টাঙ্গাইলের বাসাইলে মুরগি বড় করার চিকিৎসা নিতে গিয়ে ভেটেরিনারি চিকিৎসক ও ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের প্রতারণার শিকার হয়ে ভুল ওষুধ ব্যবহারের পর প্রায় ১৭ হাজার মুরগির মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রতিকার চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী খামারি আলমগীর হোসেন।
এতে প্রায় ৪০ লাখ টাকা লোকসানের কথা জানিয়েছেন তিনি। এদিকে প্রেসক্রিপশন করা চিকিৎসক ও সেটি করতে সহায়তা করা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক একে অপরের ওপর দায় চাপাচ্ছেন। ঘটনাটি ঘটেছে জেলার বাসাইল উপজেলার হাবলা বিলপাড়া এলাকায় আলমগীর হোসেনের খামারে।
জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে মাংস উৎপাদনের জন্য ৫৫ হাজার মুরগি তোলেন খামারি আলমগীর হোসেন। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মুরগি বড় করার পরামর্শ নেওয়ার পর রেনেটা ফার্মা লিমিটেডের (বাসাইল-সখিপুর) দায়িত্বে থাকা ডা. অদ্বৈত বর্মন উপস্থিত থেকে কৌশলে অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের (বাসাইল-সখিপুর) দায়িত্বে থাকা ডা. মেহেদীর মাধ্যমে প্রেসক্রিপশন লিখে দেন। পরে রেনেটা ফার্মা লিমিটেডের ভাউচারে চারটি অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ পাঠানো হয় আলমগীরের খামারে। সেগুলো ১৭ হাজার মুরগির একটি খামারে ১৭ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে প্রয়োগ করলে রাত ৪টার মধ্যে প্রায় ১২ হাজার মুরগি মারা যায়। তাৎক্ষণিক খামারি আলমগীর রেনেটা ফার্মা লিমিটেডের সংশ্লিষ্ট ডাক্তার ও সেলসম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
কিন্তু মুরগির মৃত্যুর খবর শুনে ভয়ে আসেননি তিনি। চোখের সামনেই ছটফট করতে করতে মারা যায় মুরগিগুলো। দিশা না পেয়ে অভিযুক্ত চিকিৎসকসহ চার জনের বিরুদ্ধে বাসাইল থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী খামারি। এরই মধ্যে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) পর্যন্ত সেখানে থাকা আরও ৫ হাজার মুরগি মারা গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারির কর্মচারীরা বলেন, মুরগির আকার বৃদ্ধির ওষুধ খাওয়ানোর কয়েক ঘণ্টা পর থেকে মারা যাওয়া শুরু করে। মরা মুরগিগুলো ফেলতে ফেলতে বিরক্ত হয়ে গেছি। এভাবে খামারে থাকা ১৭ হাজার মুরগি মারা গেছে। ঈদের আগে বেতন পাওয়া নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছি। তারা ওষুধ কোম্পানির সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ জড়িতদের বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ দাবি করেন।
ক্ষতিগ্রস্ত খামারি আলমগীর হোসেন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে আমার এই খামারে ১৭ হাজার সোনালী মুরগির বাচ্চা ওঠানো হয়েছে। মুরগির গ্রোথ বাড়ানোর জন্য রেনেটা কোম্পানির ডাক্তারকে ডেকেছিলাম। তারা এসে প্রেসক্রিপশন করে দিয়েছে। মুরগি বড় করার ওষুধের বদলে তারা আমাকে দিয়েছে চারটি অ্যান্টিবায়োটিক ওধুষ। পরে রাত ৯টার দিকে ওষুধ খাওয়ানোর পর শেষ রাতের দিকে মুরগি মারা যাওয়া শুরু করে। প্রথমদিনেই প্রায় ১২ হাজার মুগরি মারা গেছে। এ পর্যন্ত খামারে থাকা ১৭ হাজার মুরগি মারা গেছে। মুরগি মারা যাওয়া শুরু করলে রেনেটা কোম্পানির ডাক্তার ও সেলসম্যানকে জানানো হয়। মুরগির মৃত্যুর খবর শুনেও তারা দেখতে আসেনি। তারা এসে ওষুধ পরিবর্তন করে দিতে পারতেন। বারবার বলার পরও আসেনি। পরে রেনেটা কোম্পানির ডাক্তার ও সেলসম্যানসহ চার জনের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি। বিষয়টি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিরা মিয়াকেও জানানো হয়েছে। তিনি গতকাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। বিষয়টি নিয়ে জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়েও অভিযোগ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি প্রায় ৪০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি। এখন কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার মতোও উপায় নেই। দিশকুল না পেয়ে খামারে থাকা মুরগির খাঁচা বিক্রি করে কর্মচারীদের বেতনের ব্যবস্থা করছি। আমি রেনেটা কোম্পানির কাছে ক্ষতিপূরণের দাবি জানাচ্ছি।
এদিকে, ভয় পেয়ে ডাক্তার ফোন ধরেননি ও খামার ভিজিটে যাননি বলে জানান রেনেটা কোম্পানির সেলসম্যান রাব্বি।
রেনেটা কোম্পানির পক্ষে প্রেসক্রিপশন করা অপসোনিন ফার্মা লিমিটেডের (বাসাইল-সখিপুর) দায়িত্বে থাকা ডা. মেহেদী মোবাইল ফোনে বলেন, ‘রেনেটা কোম্পানির সিনিয়র ডাক্তারের পরামর্শে প্রেসক্রিপশন করা হয়েছে।’
রেনেটা ফার্মা লিমিটেডের (বাসাইল-সখিপুর) দায়িত্বে থাকা ডা. অদ্বৈত বর্মন প্রেসক্রিপশনের দায় না নিলেও রোগ বুঝে প্রেসক্রিপশন করা হয়েছে দাবি করে মোবাইল ফোনে বলেন, একেকটা রোগের ক্ষেত্রে একেকটা মেডিসিন সাজেস্ট করি। তার মুরগির গ্রোথ কেন আসতেছে না, সেই কারণটি তো আগে বের করতে হবে। কারণটা বের করে সমাধান করলেই তো গ্রোথ আসবে, আমরা তাই করেছি। হেনস্তা করার উদ্দেশে তিনি অভিযোগ করেছেন।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হেলালউদ্দীন বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কী কারণে মুরগি মারা গেছে, এটা ময়নাতদন্ত করলে বের হয়ে আসবে।
বাসাইল থানার ওসি আলমগীর কবির বলেন, লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। তদন্তে মুরগি মারা যাওয়ার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।