Image description
 
বাংলাদেশের রাজনীতিতে কিছু মানুষ আছেন যারা মঞ্চের সামনে নন, কিন্তু সিদ্ধান্তের কেন্দ্রে। তারা বক্তৃতা দিয়ে জনতাকে মাতান না; বরং নীরবে রাষ্ট্রের গতিপথ নির্ধারণ করেন। এইচটি ইমাম ও ড. খলিলুর রহমান—দুই ভিন্ন দলের হলেও এই ‘পর্দার আড়ালের রাজনীতি’রই প্রতিনিধি। একজন ক্ষমতা সংগঠনের কৌশলী কারিগর, অন্যজন নীতিনির্ভর রাষ্ট্রচিন্তার স্থপতি।
এই দুই চরিত্রকে পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়—বাংলাদেশের রাজনীতি শুধু আদর্শ বা আন্দোলনের নয়; এটি একই সঙ্গে কৌশল, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাস্তবতার খেলা।
এইচটি ইমাম ছিলেন আমলাতন্ত্র থেকে উঠে আসা এক সংগঠক। প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, মাঠপর্যায়ের নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাচনী গণিত—এই তিন শক্তিকে একসঙ্গে কাজে লাগাতে পারতেন তিনি। দলকে কীভাবে জেতানো যায়, কোথায় কীভাবে সমন্বয় করলে ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব—এসব ছিল তার মূল দক্ষতা। তাকে অনেকে বলতেন ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ার’। আদর্শের চেয়ে ফলাফল তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
 
তার রাজনীতি ছিল কার্যকর বাস্তববাদী—যা কাজ করে, সেটাই গ্রহণযোগ্য। প্রশাসন, দল ও নির্বাচনী ব্যবস্থার ভেতরের সমীকরণ বোঝার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অসাধারণ। ফলে তিনি হয়ে ওঠেন ক্ষমতার স্থপতি—যিনি কাঠামো নির্মাণ করেন, দৃশ্যপটে থাকেন না।
 
অন্যদিকে ড. খলিলুর রহমানের শক্তি অন্য জায়গায়। তিনি কূটনীতিক, গবেষক ও নীতিবিশেষজ্ঞ—যার চিন্তার কেন্দ্র আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, উন্নয়ন কৌশল ও রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ। তার রাজনীতি মাঠের মিছিল বা ভোটের সমীকরণ নয়; বরং টেবিলের ওপর রাখা নথি, চুক্তি, আলোচনার খসড়া এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্য।
ড. খলিলকেও অনেকে ইণ্জিনীয়ার বলেন, তবে তিনি ভাবেন—বাংলাদেশ কোথায় দাঁড়াবে, কীভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও কূটনীতিতে নিজের অবস্থান শক্ত করবে, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী ধরনের রাষ্ট্র কাঠামো দরকার। অর্থাৎ তার চিন্তা তাৎক্ষণিক জয় নয়, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতি।
 
এখানেই দুইজনের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট।
ইমাম ছিলেন “কীভাবে জিতবো” ধরনের কৌশলী;
খলিলুর রহমান “কোথায় যাবো” ধরনের পরিকল্পনাকারী।
তবে তাদের মিলও কম নয়। দুজনই জনসম্মুখের নেতা নন, বরং নীরব প্রভাবক। দুজনই রাষ্ট্রযন্ত্রের গঠন ও সীমাবদ্ধতা বোঝেন। আর দুজনই দলীয় নেতৃত্বের বিশ্বস্ত মস্তিষ্ক—যাদের ওপর নির্ভর করে বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
 
বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য শিক্ষা হলো—শুধু ক্ষমতার কৌশল দিয়ে রাষ্ট্র টেকে না, আবার শুধু আদর্শিক নীতিচিন্তাও বাস্তবতায় কার্যকর হয় না। প্রয়োজন এই দুই ধারার সমন্বয়। ক্ষমতা ধরে রাখার দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রদর্শন—দুটো একসঙ্গে থাকলেই সুস্থ গণতন্ত্র সম্ভব।
 
সুতরাং বলা যায়, এইচটি ইমাম ও ড. খলিলুর রহমান কেবল দুই ব্যক্তি নন; তারা দুই ধরনের রাজনৈতিক দর্শনের প্রতীক। একজন ক্ষমতার স্থপতি, অন্যজন নীতির মানচিত্রকার। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে—এই দুই বুদ্ধির মধ্যে সুষম সমন্বয় কতটা গড়ে ওঠে তার ওপর।