Image description
ধাপে ধাপে বাড়বে

নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সার্ভারে সংরক্ষিত থাকা নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্য যাচাইয়ের ফি বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি এনআইডি সংশোধন আবেদনের ফিও বাড়ানো হচ্ছে। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ সরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য প্রতিবার এনআইডির তথ্য যাচাই ফি ১ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ টাকা, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ৫ থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এনআইডি সংশোধনের আবেদনের সর্বোচ্চ ফি করা হচ্ছে ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে প্রতিটি ক্ষেত্রেই ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হবে। এ বিষয়ে সম্প্রতি কমিশনে নথি উপস্থাপন করেছে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগ। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সূত্র জানায়, এনআইডির তথ্য যাচাইয়ে সেবা নিতে বর্তমানে ১৯৮টি প্রতিষ্ঠান ইসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান ৬৯টি; ব্যাংক ৬৩টি এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তপশিলভুক্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মোবাইল ব্যাংকিং, বীমা কোম্পানি ইত্যাদিও রয়েছে। এনআইডি যাচাই করতে গেলে প্রথমেই চুক্তি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে সরকারি কোষাগারে এককালীন সার্ভিস চার্জ হিসেবে ৫ লাখ টাকা জমা দিতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে প্রতি বছর নবায়ন ফি।

সূত্র আরও জানায়, ইসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ এমন ১০টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যারা শুধু চুক্তিই করেছে। চুক্তির পর তথ্য যাচাইয়ের লিংক নেয়নি, যে কারণে কোনো তথ্য যাচাইও হয়নি।

প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—সমবায় অধিদপ্তর, টাইগার আইটি বাংলাদেশ লিমিটেড, ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখা, নিবন্ধন অধিদপ্তর, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, কৃষি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিল, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ও ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেন্স সেন্টার। এ ছাড়া প্যাসিফিক বাংলাদেশ টেলিকম লিমিটেড (সিটিসেল) ও এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেড বিলুপ্ত হলেও এখনো ইসির চুক্তিতে রয়েছে। আর এটুআই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও আইপে সিস্টেমস লিমিটেড ইসির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকলেও দীর্ঘদিন কোনো তথ্য যাচাই করছে না।

জানা যায়, শুরুতে প্রতি এনআইডির তথ্য একবার যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ১ টাকা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ২ টাকা করে ফি দিতে হতো। পরবর্তী সময়ে ২০২৩ সালের ২ মার্চ এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি না বাড়িয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ফি ২ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫ টাকা করা হয়। ইসির নতুন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ৩ টাকা এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে ৮ টাকা করে দিতে হবে। এর সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট যুক্ত হবে।

ইসি কর্মকর্তাদের মতে, সার্ভার রক্ষণাবেক্ষণসহ সব ধরনের ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। তাই এটি খুব বেশি বাড়ানো হচ্ছে না।

এনআইডি তথ্য যাচাই সেবায় ফি বাড়ানোর বিষয়ে কথা হলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এ এস এম হুমায়ুন কবীর কালবেলাকে বলেন, ‘ফি কিছুটা বাড়ানো হচ্ছে। শুধু ফি বাড়ানো নয়, আমরা চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোকে মনিটরিংয়ের আওতায় এনেছি। যে কোনো সময় আমরা তাদের সিস্টেম পরীক্ষা করতে পারি। এতে তথ্য পাচারের সুযোগ থাকবে না।’

তিনি আরও বলেন, “এনআইডির তথ্য যাচাইয়ের সময় নাগরিকের বেসিক কিছু তথ্য জানতে পারত চুক্তিবদ্ধ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান। এখন আমরা সেটি ‘ম্যাচ’ বা ‘নো ম্যাচে’ নিয়ে এসেছি। শুধু গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাজের স্বার্থে তাদের চাহিদার ভিত্তিতে নাগরিকের তথ্য দেওয়া হয়।”

সূত্র জানায়, ইসির সার্ভার থেকে অনলাইনে ব্যক্তির এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ লিখে সার্চ করলে ডাটাবেজ থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম, এনআইডি নম্বর, জন্মতারিখ, বাবার নাম, মায়ের নাম, স্বামী বা স্ত্রীর নাম, ছবি যাচাই করতে পারত। এখন শুধু ‘ম্যাচ’ বা ‘নো ম্যাচ’ দেখায়। শুধু বেওয়ারিশ লাশ, জঙ্গি, অপরাধীদের আঙুলের ছাপ অনলাইনে পাঠানো হলে সার্ভারে রক্ষিত সব বায়োমেট্রিক তথ্যের সঙ্গে যাচাই করে র্যাব, স্পেশাল ব্রাঞ্চ, পিবিআইসহ গোয়েন্দা সংস্থাকে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচিতি শনাক্ত করে দেওয়া হয়।

ইসি কর্মকর্তারা জানান, এখন এনআইডি সংশোধন আবেদনের জন্য তিনটি ক্যাটাগরিতে টাকা নেওয়া হয়। সেটি বাড়িয়ে সাতটি ক্যাটাগরি করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রথমবার এনআইডি সংশোধন আবেদন ফি ২০০ টাকা, দ্বিতীয়বারের জন্য ৩০০ এবং তৃতীয় ও এরপর যতবার আবেদন করবেন তার জন্য ৪০০ টাকা নির্ধারণ করা আছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ১৫ শতাংশ ভ্যাট। নতুন ফি নির্ধারণ কার্যকর হলে প্রথম ও দ্বিতীয়বারের ফি বাড়বে না। তবে তৃতীয়বার আবেদনের জন্য ৪০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা, চতুর্থবার ১ হাজার টাকা, পঞ্চমবার ২ হাজার, ষষ্ঠবার ৩ হাজার এবং সপ্তমবার সংশোধনের আবেদনের জন্য ৫ হাজার টাকা ফি নির্ধারণ করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হবে ১৫ শতাংশ ভ্যাট।

এনআইডি সংশোধন আবেদন ফি বাড়ানোর বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক বলেন, প্রথমবার ও দ্বিতীয়বারের সংশোধন আবেদন ফি বাড়ানো হচ্ছে না। তারপর থেকে বাড়ানো হচ্ছে। কারণ, যাদের আবেদনে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকায় বাতিল করা হয়, তাদের অনেকেই আবারও অহেতুক আবেদন করেন। তাই কিছু বাড়ানো হচ্ছে, যাতে কেউ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া আবেদন না করেন।

তিনি বলেন, ‘একজন ব্যক্তি যতবার আবেদন করবেন, তার তত বেশি ফি আসবে। অনেকেই ১০ বার সংশোধনের আবেদন করেন। ওইসব আবেদন নিষ্পত্তি করতে অনেক সময় ব্যয় হয়। আমাদের দেশে মানুষের সংখ্যা বেশি। কিন্তু সে হিসাবে এনআইডি সংশোধনের জনবল কম। এ কারণে সব আবেদন সময়মতো নিষ্পত্তি করতে পারি না। আমরা রাজস্ব খাতে জনবল বাড়ানোর কথা চিন্তা করছি।’

বর্তমানে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা এনআইডির বয়স সংশোধন করতে পারেন না। আগে একটি নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সংশোধন করতে পারতেন, যে কারণে বিভিন্ন জেলা থেকে প্রতিনিয়ত ইসিতে সেবা গ্রহীতাদের ভিড় বাড়ত। এ বিষয়ে হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে জন্মতারিখ সংশোধন করে অনেকে বয়স কমিয়ে বা বাড়িয়ে নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছেন। এতে ভোটার ডাটাবেসের গ্রহণযোগ্যতা কমছে। তাই অধিকতর যাচাইয়ের জন্য এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’