হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা পরিষদের কনফারেন্স রুমে এক মতবিনিময় সভায় সংসদ সদস্যের (এমপি) স্ত্রীকে প্রধান অতিথি করা নিয়ে বিতর্কের পর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি-এসিল্যান্ড) বদলির ঘটনা ঘটেছে।
রোববার (০১ মার্চ) সিলেট বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের সংস্থাপন শাখার সিনিয়র সহকারী কমিশনার উম্মে সালিক রুমাইয়া এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ নিয়োগ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব মুহাম্মদ তানভীর হাসান স্বাক্ষরিত পৃথক আদেশে বদলি করা হয় তাদের।
জানা গেছে, বাহুবল উপজেলা পরিষদের কনফারেন্স রুমে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিটন চন্দ্র দে। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জ-১ আসনের এমপি ড. রেজা কিবরিয়ার স্ত্রী সিমি কিবরিয়া। এছাড়া বাহুবল মডেল থানার ওসি মো. সাইফুল ইসলাম, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা এবং স্থানীয় বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা অংশ নেন।
সভায় স্থানীয় উন্নয়ন কার্যক্রম, প্রশাসনিক সমন্বয় ও জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এ আয়োজনকে ঘিরে প্রশাসনিক মহল ও জনসাধারণের মধ্যে শুরু হয়েছে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা।
সরকারি কার্যালয়ে আয়োজিত একটি আনুষ্ঠানিক সভায় একজন সংসদ সদস্যের স্ত্রীকে ‘প্রধান অতিথি’ হিসেবে আমন্ত্রণ এবং সরকারি কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সরকারি প্রোটোকল অনুযায়ী নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সরকারি অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হতে পারেন। তবে তার স্ত্রী কোনো সাংবিধানিক বা সরকারি পদে অধিষ্ঠিত না হলে সরকারি কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিক সভায় তাকে প্রধান অতিথি করা কতটা বিধিসম্মত তা নিয়ে জনমনে সংশয় তৈরি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সভা চলাকালে সরকারি সেবা নিতে আসা কয়েকজন সেবাগ্রহীতা কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ব্যক্তি দাবি করেন, কর্মঘণ্টায় প্রশাসনিক কার্যক্রম আংশিক স্থগিত থাকায় তাদের প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন হয়নি।
ঘটনার দুই দিনের মাথায় ইউএনও লিটন চন্দ্র দে’কে সিলেট বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে এবং উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহবুবুল ইসলামকে সচিবালয়ে বদলি করা হয়েছে। তবে এ বদলির সঙ্গে ওই সভার কোনো সম্পর্ক রয়েছে কিনা সে বিষয়ে সরকারি কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি স্থাপনা ও প্রশাসনিক কাঠামো ব্যবহার করে কোনো বেসরকারি ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক সভা আয়োজনের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক সরকারি বিধি, পরিপত্র ও প্রোটোকল অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। অন্যথায় তা প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা ও বিধিবিধানের পরিপন্থি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এ বিষয়ে ইউএনও লিটন চন্দ্র দের সরকারি মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, যদি সভাটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক পরিসরের হয়ে থাকে, তবে তা সরকারি কার্যালয়ে ও কর্মঘণ্টায় আয়োজন কতটা যৌক্তিক তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, সরকারি অফিস মূলত সাধারণ মানুষের সেবা দেওয়ার জন্য। কর্মঘণ্টায় সভা-সমাবেশের কারণে যদি জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার প্রশ্ন তোলে।
এ ঘটনায় সরকারি বিধি অনুযায়ী এমপির স্ত্রীকে নিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভা আয়োজনের কোনো সুস্পষ্ট আইন বা পরিপত্র রয়েছে কিনা তা পরিষ্কারভাবে জানানো এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সচেতন মহল।