Image description

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনের ২ পর্বের ধারাবাহিক একান্ত সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে দৈনিক কালের কণ্ঠ। এতে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন রাষ্ট্রপতি। যা নিয়ে দেশ-বিদেশে নানা আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি করেছে।

 

 

গুরুত্বপূর্ণ এই সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন পত্রিকাটির নির্বাহী সম্পাদক হায়দার আলী ও বিশেষ প্রতিনিধি জয়নাল আবেদীন।

 

 

 

সাক্ষাৎকারটি প্রকাশের পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যখন আলোচনার ‘তুঙ্গে’, ঠিক তখনি ‘সাংবাদিক হায়দার আলীর অপরাধ কী?’ শিরোনামে নিজের ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছেন লেখক ও গবেষক নাদিম মাহমুদ।

 

 

 

বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) দুপুর ১টা ২ মিনিটে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ-সংক্রান্ত পোস্ট দিয়েছেন তিনি। তার পোস্টটি নিচে হুবহু দেওয়া হলো-

 

 

 

সাংবাদিক হায়দার আলীর অপরাধ কী?

 

 

 

২০২৪ সালে ৩১ মার্চ ‘বেনজীরের ঘরে আলাদীনের চেরাগ’ শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করেছিল ‘কালের কণ্ঠ’। বেশ কিছু সিরিজ প্রতিবেদন হওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের নড়চড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। দেশজুড়ে আলোচনার শীর্ষে ছিল সেই খবরগুলো। একের পর এক বেনজীরের দুর্নীতির সেই সাহসী প্রতিবেদন করেছিল ‘হায়দার আলী’ ও তার সহকর্মীরা।

 

 

এরও আগে ২০২০ সালের এপ্রিলে মালয়শিয়ার অবৈধ শ্রমিক পাচার ও দুর্দশা নিয়ে সিরিজ প্রতিবেদন, ‘চুক্তি করেও অরক্ষিত শ্রমিক’ কিংবা ‘অবৈধ শ্রমিক বানানোর কারখানা’ শিরোনামে প্রতিবেদনগুলোর কথা নিশ্চয় মনে আছে?

 

 

এটাও যদি মনে না থাকে, তাহলে স্মরণ করুন, বিসিএসআইআরের মালা খানের কথা। যিনি পিএইচডি জালিয়াতি করে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান বনে গিয়েছিলেন। সেটা নিয়ে প্রতিবেদন হয়েছিল ‘জালিয়াতির মালা গেঁথেছেন মালা খান’। কিংবা গাজীপুরের বনের ৩শ বিঘা জমি দখল করে ‘মুসি জসিমের শতকোটি টাকা’ শিরোনামে সেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের কথা অনেকের মনে থাকার কথা।

 

 

এসব অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বাহিরে সেই সময় আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতাপশালী এমপি পাপলুকে নিয়ে ‘শ্রমিক থেকে হাজার কোটি টাকার মালিক এমপি পাপুল’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন দেশজুড়ে আলোচনার খোড়াক জুগিয়েছিল। ‘এমপি বাহারের বাহারি রাজত্ব’ কিংবা ‘জিকে শামীম চলেন ছয় দেহরক্ষী নিয়ে’ খবরগুলো তো এখনো আমাদের চোখে ভাসে।

 

 

অসংখ্য ভালো ভালো অনুসন্ধানী প্রতিবেদন লিখে যে কালের কণ্ঠের ‘হায়দার আলী’ দেশের অনেক দুর্নীতিবাজ ও বনখেকো কিংবা দস্যুদের মুখোশ উন্মোচন গত দেড় দশকের বেশি সময় ধরে করে যাচ্ছেন, সেই মানুষটিকে নিয়ে গত কয়েকদিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নোংরামি দেখে সত্যিই এক ধরনের অস্বস্তি আসছে।

 

 

প্রথম আলো, সমকাল, কালের কণ্ঠে দীর্ঘদিন পেশাদারিত্বের সঙ্গে সাংবাদিকতা করা হায়দার আলীকে আপনারা এখন ট্যাগ দিচ্ছেন ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ হিসেবে। কারণ এই হায়দার আলী সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির দুই পর্বের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এই কারণে।

 

 

প্রশ্ন হলো, ওই সাক্ষাৎকারে সাংবাদিক হিসেবে ঠিক কোন প্রশ্ন করায় তিনি কিংবা তার সহকর্মী পেশাদারিত্ব হারিয়েছেন দয়া করে বলবেন কি?

 

 

একজন পেশাদার সাংবাদিকের কাজ প্রশ্ন করা, সেই প্রশ্নের উত্তর সাক্ষাৎপ্রদানকারী কী বলবেন, তা হুবহু তুলে দেওয়া। এটাই মৌলিক জার্নালিজম। কিন্তু রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার নেওয়ার কারণে, একজন সাংবাদিককে ‘টানাহেঁচড়া’ করা মূলত নোংরামি। আরও খোলসা করে বললে বলতে হয়, ভণ্ডামি। আপনার পছন্দ হবে না, তখন আপনি গোষ্ঠী উদ্ধার করবেন, আপনার পছন্দ হবে তখন আপনি তাকে বুকে তুলে রাখবেন। এটাই তো আপনার হিপোক্রেসি নাকি?

 

 

বেনজীরের দুর্নীতির খবর নিয়ে যখন টানা সিরিজ করল, পাপলুর বিদেশের হাজার কোটি টাকা নিয়ে সংবাদ করল, গাজীপুরের মেয়র জাহাঙ্গীরের প্রার্থীতা নিয়ে হাসপাতালের নাটক করার এক্সক্লুসিভ সংবাদ তুলে আনল, কিংবা একজন পিএইচডি জালিয়াত বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার কথা পত্রিকায় নিয়ে এলো, তখন তিনি ভালো ছিলেন। এখন রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎ গ্রহণ করায় তিনি আওয়ামী লীগের দোসর হয়ে গেলেন?

 

 

আওয়ামী লীগের সময়ে এসব সংবাদ করার কারণে, যে মানুষটির বিরুদ্ধে ১১টি মামলা হয়েছিল, প্রভাবশালী বেনজীররা যখন তাকে জামায়াত-বিএনপি বানিয়েছিল, তখন আপনাদের এই ‘ট্যাগিং’ কোথায় গিয়েছিল?

 

 

আপনাদের এই দ্বিচারিতার কারণে, এখন অনেক সাংবাদিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ছেড়ে দিয়েছে। আপনাদের কটাক্ষতার কারণে, অনেক সাংবাদিক এই পেশাটাকেই ছেড়ে দিয়েছে।

 

 

সাংবাদিক হায়দার আলীকে নিয়ে এতো বড় লেখার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু একজন পেশাদার সাংবাদিককে নিয়ে যখন মিথ্যাচার ও নোংরামির পসরা বসে, তখন সেটার প্রতিবাদ করা দায়িত্ব বটে।

 

 

হায়দার আলী সাংবাদিক পরিচয়ের বাহিরে তিনি একজন নাগরিক। তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক পছন্দ ও অপছন্দের বিষয় থাকতে পারে। কিন্তু তার সেই পরিচয় যখন ‘সাংবাদিকতার পেশাদারিত্ব’ আঘাত হানে, তখন সেটা নিয়ে কথা বলা যায়। কিন্তু আমার জানা মতে, বাংলাদেশে যে কয়েকজন মানুষ মনে প্রাণে সাংবাদিকতাটুকুকে ভালোবাসেন, তাদের মধ্যে হায়দার আলী একজন। আমরা ব্যক্তি হায়দার আলীর চেয়ে সাংবাদিক হায়দার আলীকে সামনে রাখতে চাই। আমি অন্তত ১৪ বছরের বেশি সময় ধরে তাকে চিনি ও জানি বিধায় এই কথাগুলো অকপটে লিখতে পারলাম।

 

 

 

 

জেলা সাংবাদিক থেকে নির্বাহী সম্পাদক হওয়ার পরিশ্রমও দেখেছি। হায়দার আলীর সাংবাদিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলুন, তিনি সাংবাদিকতায় কোন জায়গায় অপেশাদারিত্ব দেখিয়েছেন, সেটা নিয়ে কথা বলুন। কিন্তু ব্যক্তি হায়দার আলীকে ট্যাগিং দেওয়ার সংস্কৃতিকে নিরুৎসাহী করুন। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অগাধ ভালোবাসা কিংবা বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা থাকা কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং প্রশ্ন তুলুন, ওই সাংবাদিক শেখ হাসিনার শাসনামলে কয়টি প্লট বাগিয়েছে, কয়টি ব্যবসা বাগিয়েছিলেন, কয়টি সুবিধা নিয়েছেন। একজন পেশাদার সাংবাদিককে প্লিজ সাংবাদিকতাটুকু করতে দিন।