Image description

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচারের সময় আর মাত্র তিন দিন। নির্বাচনী রাজনীতি এখন অন্তিম সমীকরণের প্রান্তে। নির্বাচন কমিশন ঘোষিত সময়সীমা অনুসারে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টার মধ্যে নির্বাচনী প্রচার শেষ করতে হবে। সে কারণে এই তিন দিনের মধ্যেই নিজেদের পক্ষে জনসমর্থনের পাল্লা ভারী করার জন্য সর্বশেষ চেষ্টায় সক্রিয় দল ও প্রার্থীরা।

 
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দলগুলোর কর্মসূচি থেকে আভাস মিলেছে, এই শেষ তিন দিন রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশ মিছিল ও নির্বাচনী সভায় সরগরম থাকতে পারে। এই সময় দলগুলো অসহিষ্ণু আচরণ না কমলে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে বলেও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।

 

সার্বিক এই পরিস্থিতিতে আগামী রবিবার থেকে সারা দেশে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন। সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য নির্বাচনের আগেই আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত জরুরি, বিধায় ৬২টি জেলার ৪১১টি উপজেলায় এবং মেট্রোপলিটন শহরগুলোতে ৫৪৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করে নিয়মিত টহল, যৌথ অভিযান চালানো হচ্ছে।

 
গত ২০ জানুয়ারি এক লাখ সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নৌবাহিনী পাঁচ হাজার এবং বিমানবাহিনী তিন হাজার ৭৩০ জন সেনা মোতায়েন করেছে। উপকূলীয় দুই জেলায় দায়িত্ব পালন করবে নৌবাহিনী।

 

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনী প্রচারের শেষ জনসভা ঢাকায় অনুষ্ঠিত হবে।

 
দলীয় নেতারা জানান, এই জনসভাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। জনসভায় জনসাধারণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দলের বিভিন্ন ইউনিটসহ অঙ্গসংগঠনের নেতাদের নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে। এই জনসভাকে নির্বাচনপূর্ব চূড়ান্ত শক্তি প্রদর্শন হিসেবে দেখছে দলটি। জনসভায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও করণীয় তুলে ধরবেন তারেক রহমান। নির্বাচনী প্রচারের শেষ এই জনসভাটি আগামী রবিবার অনুষ্ঠিত হবে বলে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে নয়াপল্টনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জানান দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী।
 
তবে পরে বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য আতিকুর রহমান রুমন কালের কণ্ঠকে বলেছেন, শেষ নির্বাচনী জনসভার তারিখ পরিবর্তন হতে পারে। পরিবর্তন হলে তা শিগগিরই সাংবাদিকদের জানানো হবে। এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারম্যান আজ রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে দলের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করবেন।

 

জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান আজ শুক্রবার পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, নড়াইল, ফরিদপুর সদর ও বোয়ালমারী এবং আগামীকাল শনিবার হবিগঞ্জ, কুলাউড়া, সুনামগঞ্জ ও সিলেট মহানগরীতে নির্বাচনী জনসভা করতে পারেন। রবিবার ও সোমবার তিনি ঢাকা-১৫ আসনে গণসংযোগ ও গণমিছিলে যোগ দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার সমাপ্তি টানতে পারেন।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন : জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য ও নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. বদিউল আলম মজুমদারের মতে, গত ২২ জানয়ারি শুরু হওয়ার পর থেকে নির্বাচনী প্রচারে ক্রমেই রাজনৈতিক দলগুলোর অসহিষ্ণু আচরণ বেড়েছে। তিনি গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে যেভাবে আক্রমণাত্মক বক্তব্য প্রয়োগ হয়েছে, তা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনগুলোতে এই অসহিষ্ণু আচরণ বহাল থাকলে তা সহিংসতায় রূপ নিতে পারার আশঙ্কা রয়েছে, যা মোটেই কাম্য নয়। বিশেষ করে এবারের নির্বাচনে বড় দুটি দলের নেতাদের আগ্রাসী বক্তব্য থেকে সরে আসা দরকার।’

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ও পরের কয়েক দিন প্রার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে বিশেষ নজর রাখতে হবে। কোনো আশঙ্কাকেই কম গুরুত্ব দেওয়া উচিত হবে না। 

আরেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য ড. মো. আব্দুল আলীম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রচারের শেষ কয়েকটি দিন সারা দেশ দল ও প্রার্থীদের মিছিল-সভায় সরগরম থাকবে—এটাই স্বাভাবিক। তবে এসব মিছিল-জনসভা যেন শান্তিপূর্ণ হয়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সতর্ক থাকতে হবে। যদিও এবারের নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের অনেকগুলো নির্বাচনের তুলনায় ভালো। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদি আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে নির্বাচনে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে যে শঙ্কা জেগেছিল তা অনেকটাই কমেছে বলেই মনে হয়। শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কি না—এই সংশয়ও দূর হয়েছে। নির্বাচনী সংহিসতাও এবার তুলনামূলকভাবে কম। শেরপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় জামায়াতের একজন নেতা নিহত হলেও পাল্টা কোনো ঘটনা ঘটেনি। প্রচলিত আইনেই বিষয়টি নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি নির্বাচনের অনুকূল। নির্বাচন কমিশনও আচরণ বিধি ভঙ্গের বিরুদ্ধে কিছু আইনি ব্যবস্থা নিচ্ছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর দিকে নির্বাচন কমিশন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যদের নজরদারি বাড়াতে হবে। শেষ সময়ের প্রচারে পরিস্থিতির অবনতি হবে না বলেই আমরা আশা করি। এ বিষয়ে দল, দলীয় প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের সংযত আচরণ করতে হবে। আরেকটি বড় সমস্যা হচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানো। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।’

অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হওয়ার আহবান ইসির : এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের পোস্টাল ব্যালটের ফলাফল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন বিভ্রান্তিমূলক তথ্যের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি)। কমিশন স্পষ্ট জানিয়েছে, ভোট গণনার নির্ধারিত সময়ের আগে ফলাফল জানার কোনো সুযোগ নেই।

গতকাল এক বিজ্ঞপ্তিতে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে বলা হয়, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্টাল ভোটের ফলাফলসংক্রান্ত নানা ধরনের বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে পোস্টাল ব্যালট পেপার নির্বাচনের দিন বিকেল সাড়ে ৪টার পর নিয়মিত ভোট গণনার সময় একই সঙ্গে গণনা করা হবে। এই সময়ের আগে পোস্টাল ভোটের ফলাফল জানার কোনো আইনগত বা কারিগরি সুযোগ নেই। এসংক্রান্ত যেকোনো ধরনের আগাম তথ্য বা প্রচারণা ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। জনসাধারণকে এ ধরনের কোনো গুজব বা মিথ্যা প্রচারণায় বিভ্রান্ত না হওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে।

বিজ্ঞপ্তিতে আরো বলা হয়, যারা নির্বাচনের সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়াচ্ছে, তাদের শনাক্ত করতে সাইবার মনিটরিং টিম কাজ করছে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গুজব ছড়ালে তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গতকাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নির্বাচন পর্যবেক্ষণ মিশনের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস ইজাবস নির্বাচনের প্রস্তুতি ছাড়াও জানতে চেয়েছিলেন এখন সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনের জন্য প্রধান চ্যালেঞ্জ কী? সিইসি জানিয়েছেন, প্রধান চ্যালেঞ্জ হচ্ছে অপতথ্য।

এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সচিব আখতার আহমেদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছে। আমরা জানিয়েছি, ১১৬টি আসনে ব্যালট পেপার পাঠিয়েছি। বাকিগুলোতে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারির মধ্যেই পাঠানো হবে। চ্যালেঞ্জ বিষয়ে আমরা শুরু থেকেই বলেছি ‘অপতথ্য’। আমরা মেটার সঙ্গে কথা বলেছি। আশা করি, মেটা আমাদের সহযোগিতা করবে। আমরা চাই না ইন্টারনেটের স্পিড কমানো হোক। আক্রমণাত্মক কন্টেন্ট ডাউন করতে মেটাকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।