রাত প্রায়১২ টা, শোভনের ফোনটা বেজে উঠলো। ফোন তুলে কানে দিতেই নিলুফারের কন্ঠ পাওয়া গেল। নিলুফার তার এলাকায় কোন এক দলের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারনায় নেমেছে। হ্যালো বলতেই
নিলুফার দ্রুত গতিতে কথা বলতে শুরু করলো!
নিলুফার ঃ এই শোন, একটা জরুরী হেল্প লাগবে। তুমিতো অঙ্কে ভালো তাই এত রাতে তোমার কথাই চিন্তা করলাম।
শোভন ঃ কি হয়েছে বল।
নিলুফার ঃ নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিয়েছি। নেতার ভিষন অনুযায়ী লোকজনকে বোঝাচ্ছি, কিন্তু সবাই কেমন যেন, সবাই টাকাটা কোথা থেকে আসবে তার হিসাব বুঝিয়ে দিতে বলে! কি একটা
অবস্থা দেখত!
শোভন ঃ এত কথা না বলে ব্যপারটা কি তা বল।
নিলুফার ঃবিষয় টা হচ্ছে ফ্যামিলি কার্ড!
শোভন ঃফ্যামিলি কার্ডের আবার কি হল, ওইটাতো ভালো জিনিষ। ওইটা তো তোমরা মানে মহিলারা বা গৃহকত্রীদের দেওয়া হবে।
নিলুফার ঃকিন্তু সমস্যা হলো, ৪ কোটি কার্ডে প্রতিমাসে ২৫০০ টাকা দিতে হলে প্রতি মাসে ১০ হাজার কোটি তাকা মানে বছরে ১২০ হাজার কোটি টাকা লাগবে, এত টাকা কোথা থেকে আসবে?
শোভন ঃ এটাতো সোজা হিসাব, এতো পেচানোর কি আছে?
নিলুফার ঃ তাই বলে ১২০ হাজার কোটি টাকা! প্রতি বছর এত কোটি টাকা আসবে কোথেকে?
শোভন ঃ ভোটের আগে ৪ কোটি কার্ডের সঙ্খ্যা বলা হচ্ছে, কিন্তু ভোটের পরে সঙ্খ্যাটা আমার মনে হয় ২কোটি হয়ে যাবে, দেখবা সব ঠিক হয়ে যাবে।
নিলুফার ঃ তো ২ কোটি কার্ড হলেও তো বছরে ৬০ হাজার কোটি টাকা লাগবে, তাইনা? এই অতিরিক্ত টাকাটা আসবে কথেকে?
শোভন ঃতা লাগবে, কিন্তু এটা নিয়ে এত মাথা ঘামাচ্ছ কেন?
নিলুফার ঃ দেখত কি ঝামেলা, জনগন এখুনি বুঝতে চায় আর যতক্ষন না বুঝাতে পারছি ততক্ষন এরা বিশ্বাস করতে চাচ্ছেনা!
শোভন ঃ আচ্ছা ধর, ঢাকা শহরে ৩ কোটি লোক বাস কর্ আর ৩ কোটি লোকের জন্য প্রতিদিন ৩ কোটি ডিম সাপ্লাই হয়। বর্তমানে প্রতিটি ডিমের মূল্য ধর ১০ টাকা। ক্ষমতায় গেলে প্রতিটা ডিমে
২ টাকা চাঁদা আরোপ করলেই তো প্রতিদিন ৬ কোটি টাকা এমনিই চলে আসে।
নিলুফার ঃধুথ, ৩ কোটি মানুষ সবাই কি প্রতিদিন ডিম খায় নাকি?
শোভন ঃ আহ হা, ডিম হলো সবচেয়ে কম দামে সহজ পুষ্টি, গরীব মানুষের বাচ্চাদেরকেও তার মা প্রতিদিন কমপক্ষে একটি ডিম খাওয়ায়। আর ডিম কি শুধু আস্ত ডিম হিসাবে খায় নাকি,
বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য যেমন কেক-পেশট্রি, পুডিং, বা অন্যান্য রান্নাতেও বাড়ীতে, হোটেলে-রেস্তরায় প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ ডিম লাগে, হিসাব করলে দেখবা প্রতিদিন ঠিকই ৩ কোটি ডিম লাগে। আচ্ছা
যাও, তর্কের খাতিরে ধর প্রতিদিন ২ কোটি ডিম ঢাকা শহরে প্রয়োজন হয়।
নিলুফার ঃ আর চাঁদা, এটা চাঁদাবাজী হয়ে গেলনা?
শোভন ঃ আচ্ছা, ডাইরেক্ট চাঁদা হিসাবে না হয়ে ট্যাক্স বা ভ্যাট হিসাবে বা এইরকম একটা নামে চালিয়ে দিলেই হবে।
নিলুফার ঃ তো, ২ কোটি ডিমে ২ টাকা করে দিনে চার কোটি টাকা মানে বছরে (৩৬৫ দিন X ৪ কোটি = ১৪৬০ কোটি) এক হাজার চারশো ষাট কোটি টাকা, কিন্তু আসলে তো লাগবে
৬০ হাজার কোটি টাকা?
শোভন ঃআহ হা, শুধু ডিম নিয়ে পড়ে থাকলে হবে, প্রতিদিন তো আরও হাজার হাজার টাইপের জিনিস কেনাবেচা হয়, হয়না? ডিমের মতো এইসব সামগ্রীর উপর এইরকম চাঁদা বা ট্যাক্স ধরে
দেখ, ষাট হাজার কেন আরো অনেক হাজার বা লক্ষ কোটি টাকা হবে। আর ডিম তো ধরলাম শুধু ঢাকা শহরের উপর, গোটা বাংলাদেশে কত ডিম বিক্রি হয় তার হিসাব ধরবানা?
নিলুফার ঃ তা না হয় বুঝলাম, কিন্তু ব্যপারটা চাঁদাবাজী হয়ে গেল, অন্য কোন উপায় আছে নাকি?
শোভন ঃ আরো অনেক উপায় আছে, কিন্তু এখনই কি এত ডিটেইল বলতে হবে?
নিলুফার ঃ হ্যাঁ, এখনই বল।
শোভন ঃ সার্বজনীন পেনশন।
নিলুফার ঃ দাঁড়াও দাড়াও, শব্দটা শোনা শোনা লাগছে!
শোভন ঃ হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছ। শেখ হাসিনা সবকিছু খেয়ে ফেলার পর কাছ থেকে সার্বজনীন পেনশনের টাকা মেরে দিয়ে ক্ষমতা আরও দীর্ঘায়ীত করতে চেয়েছিল।
নিলুফার ঃ সেটা আবার কি রকম?
শোভন ঃ জনগনকে মানে সবাইকে সার্বজনীন পেনশন বাধ্যতামূলক করতে হবে, তাদেরকে প্রতি মাসে সরকারী তহবিলে তাদের বেতনের একটা অংশ পেনশনের জন্য টাকা জমা
দিতে বাধ্য করতে হবে।
নিলুফার ঃ সবাইকে বাধ্য করতে হবে মানে?
শোভন ঃ সবাইকে মানে, সরকারী-বেসরকারী-আধাসরকারী-শায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে যারা চাকরী করে, ছোট-বড় সবার কাছ থেকে তাদের বেতনের একটা অংশ, ধর ১০% কেটে নিয়ে সরকারী
তহবিলে জমা করা হবে। ৬০বছর বয়সের পরে যখন তারা রিটায়ার্ড করবে তখন তাদের প্রতিমাসে কিছু কিছু টাকে পেনশন হিসাবে দেওয়া হবে।
নিলুফার ঃ তাহলে তো অনেক টাকা! কিন্তু সব চাকুরীজীবিরা কি মাসে মাসে এই টাকা দিতে রাজী হবে? আর সরকারী তহবিলে জমাকৃত পেনশনের টাকা যদি ফ্যামিলিকার্ডে দেওয়া হয় তাহলে
এই কোটি কোটি এই চাকরীজীবিদের ৬০ বছর পর পেনশনের টাকা যখন দিতে হবে তখন কোথেকে দিবে, সব টাকা তো ফ্যামিলী কার্ডেই তো শেষ হয়ে যাবে!
শোভন ঃ আহহা, এতো চিন্তা এখুনি করছো কেন? মনে কর, যেসব সরকারী বা বেসরকারী চাকুরীজীবি, জারা ৩০-৪০ বছর বয়সে চাকরীতে ঢোকে, তাদের তো আগামী ২০-৩০ বছর কোন পেনশন দেওয়া লাগবেনা। ওদের বয়স যখন ৬০ এর উপর বা তদুর্ধ হবে তখন না ওদের নপেনশনের টাকা দেওয়া লাগবে। আর ২০-৩০ বছর পর যখন দেওয়া লাগবে তখন দেখা যাবে, এখনই
এত চিন্তা করলে হবে?
নিলুফার ঃ বুদ্ধিটা ভালো, কিন্তু ওই একটাই খটকা লাগছে, ২০-৩০ বছর পর টাকাটা কিভাবে দেয়া যাবে!
শোভন ঃ হ্যাঁ, অনেক টাকা! এইজন্যই তো মাল মুহিত বলেছিল, “অনেক টাকা, টাকার অভাব হবেনা”। আগামী ২০-৩০ বছর পর কোন দল ক্ষমতায় থাকে তা তো কেউ জানেনা, আর
আমাদের তো অতদিন ক্ষমতায় থাকার দরকারও নাই! ২০-৩০ বছর পর যে দল ক্ষমতায় আসবে সে বুঝবে, তোমার অত চিন্তা করতে হবেনা!
নিলুফার ঃ তা তো বুঝলাম, কিন্তু ভয় হচ্ছে সবকিছু আবার চিচিং ফাক হয়ে গেলে জনগনকে হিসাবটা বোঝানো কঠিন হয়ে যাবে!
শোভন ঃ এখন পুরোপুরি বোঝানো দরকার কি? জনগনকে বলবা যে ভোটের আগে সব বলে দিলে আমাদের প্রতিপক্ষ আমাদের আইডিয়া কপি করে মেরে দিবে, তাই পুরো প্লান এখন বলা যাবেনা। তবে বলবা “I have a Plan”.
নিলুফারঃ ভালো বলেছ, তবে আই না বলে উই বললে আরও ভালো হবে তাইনা, মানে “We have a Plan”?
শোভন ঃ না ,সবকিছুর দায়িত্ব নিজে নিতে যাবা কেন? এইগুলো উনি, মানে মেইন লীডারের উপর চাপাইয়া দিবা । বলবা আমাদের নেতার প্লান আছে, সে নিজে বলেছে “I have a Plan”
And we are working for him, বোঝতো, ঝামেলা নিজে নিতে নেই, আপাতত চালিয়ে দাও!
নিলুফার ঃতা তো বুঝলাম- চালিয়ে দেব, কিন্তু তারপরেও একটু ভয় করতেছে, সবকিছু আবার যদি চিচিং ফাক হয়ে যায়!
শোভন ঃ আহ হা, চিচিং ফাক না অন্য ফা–------ সেটা পরে দেখা যাবে, আগে ১২ তারিখ পর্যন্ত চালিয়ে নাও!
নিলুফার ঃ ঠিক বলেছ, ১২ তারিখ!
শোভন ঃ হ্যা । আর মাত্র কয়েকদিন, ১২ তারিখ!
নিলুফার ঃ ঠিক আছে, রাখলাম।
শোভন ঃ Bye, have a good night!
নিলুফার ঃ গুড নাইট!
লেখক ঃ শোভন, আমেরিকা প্রবাসী একজন বাংলাদেশী প্রকৌশলী ।