Image description

পরপর তিনটি বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশে অনুষ্ঠিত হলো ইতিহাসের সেরা নির্বাচন। প্রাণহানি ও বড় কোনো সহিংসতা ছাড়াই নির্বাচন শেষ হয়েছে। নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে সরকার গঠনের পথে হাঁটছে। ফলাফল ঘোষণার পর শুরু হয়েছে নানা হিসাবনিকাশ। কোন সমীকরণে কোন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন আর কোন প্রার্থী কেন পরাজিত হয়েছেন সেসব আলোচনাই এখন চলছে। ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে ভূমিধস জয় পায় বিএনপি। জামায়াত জোট জিতেছে ৭৭টি আসনে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছে ৭টি আসনে। ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হয়েছে ১টি আসনে। ঢাকার ২০টি আসনের মধ্যে ১৪টি আসনে বিজয়ী হয়েছে বিএনপি’র প্রার্থীরা। ৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে জামায়াত জোটের প্রার্থীরা। তবে ঢাকার বেশির ভাগ আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে দুই জোটের প্রার্থীদের মধ্যে। কয়েকজন প্রার্থী অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। তবে দু’জন প্রার্থী নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনে।

৮ জেলায় বিএনপি’র ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যে: বিএনপি জোট ভূমিধস বিজয়ী হলেও ৮টি জেলায় তাদের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। এসব জেলায় একটি আসনও পায়নি ধানের শীষের প্রার্থীরা। জেলাগুলো হলো- সাতক্ষীরা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, চুয়াডাঙ্গা, রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী। এ ছাড়া খুলনা ও রংপুর বিভাগে একটি করে আসন পেয়েছে দলটি।

বিএনপি’র ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২১২টি আসনে বিএনপি’র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। ৭৮টি আসনে বিএনপি’র ৯৩ জন নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে মাঠে ছিলেন। এসব প্রার্থীর মধ্যে অন্তত ২১ জন প্রার্থী প্রতিপক্ষের বিজয়ে ভূমিকা রাখেন। তবে ৭টি আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ ও রাজশাহী বিভাগে ভূমিধস বিজয় পেয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা। খুলনা ও রংপুর বিভাগে বিএনপি’র ফল বিপর্যয় হয়েছে। এসব আসনে ফল বিপর্যয়ের নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বেশ কিছু আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা হেরেছেন দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে। এ ছাড়া কিছু আসনে প্রার্থী সিলেকশনে ভুল ছিল। কিছু আসনে ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে জনসম্পৃক্ততাহীন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল। এতে জেলা বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে দলীয় প্রার্থীর সমন্বয়হীনতা ছিল। অনেক আসনের মনোনয়ন বঞ্চিত নেতারা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। তাদের অনুসারী নেতাকর্মীরা ভোটের মাঠে নিষ্প্রভ ছিলেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকায় অনেক প্রার্থীর মধ্যে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস কাজ করছিল। জামায়াত প্রার্থীরা ভোটারদের ডোর টু ডোর যান একাধিকবার। কিন্তু বিএনপি’র প্রার্থীরা সেভাবে প্রচারণা চালাননি। এমনকি তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো কাজও করেননি। স্থানীয় বিএনপি নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ও হুমকি-ধমকিও ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলেছে।

উত্তরাঞ্চলকে গুরুত্ব না দেয়া ও সাংগঠনিক দুর্বলতাও ভরাডুবির কারণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। এ ছাড়া সীমান্ত জেলাগুলোতে নারী ভোটাররা জামায়াতের বিজয়ে ভূমিকা রাখেন বলে মনে করছেন তারা।

সাতক্ষীরা জেলার ৪টি আসনে বিএনপি’র ভরাডুবির কারণ হিসেবে জানা গেছে, তিনটি আসনেই প্রার্থী সিলেকশনে ভুল ছিল। ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করা হয়নি। স্থানীয় বিএনপি নেতাদের অনুসারীদের চাঁদাবাজি, সাধারণ মানুষকে হুমকি-ধমকি, তাদের অনিয়ম ভোটের মাঠে প্রভাব পড়েছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিনটি আসনের পরাজয়ের নেপথ্যের কারণ ছিল দলীয় সমন্বয়হীনতা। জেলা, উপজেলা ও পৌর বিএনপি’র শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ঐক্য ছিল না। এ ছাড়া দলের অনেকেই মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। যারা মনোনয়ন পাননি তারা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। এ ছাড়া জামায়াত প্রার্থীরা ভোটারদের ডোর টু ডোর যান। কিন্তু প্রার্থীরা অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে সেভাবে প্রচারণা চালাননি। ওই এলাকার জনগণের পালস বুঝতে পারেনি বিএনপি’র প্রার্থীরা। এ ছাড়া ভোটারদের আকৃষ্ট করার মতো প্রচারণা চালাতে পারেননি। বেশির ভাগ ধানের শীষের প্রার্থী অল্প ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থীর কাছে হেরে যান।

এদিকে রংপুর অঞ্চলের বিএনপি’র পরাজয়ে নেপথ্যে কারণ হিসেবে জানা গেছে, উত্তরাঞ্চলকে গুরুত্ব না দেয়া ও সাংগঠনিক দুর্বলতা। জাপার ঘাঁটি হলেও দলটির নেতারা এলাকামুখী না হওয়ায় সুযোগ নিয়েছে জামায়াত। এ ছাড়া জামায়াতের প্রার্থীরা ছিলেন পরিচ্ছন্ন। তাদের দলের নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজিসহ কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিল না। সেটাই ভোটের মাঠে নিয়ামক হয়ে উঠেছে। তবে রংপুরের বিএনপি প্রার্থীরা অভিযোগ করেছেন, ভোটে তারা হারেননি। ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে বিএনপি’র প্রার্থীদের হারানো হয়েছে। এদিকে ঝিনাইদহ তিনটি আসনের মধ্যে একটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর জন্য পরাজয় হয়েছে। আরেকটি আসনে দলীয় কোন্দলের কারণে মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেননি। এ ছাড়া নারী ভোট ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ঝিনাইদহের প্রতিটি আসনে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল ব্যাপক। এসব ভোটেই জামায়াতের প্রার্থীরা বাজিমাত করেছেন।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে জামায়াত জোটের ভরাডুবির নেপথ্যে-

চট্টগ্রাম বিভাগে জামায়াতের ভরাডুবি হয়েছে। এখানকার ২৩টি আসনের মধ্যে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট মাত্র দু’টি আসনে জয়ী হয়েছে। এমনকি জামায়াতের সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদও হেরেছেন কক্সবাজারে। জোটে থাকা এলডিপি’র কর্নেল (অব.) অলির নিজ আসনে তার ছেলে বিএনপি জোটের প্রার্থীর কাছে হেরেছেন। ওদিকে চট্টগ্রামে শক্ত ঘাঁটি থাকলেও প্রভাবশালী এই সংগঠনটির ভোটের মাঠের দুরবস্থার নেপথ্যে কি তা নিয়ে চলছে এখন আলোচনা। চট্টগ্রাম জেলার ১৬টি আসনের মধ্যে শহরের চারটি আসন ও উত্তর চট্টগ্রামের প্রতিটি আসনেই তাদের ভরাডুবি হয়েছে। কেবল সাতকানিয়া-লোহাগাড়া এবং বাঁশখালী আসনে জয় হয়েছে জামায়াতের প্রার্থীর। কক্সবাজারে ভালো সম্ভাবনা থাকলেও জেলার ৪ টি আসনেই হেরেছে জামায়াত। যদিও সেখানের দুইটি আসনে বিজয়ী ধানের শীষের প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান ছিল হাজারখানেক।

জামায়াত নেতা মাসুদ আলম মানবজমিনকে বলেন, ’চট্টগ্রাম অঞ্চলের মানুষ ধর্মপরায়ণ। বিশেষ করে এখানে কওমি আলেমদের পাশাপাশি তরিকতপন্থিদের ভালো অবস্থান আছে। এই দুইটি দলের লোকজন প্রকৃতিগতভাবে জামায়াত বিরোধী। বিএনপি এই বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়েছে। কওমিদের কাছে বলা হয়েছে- জামায়াত এলে কওমি মাদ্রাসা ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। মওদূদী মতবাদ (জামায়াতের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মওদূদী) প্রতিষ্ঠিত হবে। আর সুন্নীদের কাছে বলা হয়েছে জামায়াত ক্ষমতায় এলে মাজার-খানকা ভেঙে ফেলা হবে। ফলে অস্তিত্ব রক্ষায় তারা জামায়াতকে ভোট দেননি। এমনকি হেফাজতের আমীর মাওলানা মহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী বিএনপি’র পক্ষ নিয়ে জামায়াতের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করেছিলেন।’ এদিকে পরাজয়ের কারণ হিসেবে বর্তমানে চট্টগ্রাম অঞ্চলে জামায়াতের সাংগঠনিক দুর্বলতাকে দায়ী করছেন অনেকে। স্থানীয় এক সাংবাদিক ফেসবুকে লিখেছেন, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে জামায়াত জোট কমপক্ষে ৭টি আসন পাবে বলে বিশ্বাস ছিল। সেখানে মাত্র ২ টিতে জয় পেয়েছে তারা। এমনকি কুতুবদিয়া- মহেশখালীতে জনপ্রিয় প্রার্থী সাবেক এমপি হামিদুর রহমান আযাদও হেরেছেন। হিন্দু সমপ্রদায়ের ভোট ও কওমি- সুন্নীদের বিরোধিতাই ডুবিয়েছে তাদেরকে। পাশাপাশি এখানে গণমুখী নেতৃত্ব তৈরি করতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে। শাহজাহান চৌধুরী, হামিদ আযাদ, হেলালী (শামসুজ্জামান হেলালী) ছাড়া একজন পরিচিত প্রার্থী দেখান তো। চট্টগ্রাম নিয়ে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে নতুন করে ভাবা উচিত। এছাড়া এলাকাভিত্তিক সামাজিক ক্লাব, সংগঠন, মসজিদ, মাদ্রাসা পরিচালনাকারীদের নিয়ে বিএনপি ভোটারদের ম্যানেজ করার চমক দেখিয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শহরের চার আসনে প্রার্থী বাছাইয়ে জামায়াত মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেনি। চট্টগ্রাম-৯ আসনে চিকিৎসক নেতা ডা. ফজলুল হককে প্রার্থী করা হয়েছে। তিনি এই আসনের রাজনীতিতে একেবারেই নতুন মুখ। ভোটের তফসিলের সময়েও তার ছিল আমেরিকার নাগরিকত্ব- বিএনপি’র এই প্রচারণা সাধারণ ভোটারদের কাছে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তার পক্ষে খুব বেশি প্রচারণাও ছিল না। এছাড়া বয়োজ্যেষ্ঠ এবং পেশাদার ডাক্তার হওয়ায় ভোটের মাঠে খুব বেশি সময় দিতে পারেননি তিনি।

স্বতন্ত্র প্রার্থীর কারণে হারলেন

ঢাকা-১২ আসনের প্রাথমিক ফলাফলে জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল আলম বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ৫৩ হাজার ৭৭৩ ভোট পেয়েছেন। বিএনপি জোট সমর্থিত প্রার্থী সাইফুল হককে বিপুল ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে জয় পেয়েছেন তিনি। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ‘কোদাল’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৯৬৩ ভোট। অর্থাৎ সাইফুল হক থেকে ২২ হাজার ১৮০ ভোট বেশি পেয়েছেন সাইফুল আলম। এদিকে বিএনপি’র বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল আলম নীরব ফুটবল প্রতীকে পেয়েছেন ২৯ হাজার ৮৬৯ ভোট। এই আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীর কারণে হেরে গেলেন বিএনপি জোটের প্রার্থী। ওদিকে ঢাকা-১৪ আসনে (মিরপুর) জামায়াত প্রার্থী মীর আহমাদ বিন কাসেম আরমান পেয়েছেন এক লাখ এক হাজার ১১৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি প্রার্থী সানজিদা ইসলাম পেয়েছেন ৮৩ হাজার ৩২৩ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক ফুটবল প্রতীকে ১৬ হাজার ৩২৮ ভোট। এই আসনে বিদ্রোহীর কারণে হারলো বিএনপি’র প্রার্থী। মাদারীপুর-১ আসনের বিএনপি’র প্রার্থী নাদিরা মিঠু অল্প ভোটে হারলেন। ওই আসনে বিএনপি’র বিদ্রোহী প্রার্থী জামান কামাল নুরুদ্দিন মোল্লা তার পরাজয়ে ভূমিকা রাখেন।

অল্প ভোটে হারলেন যেসব প্রার্থী

এদিকে সিরাজগঞ্জ-৪ আসনে মাত্র ৫৯৪ ভোটে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খানের কাছে হেরেছেন বিএনপি’র প্রার্থী এম আকবর আলী। ঢাকা-৪ আসনে জামায়াত প্রার্থী জয়নুল আবেদীনের কাছে ২ হাজার ৯৮০ ভোটে পরাজিত হয়েছেন বিএনপি’র তানভীর আহমেদ রবিন। ঢাকা-১১ এ আসনে ২ হাজার ৩৯ ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) প্রার্থী নাহিদ ইসলাম। শাপলা কলি প্রতীকে তিনি পেয়েছেন ৯৩ হাজার ৮৭২ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি’র এমএ কাইয়ুম পেয়েছেন ৯১ হাজার ৮৩৩ ভোট। ঢাকা-১৬ আসনে বিএনপি’র হেভিওয়েট প্রার্থী মো. আমিনুল হক ৩ হাজার ৩৬১ ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন জামায়াতের কর্নেল আব্দুল হকের কাছে। ঢাকার বাইরে খুলনা-২ আসনে জামায়াতের মহানগর সেক্রেটারি শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের কাছে ৫ হাজার ব্যবধানে হেরেছেন বিএনপি’র আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু।