Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের স্পষ্ট সমর্থন পাওয়ায় জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক পথ উন্মুক্ত হয়েছে। তবে বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রস্তাবে রাজনৈতিক দলগুলোর নোট অব ডিসেন্ট বা ভিন্নমত থাকায় সব সংস্কার বাস্তবায়ন হবে না—এমন আভাস দিচ্ছেন সংবিধান বিশ্লেষকরা।

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে সাত কোটি ৭৬ লাখ ৯৫ হাজার ভোটার ভোট দেন। এর মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে ‘হ্যাঁ’ ভোট পড়েছে চার কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯টি এবং বিপক্ষে ‘না’ ভোট পড়েছে দুই কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭টি। প্রদত্ত ভোটের ৬০ শতাংশের বেশি ‘হ্যাঁ’ হওয়ায় দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা কেটে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বাস্তবায়নের তিন ধাপ

জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় তিনটি ধাপ নির্ধারিত আছে। প্রথম ধাপে আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপতি গত ১৩ নভেম্বর ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ জারি করেন। দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত হয় গণভোট। ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ায় এখন শুরু হচ্ছে তৃতীয় ধাপ—সংসদ ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যকর করা।

আগামীকাল মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের কথা রয়েছে। বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ থেকে ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে জুলাই সনদে বর্ণিত সাংবিধানিক প্রস্তাবসমূহ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, সংসদ সদস্যরা দুটি শপথ নেবেন—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। পরিষদের মেয়াদ হবে ১৮০ দিন।

ঐকমত্য ও আপত্তির চিত্র

সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একাধিক দফায় বৈঠকের পর গণভোটে মোট ৮৪টি প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ৪৭টি ছিল সাংবিধানিক সংশোধনী। এসব প্রস্তাবের একটি অংশে বিভিন্ন দলের আপত্তি ছিল, বিশেষ করে বিএনপিসহ কয়েকটি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।

সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়েছে। ফলে যেসব প্রস্তাবে কোনো আপত্তি নেই, সেগুলো বাস্তবায়নে বড় বাধা দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তবে যেসব প্রস্তাবে বিএনপির নোট অব ডিসেন্ট রয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়ন অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

আইনজীবী জাহেদ ইকবাল বলেন, বাস্তবায়ন আদেশেই উল্লেখ আছে—নির্বাচনে বিজয়ী দল তাদের ইশতেহার অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। ফলে যে বিষয়গুলোতে নোট অব ডিসেন্ট ছিল, সেগুলো বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা নেই।

সম্ভাব্য পরিবর্তন

গণভোটে অনুমোদিত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে—প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা আংশিক হ্রাস এবং রাষ্ট্রপতির নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ক্ষমতা বৃদ্ধি। সাংবিধানিক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন দল, বিরোধী দল ও ক্ষেত্রবিশেষে বিচার বিভাগের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির সুপারিশের প্রস্তাবও রয়েছে।

বর্তমান সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে অধিকাংশ নির্বাহী ক্ষমতা ন্যস্ত। প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর এবং এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে রাষ্ট্রপতি নিজ এখতিয়ারে নিয়োগ দিতে পারবেন।

জুলাই সনদে বলা হয়েছে, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। শুরুতে আপত্তি থাকলেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত এ প্রস্তাবে সম্মত হয় এবং তাদের ইশতেহারেও বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করে।

তবে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধানের পদ একসঙ্গে না রাখার প্রস্তাবে বিএনপির ভিন্নমত ছিল। ফলে দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী একই ব্যক্তি হতে না পারার বিধানটি বাস্তবায়িত নাও হতে পারে।

এ ছাড়া বিএনপির ইশতেহারে উপ-রাষ্ট্রপতির পদ সৃষ্টির কথা বলা হয়েছে, যা জুলাই সনদে নেই। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ভবিষ্যতে সংশোধনের মাধ্যমে এটি যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে বিতর্ক

গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন যুক্ত থাকলেও ভোটারদের ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ একটিতেই ভোট দিতে হয়েছে—যা শুরু থেকেই বিতর্কের জন্ম দেয়। এর মধ্যে অন্যতম ছিল সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন পদ্ধতি।

গণভোটে প্রস্তাব ছিল, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন প্রয়োজন হবে।

কিন্তু বিএনপি তাদের ইশতেহারে উচ্চকক্ষ গঠনের ক্ষেত্রে আসনসংখ্যাকে ভিত্তি করার কথা বলেছে। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, এককভাবে বিএনপি ২৯০ আসনে অংশ নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে এবং জামায়াত ২২৭ আসনে অংশ নিয়ে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পেয়েছে। জোটগত হিসেবে বিএনপি জোট ৫১ শতাংশের বেশি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট ৩৮ দশমিক ৫১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। আসনসংখ্যায় বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট ৭৭টি আসন।

আসনভিত্তিক হিসাব করলে উচ্চকক্ষে বিএনপি জোটের প্রায় ৭০টি আসন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিপরীতে ভোটের আনুপাতিক হারে গঠন করলে তাদের আসন নেমে আসতে পারে ৫২–৫৩টিতে, আর জামায়াত জোট পেতে পারে অন্তত ৩৮টি আসন।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, উচ্চকক্ষের গঠন নিয়ে ব্যালটে সরাসরি ভোট হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদন পাওয়া বিষয়ই প্রাধান্য পাওয়া উচিত।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও যেসব প্রস্তাবে ভিন্নমত রয়েছে, বিশেষ করে উচ্চকক্ষের গঠন পদ্ধতি ও দলীয় প্রধান-প্রধানমন্ত্রী পৃথক থাকার প্রশ্নে, সেগুলো নিয়ে রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক বিতর্ক অব্যাহত থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শুরু হলেও, চূড়ান্ত রূপ পেতে রাজনৈতিক সমঝোতা ও আইনগত ব্যাখ্যার গুরুত্বই এখন সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র: বিবিসি বাংলা