Image description

মগবাজারের চেয়ারম্যান গলির বাসিন্দা সামান্তা রহমান। গত প্রায় চার মাস ধরে তাঁর বাসায় দিনের বেলা গ্যাস থাকে না। রাতে কিছুটা পাওয়া গেলেও চাপ থাকে না। শুধু তাঁর বাসা নয়, পুরো এলাকাতেই এমন সমস্যা। 

সামান্তা গতকাল সমকালকে বলেন, দিনে গ্যাস থাকেই না। এতদিন কোনো রকমে কাটানো গেলেও রোজায় অসহনীয় ভোগান্তিতে পড়েছি। ইফতার ও সাহ্‌রি দুই সময়ের খাবার তৈরি করতে হিমশিম খাচ্ছি। শেষ পর্যন্ত আজকে (শুক্রবার) ইলেকট্রিক চুলা কিনেছি। 

শুধু মগবাজারই নয়, ঢাকাসহ দেশের একটা বড় অংশে পাইপলাইনের গ্যাসের প্রচণ্ড স্বল্পচাপ বিরাজ করছে। দিনের বেশির ভাগ সময় চুলায় আগুন জ্বলছে না। কোথাও আবার অল্প আঁচে টিমটিম করে জ্বললেও রান্না করতে লাগছে দ্বিগুণ সময়। এই সংকটের মধ্যেই বিকল্প হিসেবে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দিকে ঝুঁকছেন অনেকে। সেখানেও চলছে নৈরাজ্য। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৪০০-৫০০ টাকা বেশি দিয়ে ১২ কেজির সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। 

বনশ্রীর ব্লক-ডি এলাকার বাসিন্দা নাহিদ হাসান জানান, মাঝ রাতে গ্যাস আসে। তখন সাহ্‌রির রান্না করতে হয়। এরপর সারাদিন চুলা জ্বলে না। ইফতারি বাইরে থেকে কিনে খেতে হচ্ছে। 
রাজধানীর মিরপুর ১০-এর বি-ব্লকের বাসিন্দা মাকসুদুর রহমান বাচ্চু বলেন, গত চার মাস ধরে গ্যাস সংকটের মধ্যে আছি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। রান্না নিয়ে খুব সমস্যা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সিএনজি স্টেশন বন্ধ রাখার সময় তিন ঘণ্টা বাড়িয়েছে জ্বালানি বিভাগ। পাশাপাশি নতুন সরকার সংকট মোকাবিলায় জ্বালানি খাতে ১০০ দিন এবং পাঁচ বছরের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
তিতাস গ্যাসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ গতকাল শুক্রবার রাতে সমকালকে বলেন, গ্যাসের স্বল্পচাপের মূল কারণ হলো সরবরাহ কম। শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ালে বিদ্যুতে কম পড়ে। বিদ্যুতে দিলে আবাসিকে টান পড়ে। 

শাহনেওয়াজ পারভেজ বলেন, দেশে দৈনিক ৪০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হয় ২৬০ কোটি ঘনফুট। উৎপাদন বাড়ানো ছাড়া গ্যাসের ঘাটতি মেটানোর আর কোনো উপায় নেই। 

এলপিজির বাজারে নৈরাজ্য
পাইপলাইনে গ্যাস না থাকায় অনেক পরিবার এলপিজির দিকে ঝুঁকছে। সেখানেও চলছে বিশৃঙ্খলা। জানুয়ারি মাসজুড়ে সারাদেশে সিলিন্ডার গ্যাসের তীব্র সংকট ছিল। এখন তা খানিকটা কমলেও দামের নৈরাজ্য রয়ে গেছে। 

রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা খালিদ হোসেন বলেন, গত মাসে তিন দিন ঘুরে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২৪০০ টাকায় কিনতে হয়েছিল। গত সোমবার সেটি ১৮০০ টাকা নিয়েছে। যদিও সরকার নির্ধারিত দাম ১৩০৬ টাকা।

জানুয়ারিতে এক লাখ ৬৭ হাজার টন এলপিজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। বাস্তবে এসেছে এক লাখ পাঁচ হাজার টন। ফেব্রুয়ারিতে এক লাখ ৮৪ হাজার টন আমদানির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় রয়েছে।

সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ সারি
গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে রাজধানীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। পর্যাপ্ত চাপ না থাকায় স্টেশনগুলোতে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও চালকরা চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ উঠেছে।

রাজধানীর মগবাজার, মহাখালী, রামপুরা ও আশপাশের এলাকায় সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোর বাইরে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। পাম্প মালিকরা জানান, কমপ্রেসার চালু রেখেও পর্যাপ্ত গ্যাস তোলা যাচ্ছে না। এতে একদিকে গ্রাহক ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে ফিলিং স্টেশনগুলো। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির চালকরা। অনেক ক্ষেত্রেই সিলিন্ডার অর্ধেক খালি রেখেই ফিলিং স্টেশন ছাড়তে হচ্ছে। দিনের মধ্যে একাধিকবার লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস নিতে হচ্ছে। 

তেজগাঁও এলাকার অটোরিকশাচালক জসিম উদ্দিন বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও পুরো গ্যাস পাওয়া যায় না। যেখানে ৩০০ টাকার গ্যাস নেওয়ার কথা, সেখানে ১০০-১২০ টাকার বেশি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে আয় ব্যাপকভাবে কমে গেছে।

শিল্পেও সংকট
শিল্পাঞ্চলগুলোতেও গ্যাসের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কেউ কেউ বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করছেন। তাতে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। 
সাভার ডিইপিজেডের এফসিআই বিডি কারখানার মেইনটেন্যান্স ম্যানেজার মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘গ্যাস সংকটের কারণে আমাদের বয়লার, ওয়াশিংয়ের ড্রায়ার মেশিনসহ অনেক যন্ত্র চালাতে পারছি না। সারাদিনে চাহিদার ২০ ভাগ গ্যাসও আমরা পাচ্ছি না। বিকল্প হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করায় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে। 

অকোটেক্স গ্রুপের সহাকারী মহাব্যবস্থাপক হোসাইন খালেক বলেন, গ্যাস না থাকায় কারখানা এক প্রকার বন্ধ রয়েছে বলা চলে। তবে কিছু কিছু ইউনিট ডিজেল দিয়ে চালানো হচ্ছে, যা গ্যাসের দামের চেয়ে প্রায় ছয় গুণ। 

ডিবিএল ফার্মাসিউটিক্যালসের জ্যেষ্ঠ উপসহকারী প্রকৌশলী মোন্নাফ হোসেন বলেন, সকাল ৮টার পর থেকেই কারখানায় গ্যাস থাকে না। বিদ্যুৎ দিয়ে উৎপাদন শুরু করা হয় এবং ডিজেল ব্যবহার করে বয়লার চালানো হচ্ছে। 

সিএনজি স্টেশন বন্ধের সময় তিন ঘণ্টা বাড়ল 
রমজানে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে সিএনজি স্টেশন প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ছয় ঘণ্টা বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। ১৪ মার্চ পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে। আগে সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা বন্ধ থাকত। 

গতকাল শুক্রবার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এসব তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, গ্যাস বিতরণ নেটওয়ার্কে স্বল্প চাপ পরিস্থিতি নিরসন এবং রমজানে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাসের বাড়তি চাহিদা পূরণে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। 

অন্যদিকে, ঈদ উপলক্ষে মহাসড়কে যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন রাখতে ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত সিএনজি ফিলিং স্টেশন সার্বক্ষণিক খোলা রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ২৬ মার্চ থেকে আবার আগের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিন সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সিএনজি স্টেশন বন্ধ থাকবে। 

বিদ্যুতে ঘাটতি
দেশের সরবরাহ করা গ্যাসের ৬০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় হয়। তাও এ খাতের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব হয় না। শীত বিদায় নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করেছে। রমজান শুরু হয়েছে। সঙ্গে চলছে সেচ মৌসুম। সব মিলিয়ে বিদ্যুতের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছে। তবে এপ্রিল থেকে জুনে বিদ্যুতের চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর এপ্রিল-মে মাসে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা ছিল ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট। তখন প্রায় এক হাজার মেগাওয়াট লোডশেডিং করে পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়েছিল। এবার একই সময়ে চাহিদা ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট ছাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে দৈনিক ১২০ কোটি ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন হলেও পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি ঘনফুট দিতে পারবে। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দেওয়া হচ্ছে প্রায় ৮০ কোটি ঘনফুট। ফলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং ভোগাতে পারে।

কমেছে দেশীয় উৎপাদন, বেড়েছে আমদানি
বর্তমানে দেশীয় গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়। ২০১৭ সালে তা ছিল ২৭০ কোটি ঘনফুটের আশপাশে। অর্থাৎ, দেশীয় গ্যাসের উত্তোলন ৩৩ শতাংশ কমেছে।
কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল আলম বলেন, গ্যাস সংকটের মূল কারণ দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে অবহেলা। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এ জন্য মূলত দায়ী। তারা দেশে গ্যাস অনুসন্ধান কমিয়ে দিয়ে আমদানির দিকে ঝুঁকে। 

২০১৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গ্যাস আমদানি শুরু করে। এখন যে ডলারের দাম বেড়ে ১২৩ টাকা হয়েছে, সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে, তার পেছনে বড় একটি কারণ গ্যাসের আমদানিনির্ভরতা। আমদানি করতে গিয়েই রিজার্ভ কমেছে। ডলারের দাম বেড়েছে। সঙ্গে দফায় দফায় গ্যাসের দাম বাড়াতে হয়েছে।

বেড়েছে দাম, কাটেনি সংকট
আওয়ামী লীগ সরকার ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শিল্পে গ্যাসের দাম ১৭৯ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল, আমদানি বাড়ানো হবে, তাই দাম বাড়ানো দরকার। দাম বাড়িয়ে আমদানি আর বাড়াতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকার নতুন সংযোগের ক্ষেত্রে গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে ৩৩ শতাংশ। এরপর আমদানি সামান্য বাড়ালেও সংকট কাটেনি। 

নতুন সরকারের চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকরা বলছেন, সদ্য ক্ষমতায় বসা বিএনপি সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো প্রাথমিক জ্বালানির ঘাটতি মোকাবিলা করা। এ বিষয়ে শামসুল আলম বলেন, নতুন সরকারকে আমদানি থেকে নজর ফেরাতে হবে। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়াতে নজর দিতে হবে।
ভূতত্ত্ববিদ বদরুল ইমাম বলেন, গ্যাসের জন্য বাংলাদেশ খুবই সম্ভাবনাময়। সম্ভাবনার খুবই ক্ষুদ্র অংশ আবিষ্কৃত হয়েছে। এখনও গ্যাস পাওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য ব্যাপক হারে অনুসন্ধান চালাতে হবে। সরকারের উচিত, দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া।

কর্মপরিকল্পনা
বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের আলোকে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগ ১০০ দিনের কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ৫ বছর মেয়াদি একটি পথনকশাও প্রণয়ন করেছে। গত বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নতুন মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু ও প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের কাছে এই পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
পরিকল্পনায় দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়েছে, ২০২৮ সালের মধ্যে ১০০টি কূপ খনন এবং সম্ভাব্য ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের সংস্থান করা হবে। বাপেক্সের পাঁচটি রিগের পাশাপাশি চুক্তিভিত্তিক নিয়োজিত কোম্পানিগুলোর চারটি রিগসহ ৯টি রিগের মাধ্যমে দেশে তেল গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। আরও দুটি নতুন রিগ কেনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের প্রথম ১০০ দিনের পরিকল্পনায় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়, দিনে প্রায় ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সংযুক্ত করা হবে। পরিত্যক্ত কূপগুলো থেকে গ্যাস উৎপাদনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।

এলএনজি অবকাঠামো স্থাপনের বিষয়ে ১০০ দিনের পরিকল্পনায় রয়েছে কক্সবাজারের মহেশখালীর গভীর সমুদ্রে কুতুবজোম নামে চতুর্থ ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে পাওয়া প্রস্তাব পর্যালোচনা করা হবে। 
প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার