Image description

নথিপত্রে প্রকল্পের লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণ রয়েছে দেশের নৌপথের উন্নয়ন ও নিরাপদ নৌপরিবহন নিশ্চিত করা। তবে বাস্তবে সেই প্রকল্পই পরিণত হয়েছে অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক বিস্তৃত চক্রে। প্রথমেই নিয়ম ভেঙে দুর্নীতিতে অভিযুক্ত দুজনকে বানানো হয় প্রকল্প পরিচালক (পিডি) ও উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি)। আর এ দুই শীর্ষ কর্মকর্তা পিডি ও ডিপিডির চেয়ারে বসতে না বসতেই শুরু করেন লাগামহীন দুর্নীতি। বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত এই মেগা প্রকল্পে অন্তত শতকোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি। এমনকি মাত্র ৫০ হাজার টাকার পিসি পোলে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ লাখ টাকা। যার সঙ্গে সরাসরি জড়িত পিডি আইয়ুব আলী ও ডিপিডি ফরহাদুজ্জামান। এতসব অনিয়ম-দুর্নীতিতে ভরা প্রকল্পটির কেতাবি নাম ‘বাংলাদেশ রিজিওনাল ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট প্রজেক্ট-১ (বিআরডব্লিউটিপি-১)’, যা বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)।

কালবেলার হাতে আসা নথিপত্র এবং মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পটির বিভিন্ন স্তরে নিয়ম ভেঙে অর্থ আত্মসাৎ, অতিরিক্ত বিল প্রদান, দরপত্রে কারসাজি এবং প্রভাব খাটানোর মাধ্যমে দুর্নীতির একটি শক্তিশালী বলয় তৈরি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগসাজশে এই ‘সিন্ডিকেট লুটপাট’ করেন। প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলী ও উপপ্রকল্প পরিচালক ফরহাদুজ্জামান আগে থেকেই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তালিকায় অভিযুক্ত হিসেবে থাকলেও তাদেরই ফের বিশ্বব্যাংকের অর্থায়িত প্রকল্পের শীর্ষ দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর তারা মিলেমিশে শুরু করেন লুটপাট। সুনির্দিষ্ট ৯টি অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত মন্ত্রণালয়ের কমিটির তদন্তে এই প্রকল্পে বেশুমার দুর্নীতির তথ্যপ্রমাণ মিলেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট পর্যালোচনায় এ নিয়োগকে ‘অযৌক্তিক’ ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে নিয়োগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিআইডব্লিউটিএর বিআরডব্লিউটিপি-১ প্রকল্পে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ মিললেও এর গভীরে রয়েছে একটি জটিল আর্থিক ও প্রশাসনিক কাঠামো, যেখানে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়ন—সব ধাপেই প্রশ্ন উঠেছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে। পর্যালোচনা প্রতিবেদনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকল্পের চুক্তি ব্যবস্থাপনা, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া এবং আর্থিক অনুমোদনের একাধিক ধাপে নিয়ম লঙ্ঘনের প্রবণতা ছিল পদ্ধতিগত।

ভ্যারিয়েশন অর্ডারে ১১ কোটি টাকা আত্মসাৎ: প্রকল্পের ডব্লিউ-৩ লট-২ চুক্তিতে সবচেয়ে বড় অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। ডায়মন্ড কাটার ব্যবহার না করেই বোল্ডার কাটার নামে ভ্যারিয়েশন অর্ডারের মাধ্যমে ১১ কোটি ৭২ লাখ টাকা অতিরিক্ত দেওয়া হয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নেওয়া হয়নি অনুমোদন এবং বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পর্যালোচনায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে—এ অভিযোগটি ‘সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত’। লুটপাটের পুরো অর্থ ঠিকাদারের সঙ্গে মিলেমিশে প্রকল্পের পিডি, ডিপিডিসহ সংশ্লিষ্টরা ভাগবাটোয়ারা করে নিয়েছেন।

পিপিআর লঙ্ঘন করে ৯ কোটি টাকার অপচয়: ডব্লিউ-১-এ লট-২ চুক্তিতে পিসিপোলের মূল্য নির্ধারণে বড় ধরনের কারসাজির তথ্য পেয়েছে তদন্ত কমিটি। একটি পোলের প্রকৃত দাম সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা হলেও তার প্রতিটির জন্য ব্যয় দেখানো হয়েছে ১০ লাখ টাকা করে। পর্যালোচনায় উঠে এসেছে, দরপত্র মূল্যায়নের সময় প্রকল্প পরিচালক ইচ্ছাকৃতভাবে পিপিআর-২০০৮-এর বিধি ৩৩ গোপন করেন এবং পরবর্তী সময়ে ওই দর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করেন। এতে সরকারের প্রায় ৯ কোটি টাকা অপচয় হয়েছে।

৪৫ কোটি টাকার গ্যারান্টি ছাড়, ক্ষতি ৩৯ কোটি: আরেকটি বড় অনিয়ম পাওয়া গেছে এফএমসি লিমিটেডের একটি আর্থিক লেনদেনে। অভিযোগ অনুযায়ী, ৪৫ কোটি টাকার রিফান্ড গ্যারান্টি মাত্র ৬ কোটি টাকার বিনিময়ে অবমুক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প পরিচালক ও উপপ্রকল্প পরিচালকের অবহেলা এবং অনিয়মের কারণে সরকারের প্রায় ৩৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

পরামর্শক সরিয়ে ঠিকাদারকে সুবিধা: প্রকল্প বাস্তবায়নে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় পরামর্শকদের ভূমিকা ইচ্ছাকৃতভাবে খর্ব করার অভিযোগও রয়েছে। এমনকি আন্তর্জাতিক টিম লিডারকে সরিয়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে—যাতে ঠিকাদাররা নির্ধারিত কাজের বাইরে অতিরিক্ত কাজ করতে পারে। এ ছাড়া কিছু ক্ষেত্রে পরামর্শকদের দেশে না রেখে বিদেশে অবস্থানের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা প্রকল্প তদারকির ক্ষেত্রে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।

নিজেই ‘ইঞ্জিনিয়ার’, নিজেই মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক: উপপ্রকল্প পরিচালক নিজেকে প্রতিটি চুক্তির ‘ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে নিয়োগ দেন বলে জানা গেছে—যা প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থি। একইভাবে প্রকল্প পরিচালক বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন ছাড়াই মূল্যায়ন কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষমতার এ ধরনের কেন্দ্রীকরণ দুর্নীতিকে সহজতর করে এবং জবাবদিহি কমিয়ে দেয়।

চুক্তি ব্যবস্থাপনায় পদ্ধতিগত বিচ্যুতি: প্রকল্পের বিভিন্ন প্যাকেজ, বিশেষ করে ডব্লিউ-৩, ডব্লিউ-১-এ এবং জি-১২-এ দরপত্র মূল্যায়ন ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর-২০০৮) যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মূল্যায়ন কমিটির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। কারণ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন রেখে দরপত্র অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া প্রকল্প পরিচালক নিজেই মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছেন বলে জানা গেছে, যা স্বাভাবিক প্রশাসনিক কাঠামোর পরিপন্থি। এতে চুক্তি ব্যবস্থাপনায় ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’ নীতি ভেঙে পড়েছে।

কনসালট্যান্টদের ভূমিকা খর্ব: বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্পে সাধারণত আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় কনসালট্যান্টরা (পরামর্শক) মান নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করেন। কিন্তু এখানে অভিযোগ রয়েছে— কনসালট্যান্টদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে ও প্রকল্প বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে তাদের কার্যত নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। এর ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি ‘মনিটরিং ভ্যাকুয়াম’ বা পর্যবেক্ষণ শূন্যতা তৈরি হয়েছে, যা অনিয়মের সুযোগ বাড়িয়েছে।

জানতে চাইলে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা কালবেলাকে বলেন, প্রকল্পের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এসেছে। সেগুলো হলো—ভ্যারিয়েশন অর্ডারের অপব্যবহার, অতিরিক্ত বিল প্রদান, রিফান্ড গ্যারান্টি অবমুক্তিতে অনিয়ম ও প্রাক্কলন ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে দেখানো। এসব অনিয়ম একক ঘটনা নয়, বরং ধারাবাহিকভাবে ঘটেছে, যা একটি ‘সিস্টেমিক করাপশন’ বা সুসংগঠিত দুর্নীতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রকল্পের বিভিন্ন স্তরজুড়ে সমন্বিতভাবে আর্থিক অনিয়ম সংঘটিত হয়।

এ ছাড়া আরও বেশ কিছু অভিযোগ এসেছে। মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি উচ্চতর কারিগরি তদন্ত কমিটি গঠন করে সেসব অভিযোগের তদন্ত করার পরামর্শ দিয়েছে। যেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার লক্ষ্যে পিডি ও ডিপিডির প্রকল্পের সব কেনাকাটা, বিলিং ও চুক্তি ব্যবস্থাপনায় নিয়ম ভঙ্গ করে কনসালট্যান্টদের পাশ কাটিয়ে কাজ করা। তারা ডিডিসি লিমিটেডকে বাধ্য করেছেন আন্তর্জাতিক টিম লিডারকে সরিয়ে দিতে, যাতে পাইলিং, ভূমি উন্নয়নসহ বিভিন্ন অপ্রদর্শিত কাজ ঠিকাদারদের মাধ্যমে করানো সহজ হয়। ভয়েন্টের টিম লিডার ও কোয়ালিটি কন্ট্রোল (গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ) কর্মকর্তাদের বাংলাদেশে না রেখে ভারতে অবস্থান করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে সাইটে অপ্রদর্শিত কাজ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা যায়। কেউ প্রতিবাদ করলে পিডি তাকে হুমকি দেন বা প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিগত কনসালট্যান্টদের নিয়মিতভাবে অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা না বলতে চাপ দেওয়া হচ্ছে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সেফগার্ড বিশেষজ্ঞদের এবং বিআইডব্লিউটিএর ক্যাটাগরি-বি হাইড্রোগ্রাফিক সার্ভেয়ারকে কার্যত নিষ্ক্রিয় করে রাখা হয়েছে, যাতে ঠিকাদাররা অবাধে সুবিধা পেতে পারে। এ ছাড়া ডব্লিউ-১-এ লট-৩-এ ১ লাখ ৬৭ হাজার ৬০০ ঘনমিটার ড্রেজিংয়ের ক্ষেত্রে ঠিকারদারকে অতিরিক্ত ৫ কোটি ৩ লাখ টাকা প্রদানের অভিযোগ রয়েছে। আবার জি-১২ প্যাকেজের প্রাক্কলন দ্বিগুণ করে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অভিযুক্ত আইয়ুব আলী ও ফরহাদুজ্জামান বিশ্বব্যাংকের টাস্ক টিম লিডারের (টিটিএল) ওপর থাকা দ্রুত অর্থ ছাড়ের চাপকে অপব্যবহার করছেন এবং টিটিএল ও বিআইডব্লিউটিএর চেয়ারম্যানের নাম ব্যবহার করে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় করছেন। এ ছাড়া প্রকল্পের কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে চালিয়ে ঠিকাদারদের জন্য মূল্য সমন্বয় করে ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে, যার ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের ক্ষতি হচ্ছে এবং ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মতামত প্রদান করেছে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেশ কয়েকদিন ধরে প্রকল্প পরিচালক আইয়ুব আলীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে তার মোবাইল ফোন নম্বর বন্ধ পাওয়া যায়। এরপর যোগাযোগ করা হয় উপপ্রকল্প পরিচালক ফরহাদুজ্জামানের সঙ্গে। তবে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করে কালবেলাকে বলেন, ‘এসব কিছু মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এর সঙ্গে (অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ) আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। সবকিছু মন্ত্রণালয় ও বিশ্বব্যাংকের অনুমোদন নিয়েই হয়েছে।’

তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পরও দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ জানতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরীর মোবাইল ফোনে কল করে কোনো সাড়া মেলেনি। পরে কল করার কারণ জানিয়ে বার্তা পাঠানো হলেও জবাব দেননি তিনি।