Sabina Ahmed (সাবিনা আহমেদ)
চিঠিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প তারেক রহমানকে তার “ঐতিহাসিক নির্বাচন” এর জন্য অভিনন্দন জানান। সাধারণত এসব চিঠি বিজয়ের জন্য অভিনন্দন বার্তা হয় , কিন্তু এক্ষেত্রে বার্তাটি মূলত নির্বাচনের ঐতিহাসিক মূল্যকে প্রাধান্য দিয়ে। চিঠিটি ডাইরেক্ট, ব্যবসায়িক, এবং আনএপলোজেটিক।
ট্রাম্প লিখেছেন আমেরিকা এবং বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক পারস্পরিক সম্মান এবং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে স্বাধীন দেশগুলোর উন্নয়নের উপর ভিত্তি করে। ট্রাম্পের এই বাক্যটির উদ্দেশ্য মূলত কূটনৈতিক এবং কৌশলগত।
আমেরিকার “ফ্রি অ্যান্ড ওপেন ইন্দো-প্যাসিফিক” নীতি মূলত চীনের প্রভাব মোকাবিলা করার জন্য। বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগরের অবস্থান চীনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ – এটি তাদের সমুদ্রপথ, বাণিজ্য এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজন। কিন্তু ট্রাম্প চান যে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে চীনের এককভাবে প্রভাব বিস্তার বন্ধ করতে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক জোরদার করুক। এর ভিত্তিতেই চিঠির পরবর্তী বাণিজ্য চুক্তি আর প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা এসেছে।
অর্থাৎ, যদি বাংলাদেশ আমেরিকার এই “সাধারণ স্বার্থ” মেনে নেয়, তাহলে আমেরিকা থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য, অস্ত্র এবং বিনিয়োগ আসবে। এখানেও আমেরিকা ফার্স্ট নীতি উঠে এসেছে। ট্রাম্পের স্টাইলে লেনদেনের মতো – তিনি বলতে চান যে সম্পর্কটা উভয়পক্ষের লাভের জন্য, কিন্তু আমেরিকার স্বার্থ প্রাধান্য পাবে।
ট্রাম্প তার লেটারে বিশেষ করে দুটি বিষয়ে জোর দেন: বাণিজ্য চুক্তি আর প্রতিরক্ষা চুক্তি।
বাণিজ্য চুক্তির ব্যাপারে তিনি “রিসিপ্রোকাল ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট” এর কথা বলেছেন , অর্থাৎ পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি, যা উভয় দেশের কৃষক এবং শ্রমিকদের উপকার করবে। আগে মূলত বাংলাদেশ আমেরিকায় রপ্তানি করত, এখন আমেরিকা থেকে বাংলাদেশকে কৃষি পণ্য আমদানি করার কথা বলেছেন। এবং দুই দেশের মধ্যে যেসব ডিল হয়েছে তার তীব্র মোমেন্টাম ধরে রাখতে বলেছেন।
প্রতিরক্ষা চুক্তির ব্যাপারে তিনি “রুটিন ডিফেন্স অ্যাগ্রিমেন্ট” যা এখন পর্যন্ত অসম্পন্ন, তা সম্পন্ন করার জন্য ডিসাইসিভ একশন নিতে বলেছেন , যাতে বাংলাদেশ আমেরিকার উন্নত অস্ত্র কিনতে পারে। প্রশ্ন হলো এই “রুটিন ডিফেন্স এগ্রিমেন্ট” কি? এগুলো হচ্ছে মূলত দুটো চুক্তি: এক, General Security of Military Information Agreement (GSOMIA), দুই Acquisition and Cross-Servicing Agreement (ACSA)। যা এখনও পুরোপুরি সই হয়নি, এবং ট্রাম্প এই চিঠিতে এগুলো দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য চাপ দিয়েছে।
শেখ হাসিনার সরকার এই দুই চুক্তি অসম্পন্ন করে রেখেছিলো তার নিরপেক্ষ বিদেশনীতির জন্য। চুক্তিগুলোতে সই করলে বাংলাদেশ আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে চীন-বিরোধী দিকে ঝুঁকে যাবে বলে মনে হতে পারে। চীন বাংলাদেশে বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রজেক্টে অনেক বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের সেই দিকেও অনেক ইন্টারেস্ট জড়িয়ে আছে। আমেরিকান অস্ত্রের মূল্য অনেক বেশি চীনের অস্ত্রের তুলনায়, আমাদের সীমিত অর্থনীতি দিয়ে আমরা কি আসলেই আমেরিকান ট্যাংক, যুদ্ধ বিমান, মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম কিনতে পারব? মনে হয় না। আর আমেরিকাও আমাদের কাছে কোন জেনারেশনের অস্ত্র বিক্রি করবে সেটাও একটা প্রধান প্রশ্ন।
জিসোমিয়া চুক্তি আমেরিকা এবং বাংলাদেশের মধ্যে গোপন সামরিক তথ্য এবং প্রযুক্তি শেয়ার করার নিয়ম নির্ধারণ করবে। এতে সংবেদনশীল ডেটা সুরক্ষিত রাখা হবে, লিক হওয়া রোধ করা হবে এবং যৌথভাবে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি তৈরি বা হস্তান্তর করা যাবে – যেমন রাডার সিস্টেম, সাইবার নিরাপত্তা টুলস বা গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করবে। এটি বাংলাদেশের সীমান্ত নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগরে নজরদারি বা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সাহায্য করবে।
এক্সা চুক্তি লজিস্টিক সহযোগিতার চুক্তি। এর মাধ্যমে যৌথ সামরিক অনুশীলন, মানবিক মিশন বা শান্তিরক্ষা অভিযানে সাপ্লাই, জ্বালানি, খুচরা যন্ত্রাংশ এবং সার্ভিস শেয়ার করা যাবে। প্রতিবার আলাদা অনুমোদন লাগবে না – উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার জাহাজ বাংলাদেশের বন্দরে জ্বালানি নিতে পারবে, বা বাংলাদেশ ইউএন মিশনে আমেরিকার সাহায্য পাবে। এতে করে আমেরিকার সাথে সেনাবাহিনীর সমন্বয় বাড়বে, যা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে বা অঞ্চলীয় স্থিতিশীলতায় কাজে লাগবে। শেয়ার্ড রিসোর্সের কারণে খরচ কমবে।
চিঠি শেষ হয় আমেরিকার রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেনের প্রশংসা করে এবং উভয় দেশকে আরও সমৃদ্ধ করার আশা প্রকাশ করে।
কিন্তু এই চিঠিতে একটা সূক্ষ্ম চাপ আছে। চিঠিতে বাংলাদেশকে আমেরিকার কৌশলে যুক্ত হতে বলা হচ্ছে, যা বাংলাদেশের নিরপেক্ষ বিদেশনীতিকে প্রভাবিত এবং বিচলিত করবে।
তারেক রহমানের নতুন সরকারকে খুব সাবধানে ইস্ট এন্ড ওয়েস্ট দুই দিককে সামলে চলতে হবে। আগের আমেরিকান প্রেসিডেন্টরা বাংলাদেশের উভয় নৌকায় পা দেয়াকে অগ্রাহ্য করলেও, ট্রাম্প অতো উদার নন। তাই বাংলাদেশকে সতর্কতা অবলম্বন করে নিজেদের অর্থনৈতিক এন্ড নিরাপত্তা উভয় চাহিদা পূরণ করতে হবে।
চিঠিটির টোন কিছুটা অহংকারী মনে হয়েছে, যেখানে অভিনন্দনকে একটা দাবির তালিকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যার ভিত্তিতে বিশ্বাস গড়ে ওঠা মুশকিল হবে। তারেক রহমানের উচিত এই চিঠিকে খুব সতর্কতার সাথে দেখা, যাতে আমেরিকার সাথে কোনও চুক্তি বাংলাদেশের নিরপেক্ষ বিদেশনীতির ঐতিহ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে বা দেশের অভ্যন্তরীণ বিভেদ বাড়িয়ে না তোলে।
আমেরিকা যদি খুব জোর করে চাপ দেয় তাহলে বাংলাদেশ সেই চাপ কিভাবে সামলাবে তার নীতি এখনই খুঁজে বের করে নিতে হবে, এবং সর্বক্ষণ তা মনিটর করে চলতে হবে। যদি উভয় পক্ষ সততার সাথে আলোচনা করে, তাহলে এটি আমেরিকা-বাংলাদেশ সম্পর্কের একটা নতুন শক্তিশালী যুগ শুরু করতে পারে; অন্যথায়, এটি বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতায় আরেকটা ঝামেলার কারণ হয়ে উঠতে পারে।
আই উইশ বাংলাদেশ ফরেইন মিনিস্ট্রি এন্ড বাংলাদেশ এম্বাসেডর টু আমেরিকা অল দ্যা বেস্ট!