দেশজুড়ে একাধিক মামলা, মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অনুসন্ধান, সিআইডির একের পর এক তলব। তবে অভিযোগ উঠেছে জাতীয় নির্বাচনের পরদিন নির্বিঘ্নে দেশ ছেড়েছেন মেহেরপুরের অনলাইন ক্যাসিনো সাম্রাজ্যের আলোচিত এজেন্ট হিসেবে পরিচিত মাদার আলী ওরফে মাদার মাস্টার। তার সঙ্গে দেশ ছেড়েছেন স্ত্রী লাইলী খাতুন ও ছেলে মোস্তাক নাহিদ অনিক।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, বাংলাদেশের প্রধান বিমানবন্দর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করেই তারা আন্তর্জাতিক ফ্লাইটে পাড়ি জমালেও বিষয়টি সম্পর্কে মেহেরপুর জেলা পুলিশ কিংবা সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে কোনো তথ্য নেই।
মেহেরপুর জেলার সক্রিয় অনলাইন ক্যাসিনো নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট মাদার আলী ও তার ছেলে অনিকের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ফৌজদারি অপরাধ এবং মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত একাধিক মামলা ও অনুসন্ধান চলমান। তবুও কীভাবে তারা নির্বিঘ্নে দেশ ছাড়লেন এ প্রশ্ন এখন জেলায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
মামলার নথি থেকে জানা গেছে, ২০২২ সালের ২৫ আগস্ট মুজিবনগর থানায় দায়ের হওয়া একটি মামলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩০ (২) ও ৩৫ ধারায় মাদার আলী সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে তদন্তাধীন ছিলেন। আর ওই মামলার চার্জশিটে তার ছেলে মোস্তাক নাহিদ অনিক অভিযুক্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল গাংনী থানার জিআর-৯৫ নম্বর মামলার এজাহারেও অনিকের নাম রয়েছে। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন এবং তিনি জামিনে রয়েছেন।
আইনি জটিলতার পাশাপাশি বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তোলে মানি লন্ডারিং সংক্রান্ত অনুসন্ধান। ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট মাদার আলী ও তার স্ত্রী লাইলী খাতুনকে একাধিক ব্যাংক হিসাবে সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করে। অনুসন্ধান এখনো চলমান।
এর ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগ ১৯ জনের নাম উল্লেখ করে মেহেরপুর জেলা পুলিশের কাছে তথ্য যাচাই ও পিসিপিআর (PCPR) চেয়ে চিঠি পাঠায়।
এ সব মামলা ও অনুসন্ধানের মধ্যেই ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে তিনটায় মাদার আলী, তার স্ত্রী ও ছেলে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে পর্তুগালের উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেন। আর পিতা-পুত্র দেশ ছাড়ার মাত্র পাঁচ দিন পর মুজিবনগর থানার মাধ্যমে সিআইডির সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন ইউনিট ছয়জনকে ঢাকায় হাজির হতে নোটিশ পাঠায়। ওই তালিকার ৬ নম্বরে ছিল মোস্তাক নাহিদ অনিকের নাম। অর্থাৎ যাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হয়েছে, তিনি ইতোমধ্যেই দেশের বাইরে।
মেহেরপুর জেলা পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বর্তমানে পাসপোর্ট ইস্যু ও ইমিগ্রেশন ব্যবস্থায় পুলিশ ভেরিফিকেশন বাধ্যতামূলক না থাকায় অভিযুক্ত বা সন্দিগ্ধ ব্যক্তিদের দেশত্যাগ ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আদালত থেকে পাসপোর্ট জব্দের নির্দেশ না থাকলে বা তদন্তকারী কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে অবহিত না করলে চলমান মামলার তথ্য অনেক সময় ইমিগ্রেশন সিস্টেমে প্রতিফলিত হয় না।
মেহেরপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জামিনুর রহমান খান বলেন, মাদার আলী ও তার ছেলে অনিকের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে, এটা সত্য। তবে তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, এমন কোনো তথ্য মেহেরপুর জেলা পুলিশের জানা নেই। কারণ বর্তমানে এয়ারপোর্টে ইমিগ্রেশন পার হতে লোকাল পুলিশের ক্লিয়ারেন্স লাগে না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।
স্থানীয়ভাবে জানা যায়, মাদার মাস্টার মুজিবনগরের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আমাম হোসেন মিলু এবং মেহেরপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক জনপ্রশাসন মন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের ঘনিষ্ঠ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতেন। সুযোগ পেলেই জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্কের বার্তা দিতেন। এভাবেই রাজনৈতিক প্রভাবকে পুঁজি করে তিনি অনলাইন ক্যাসিনোর একজন শীর্ষ এজেন্টে পরিণত হন।
এর আগে, প্রায় তিন বছর আগে তৎকালীন মেহেরপুরের পুলিশ সুপারের নাম ভাঙিয়ে স্থানীয় অনলাইন ক্যাসিনো এজেন্টদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের অভিযোগে মাদার মাস্টারকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নেওয়া হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনের সুপারিশে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে পুলিশের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছিল।
মাদার আলী ওরফে মাদার মাস্টার মুজিবনগর উপজেলার কোমরপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। পেশাগতভাবে তিনি মেহেরপুর সদর উপজেলার সাহেবপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের লাইব্রেরিয়ান হিসেবে কর্মরত। অথচ নিজ গ্রামে বিপুল টাকা ব্যয়ে দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছে কোটি টাকা বিনিয়োগ করারও অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, তিনি এক ডজনের বেশি জুয়া সাইটের এজেন্ট। এবং তার ছেলে অনিক ঢাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করে বাবার প্রায় সব আর্থিক লেনদেন নিয়ন্ত্রণ করতেন।
সিআইডির অর্গানাইজড ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুমন কুমার সাহা বলেন, মাদার আলী, তার স্ত্রী লাইলী খাতুন ও ছেলে মোস্তাক নাহিদ অনিক তিনজনের বিরুদ্ধেই মানি লন্ডারিংয়ের অনুসন্ধান চলমান। নতুন একটি মামলার প্রস্তুতিও চলছে। তবে তারা দেশ ছেড়ে গেছেন এমন তথ্য এ মুহূর্তে আমার জানা নেই।
এদিকে পর্তুগালে অবস্থানরত একাধিক বাংলাদেশি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মাদার আলী ও তার ছেলে অনিককে সেখানে দেখা গেছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে মাদার আলীর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরের কল ডিটেইল রেকর্ড (সিডিআর) যাচাই করে সিআইডি এবং মেহেরপুর জেলা পুলিশ।
যাচাইয়ে দেখা যায়, মাদার আলীর ব্যক্তিগত ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর (০১৭১৩-৮৬৫৯৪৩) গত ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৩টা ১২ মিনিট পর্যন্ত সক্রিয় ছিল। ওই সময় নম্বরটির সর্বশেষ লোকেশন হিসেবে পাওয়া যায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এরপর থেকেই মোবাইল নম্বরটি বন্ধ রয়েছে।