সাম্প্রতিক সময়ে সন্ধ্যার পর প্রাপ্তবয়স্কদের ঘরে ফেরার বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে। আইনশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। এ প্রেক্ষাপটে সন্ধ্যার পরে নাগরিকদের চলাচল নিয়ে আইন কী বলে— তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে বিভিন্ন মহলে।
বাংলাদেশের সংবিধানে নাগরিকদের চলাফেরার স্বাধীনতা স্বীকৃত। আইনের শাসন ও যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ ছাড়া ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করার শামিল।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘কারফিউ’ বা ‘জরুরি অবস্থা’ জারি না থাকলে কেবল সময়ের অজুহাতে প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ঘরে ফেরার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ নেই। সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুসারে সন্ধ্যার পরে প্রাপ্তবয়স্কদের ঘরে ফেরার কোনও বাধ্যবাধকতাও নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্যক্তিস্বাধীনতা ও আইন প্রয়োগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৬-এ নাগরিকদের চলাফেরার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া অনুচ্ছেদ ৩১ ও ৩২ অনুযায়ী আইনানুগ প্রক্রিয়া ছাড়া ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। অর্থাৎ, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কখন বাসায় ফিরবেন বা বাইরে থাকবেন— এটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অংশ, যতক্ষণ না তিনি কোনও অপরাধে জড়িত হচ্ছেন।
তবে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী শর্তসাপেক্ষে কোনও নাগরিকের চলাচলে বাধা দিতে পারে। বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ আইন অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ক্ষেত্রে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে টহল ও তল্লাশি চালাতে পারে এবং নির্দিষ্ট অপরাধের আশঙ্কা থাকলে আইন অনুযায়ী গ্রেফতারও করতে পারে।
তবে এসব আইনের কোথাও শুধু সন্ধ্যা বা রাত হওয়ার কারণে কাউকে আটক বা হয়রানি করার সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির বলেন, “এ বিষয়ে কোনও সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। কেউ যদি অপরাধে যুক্ত থাকে বা দেশে বিশেষ অবস্থা জারি থাকে, তাহলে ভিন্ন বিষয়। কিন্তু সাধারণভাবে কে কখন বাসায় ফিরবেন বা বাইরে থাকবেন— তা তার ব্যক্তিগত বিষয়।”
তিনি বলেন, “কোথাও অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে বা এমন আশঙ্কা থাকলে পুলিশ আইন অনুযায়ী অভিযান চালাতে পারে। প্রিভেন্টিভ মেজার হিসেবে অপরাধ, বিশৃঙ্খলা বা ক্ষতি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে। কাউকে সন্দেহভাজন মনে হলে তল্লাশি করতে পারে বা গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করতে পারে, যাতে তিনি বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন।”
তবে কোনও অবস্থাতেই জনসাধারণের স্বাভাবিক চলাচলে বাধা দেওয়া আইনসম্মত নয় বলেও মন্তব্য করেন এই জ্যেষ্ঠ আইনজীবী।
এ বিষয়ে মানবাধিকারকর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোহাম্মদ হুমায়ন কবির পল্লবের ভাষ্য, একজন ব্যক্তি কখন কোথায় থাকবেন বা থাকবেন না— সেটি তার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার বিষয়। এখানে অন্য কারও হস্তক্ষেপ করার সুযোগ নেই।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ কোনও অপরাধে জড়িত না হন, ততক্ষণ তার স্বাধীন চলাফেরায় হস্তক্ষেপ করা যাবে না। যে কেউ ঘরের বাইরে অবস্থান করতে পারবেন। তবে পুলিশ বা অন্য কোনও বাহিনীর সদস্যরা যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ভিত্তিতে আইন মেনে কাউকে তল্লাশি করতে পারেন বা মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করতে পারেন।”
তিনি আরও বলেন, “তল্লাশির বিষয়টি কোনওভাবেই নিপীড়নমূলক হতে পারে না। আইন অনুযায়ী দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষীর উপস্থিতিতে তল্লাশি করতে হবে। অন্যথায় তা সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ণ করার শামিল হবে।”
ব্যারিস্টার পল্লব আরও উল্লেখ করেন, ‘কারফিউ’ বা ‘জরুরি অবস্থা’ জারি না থাকলে কারও স্বাধীন চলাফেরায় বাধা দেওয়ার সুযোগ নেই।