে বলেছি-গণতন্ত্রে একই পরিবারের মানুষ ভিন্ন ভূমিকায় থাকতে পারে, কিন্তু পেশাগত সততা অবশ্যই স্বাধীন থাকতে হবে। কারণ বিশ্বাস একবার নষ্ট হলে সেটি ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে কঠিন। আর এই বিশ্বাসের সংকটই কিশোর গ্যাংয়ের মতো সমস্যাকে শক্তিশালী করে। যখন মানুষ মনে করে রাজনীতি তাদের প্রতিনিধিত্ব করছে না, তখন তারা বিকল্প শক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ে। কখনো সেটি হয় অপরাধ, কখনো নৈরাজ্য, কখনো চরম হতাশা।

অর্থাৎ রাজনীতি যদি আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই শূন্যতা অন্য কিছু দিয়ে পূরণ হয়, যা সব সময় ইতিবাচক হয় না।

৩. মাতারবাড়ী : উন্নয়নের আলোর নিচে ছায়া কতটা?

এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে উন্নয়নের বড় বড় গল্প, মাতারবাড়ীর মতো প্রকল্প। গভীর সমুদ্রবন্দর, আধুনিক সড়ক, আন্তর্জাাতিক মানের অবকাঠামো, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার-সব মিলিয়ে একধরনের ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কল্পনা করা হচ্ছে।

বিশেষ করে সৌরশক্তির ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ, আধুনিক নির্মাণ উপকরণের প্রয়োগ-এসব দেখায় যে উন্নয়ন এখন কেবল অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত দায়বদ্ধতার সঙ্গেও যুক্ত হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দিক। কারণ উন্নয়ন যদি পরিবেশ ধ্বংস করে, তাহলে সেটি দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই হয় না।

কিন্তু এখানেও একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকে যায়, এই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক? যদি এই প্রকল্পের সুফল সমাজের একটি ছোট অংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে সেটি নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি করবে। তখন একদিকে থাকবে ঝকঝকে রাস্তা, অন্যদিকে থাকবে হতাশ তরুণ, বেকার যুবক কিংবা উপেক্ষিত গ্রাম।

এই বৈপরীত্যই সামাজিক অস্থিরতার বীজ বপন করে। কারণ মানুষ তখন তুলনা করতে শুরু করে ‘ওদের জন্য সবকিছু, আমাদের জন্য কিছুই না।’ এই অনুভূতি খুব দ্রুত ক্ষোভে রূপ নেয়, আর সেই ক্ষোভ কখনো কখনো কিশোর গ্যাংয়ের মতো বাস্তবতায় প্রকাশ পায়।

অর্থাৎ উন্নয়ন যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তাহলে সেটি স্থিতিশীলতা আনে না; বরং অস্থিরতা তৈরি করে। মাতারবাড়ীর মতো প্রকল্প তাই কেবল অবকাঠামোর প্রশ্ন নয়; এটি সামাজিক ন্যায্যতারও প্রশ্ন। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও বিবেচনায় আনা দরকার, এই ধরনের মেগা প্রকল্প কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। মাতারবাড়ী পোর্ট অ্যাকসেস রোড নির্মাণে যে ধরনের পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেডের অংশগ্রহণ, তা একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। সৌরশক্তির ব্যবহার, ডিজেলনির্ভরতা কমানো, কার্বন নিঃসরণ হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব নির্মাণ উপকরণের প্রয়োগ-এসব কেবল প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, বরং উন্নয়নের দর্শনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের প্রসার-এই প্রকল্পকে একটি ‘লাইফলাইন’-এ পরিণত করতে পারে। অর্থাৎ সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হলে এই উন্নয়ন কেবল অবকাঠামো নয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধিরও ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে, যা আগের বৈপরীত্যগুলোকে কিছুটা হলেও ভারসাম্যে আনতে সক্ষম।

৪. ক্ষমতা, বয়ান এবং নীরবতার রাজনীতি

অস্থিরতাকে নিয়ন্ত্রণ করার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো, বয়ান তৈরি করা। প্রতিটি শাসনব্যবস্থা তার নিজস্ব গল্প তৈরি করে। এটি স্বাভাবিক। কিন্তু সমস্যা তখনই শুরু হয়, যখন সেই গল্প একমাত্র সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চায়।

যখন বলা হয়-সব ঠিক আছে, সব নিয়ন্ত্রণে আছে, তখন প্রশ্ন জাগে, আসলেই কি তা-ই? কারণ বাস্তবতা কখনো এত সরল নয়। যখন প্রশ্ন কমে যায়, যখন ভিন্নমতকে অস্বস্তিকর মনে হয়, তখন নীরবতা তৈরি হয়। আর এই নীরবতা কখনো স্থিতিশীল নয়; এটি ধীরে ধীরে ক্ষয়ের লক্ষণ। ক্ষমতা যখন কেবল নিজের করতালিই শোনে, তখন সে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয় এবং সেই ভুলের প্রভাব পড়ে সমাজের নিচের স্তরে-যেখানে কিশোর গ্যাং জন্ম নেয়, যেখানে মানুষ রাজনীতির ওপর বিশ্বাস হারায়, যেখানে উন্নয়নকে দূরের কিছু মনে হয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা। যখন সবকিছু পর্যবেক্ষণ করতে চাওয়া হয়, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাওয়া হয়, তখন সেটি আসলে শক্তির নয়, দুর্বলতার লক্ষণ। যে ক্ষমতা বিশ্বাস করতে পারে না, সে ক্ষমতা ধীরে ধীরে সন্দেহপ্রবণ হয়ে ওঠে। আর এই সন্দেহই একসময় ভয়ের রূপ নেয়। ইতিহাস আমাদের বারবার শিখিয়েছে যে সমাজে প্রশ্ন করার জায়গা সংকুচিত হয়, সেখানে সৃজনশীলতা নষ্ট হয়, উদ্ভাবন থেমে যায়, আর শেষ পর্যন্ত সেই সমাজ স্থবির হয়ে পড়ে।

শেষ কথা

শেষ পর্যন্ত এই চারটি প্রসঙ্গ-কিশোর গ্যাং, রাজনীতি, উন্নয়ন, এবং ক্ষমতার বয়ান একটি অভিন্ন বাস্তবতার চারটি দিক। আমরা যদি এগুলোকে আলাদা আলাদা সমস্যা হিসেবে দেখি, তাহলে সমাধানও খন্ডিত হবে। কিন্তু যদি এগুলোকে একটি সমন্বিত চিত্র হিসেবে দেখি, তাহলে বোঝা যায় সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে।

একটি সমাজ টিকে থাকে তিনটি শক্তির ওপর-বিশ্বাস, অন্তর্ভুক্তি এবং প্রশ্ন করার সাহস। বিশ্বাস ভেঙে গেলে মানুষ বিকল্প পথ খোঁজে। অন্তর্ভুক্তি না থাকলে উন্নয়ন বিভাজন তৈরি করে। আর প্রশ্ন করার সাহস না থাকলে ক্ষমতা বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, নীরবতা। যখন আমরা ভাবি, চুপ থাকাই নিরাপদ, তখনই আমরা ধীরে ধীরে সমস্যার অংশ হয়ে যাই। কারণ নীরবতা কখনো নিরপেক্ষ থাকে না; এটি সব সময় কোনো না-কোনো শক্তিকে সুবিধা দেয়।

তাই এখনো সময় আছে আমরা যদি সত্যিকারের সংলাপ শুরু করি, যদি রাজনীতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলি, যদি উন্নয়নকে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করি এবং যদি প্রশ্নকে ভয় না পাই-তাহলে এই চারটি গল্প একসঙ্গে একটি ইতিবাচক ভবিষ্যতের দিকে যেতে পারে।

আরেকটি বিষয় এখানে যোগ করা জরুরি-আমরা প্রায়ই সমাধান খুঁজি বড় বড় নীতিতে, কিন্তু ছোট ছোট জায়গায় নজর দিই না। একটি পরিবারে সংলাপ, একটি স্কুলে মূল্যবোধের চর্চা, একটি পাড়ায় পারস্পরিক নজরদারি-এ সবই বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করে। রাষ্ট্রের বড় কাঠামো তখনই কার্যকর হয়, যখন সমাজের ছোট কাঠামোগুলো সুস্থ থাকে।

নাহলে আমরা হয়তো আলাদা আলাদা গল্প বলতেই থাকব কিন্তু একসময় দেখব, সব গল্প একই সংকটের দিকে নিয়ে গেছে। আর তখন প্রশ্ন করার সুযোগও হয়তো থাকবে না, কেবল উত্তর খোঁজার তাড়না থাকবে-যেখানে উত্তরগুলো আর কাজে আসে না।

♦ লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ