ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি আর মাত্র ছয়দিন। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে সংঘাত-সহিংসতার আশঙ্কা। এর নেপথ্যে অবৈধ অস্ত্র। বিভিন্ন সূত্রের খবর, সীমান্তের বেশ কয়েকটি পয়েন্ট দিয়ে দেদারছে অস্ত্র আসছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ আমলের তিন মেয়াদে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দেওয়া ১০ হাজারের বেশি অস্ত্র এরই মধ্যে অবৈধ হয়ে গেছে। এসব অস্ত্রের পাশাপাশি পুলিশের লুণ্ঠিত যেসব আগ্নেয়াস্ত্র (১৩৩১) উদ্ধার হয়নি, সেগুলোও বাড়িয়েছে ঝুঁকির মাত্রা। শুধু তা-ই নয়, অভ্যুত্থানের সময় পুলিশের পাশাপাশি দুটি কারাগার থেকে লুট হওয়া ২৭টি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি। আর পুলিশের লুণ্ঠিত আড়াই লাখের বেশি গোলাবারুদ রয়ে গেছে দুষ্কৃতকারীদের হাতে। সব মিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে অস্ত্রের ঝনঝনানির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
জানতে চাইলে অপরাধ ও সমাজ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, ‘বৈধ লাইসেন্সধারীরা নির্দিষ্ট সময়সীমার পরও অস্ত্র জমা দেননি। এর মাধ্যমে অস্ত্রগুলো অবৈধ হয়ে গেছে। এছাড়া পুলিশের কাছ থেকে লুট হওয়া যেসব অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা যায়নি, সেসব অস্ত্র নিশ্চিতভাবেই নির্বাচনে সংঘাত ও সহিংসতায় নিয়ামক ভূমিকা পালন করবে। পাশাপাশি সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।’
সূত্র জানায়, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, সাতক্ষীরা, যশোর, কুমিল্লা, কক্সবাজার সীমান্ত দিয়ে বেশি অস্ত্র আসছে। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের ৪৬ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৮ কিলোমিটার সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া থাকলেও বাকিটা কাঁটাতারবিহীন। উন্মুক্ত এই সীমান্ত দিয়েই সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে আসছে অস্ত্র। যেসব পয়েন্ট দিয়ে অস্ত্র আসছে, সেগুলোর মধ্যে আছে- কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের জামালপুর, বিলগাথুয়া, ধর্মদহ, মুন্সীগঞ্জ, চরপাড়া, চল্লিশপাড়া, বাংলাবাজার ও উদয়নগর; ঝিনাইদহ মহেশপুরের বাঘাডাঙ্গা, পলিয়ানপুর, যাদবপুর, জুলুলী, লেবুতলা, মরকধ্বজপুর, শ্যামকুড়, রায়পুর ও কচুয়ারপোতা। এসব পয়েন্ট দিয়ে চোরাইপথে আসা অস্ত্র হাতবদল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে রাজধানীসহ সারা দেশের নির্বাচনি এলাকাগুলোয়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) ও পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে মাঝেমধ্যে দু-একটি অস্ত্র উদ্ধার হলেও দুষ্কৃতকারী ও পেশিশক্তির হাতে এখনো বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ রয়েছে।
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঝিনাইদহের সীমান্তঘেঁষা উপজেলা মহেশপুরের গ্রামে অস্ত্র চোরাচালানের শক্তিশালী সিন্ডিকেট রয়েছে। এই উপজেলার নয়টি গ্রামের মাধ্যমে ভারত থেকে অস্ত্র আসছে। এই এলাকায় চোরাচালানকারী হিসাবে যাদের চিহ্নিত করা হয়েছে তাদের মধ্যে আছে- শামসুল ইসলাম কুটি মিয়া, নওশের আলী, শমসের আলী ওরফে ভ্যাংচা ও এনামুল, আল আমিন, জালাল হোসেন প্রমুখ।
বিজিবি সূত্র জানায়, ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর থেকে গত ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সারা দেশের বিভিন্ন সীমান্তে অভিযান চালিয়ে দুটি এসএমজি, ১৬টি রাইফেল, পাঁচটি রিভলবার, ৯০টি পিস্তল, অন্যান্য ক্যাটাগরির ১০২টি অস্ত্র, দুই হাজার ৩১১ রাউন্ড গোলাবারুদ, ৮১টি ম্যাগাজিন, ১৩টি মর্টার শেল, ২০ দশমিক শূন্য পাঁচ কেজি গান পাউডার, ২৩টি গ্রেনেড, ১২৯৫টি ককটেল এবং চারটি মাইন উদ্ধার করা হয়েছে। বিজিবি ফুলবাড়ী ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল এএম জাবের বিন জব্বার জানান, বুধবার দিনাজপুর সীমান্তে বিজিবির বিশেষ অভিযানে দুটি বিদেশি অস্ত্র, চার রাউন্ড গুলি এবং বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য জব্দ হয়েছে। আর সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, বেসামরিক বাহিনীকে সহযোগিতার আওতায় ২০২৪ সালের জুলাই মাস থেকে গত ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে ১০ হাজার ১৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার করেছে সশস্ত্র বাহিনী। পাশাপাশি ২ লাখ ৯০ হাজার ৯০৭ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর ১১ ডিসেম্বর থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ১৯৯টি অস্ত্র ও এক হাজার ৯৭২ রাউন্ড গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে।
পুলিশ সদর জানায়, তফসিল ঘোষণার পর ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ডেভিল হান্ট ফেজ-২ অপারেশনে ৬৪৪টি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ২৪ হাজার ৬২০ জন।
ডিএমপি সূত্র জানায়, গত ১৪ ডিসেম্বর থেকে ডেভিল হান্ট ফেস-২ অপারেশন শুরুর পর ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৬টি বিদেশি পিস্তল, দুটি দেশি পিস্তল, ছয়টি বিদেশি রিভলবার, একটি একনলা বন্দুক, ৩৯০ রাউন্ড গুলি, ১৫৭ রাউন্ড কার্তুজ, ২৬টি ম্যাগাজিন এবং ১৬ দশমিক ৩০০ কেজি বিস্ফোরক উদ্ধার হয়েছে। এছাড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় চারটি বিদেশি রিভলবার, ১১টি বুলেট, ৭৭ রাউন্ড তাজা কার্তুজ, দুটি গুলির খোসা, দুটি ম্যাগাজিন, একটি রিভলবারের কভার, দুটি ছুরি এবং একটি চাকু উদ্ধার হয়েছে।
জানতে চাইলে পুলিশের আইজি বাহারুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘উদ্ধার না হওয়া অবৈধ অস্ত্র নির্বাচনে ব্যবহার হতে পারে বলে আশঙ্কা আছে। তাই অস্ত্র উদ্ধারে আমাদের প্রচেষ্টা শুরু থেকেই ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে অভিযান অধিকতর জোরালো হয়েছে। সেনাবাহিনী, র্যাব, কোস্ট গার্ডসহ অন্যান্য বাহিনী আমাদের সহযোগিতা করছে। প্রচুর অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হচ্ছে। কিন্তু পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্রগুলো পাচ্ছি না। রাজনৈতিক বিবেচনায় আওয়ামী লীগ আমলে যেসব অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল, সেসব অস্ত্রও খুঁজে পাচ্ছি না। আর যেসব অস্ত্র জমা দেওয়া হয়নি সেগুলোর ব্যাপারে সারা দেশে মামলা হয়েছে। এসব অস্ত্রের মালিকরা বিদেশে পালিয়ে গেছেন। অস্ত্রগুলো নিশ্চয়ই বাসায় রেখে যাননি। কারও কাছে দিয়ে গেছেন বা লুকিয়ে রেখে গেছেন।’
গত ১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পল্লবী এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও গুলিসহ আলাল নামে একজনকে গ্রেফতার করে যৌথ বাহিনী। ২৩ জানুয়ারি নরসিংদীতে অভিযান চালিয়ে দুটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন ও ১২ রাউন্ড গুলিসহ একজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এর আগের দিন ২২ জানুয়ারি দুটি অবৈধ বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন ও ২১ রাউন্ড গুলিসহ একজন অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে ডিবি। এর আগেরদিন ২১ জানুয়ারি রাজধানীর বানানী এলাকা থেকে একটি বিদেশি রিভলবারসহ একজনকে গ্রেফতার করে বনানী থানা পুলিশ। ১৪ জানুয়ারি রাজধানীর পল্লবী এলাকা থেকে বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন ও তিন রাউন্ড গুলিসহ একজনকে গ্রেফতার হয়। ৯ জানুয়ারি একটি বিদেশি পিস্তলসহ এক নারীকে গ্রেফতার করে পল্লবী থানা পুলিশ। ২৯ ডিসেম্বর পল্লবী এলাকায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি রিভলভার, দুই রাউন্ড গুলিভর্তি ম্যাগাজিনসহ একটি বিদেশি পিস্তল ও বিপুল পরিমাণ গুলি উদ্ধার এবং চিহ্নিত এক সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার করে ডিবি-মিরপুর বিভাগ। ওইদিন একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন, চার রাউন্ড গুলিসহ দুজনকে গ্রেফতার করে গুলশান থানা পুলিশ। ১৯ ডিসেম্বর পল্লবী থানা পুলিশের অভিযানে পরিত্যক্ত অবস্থায় তিনটি রিভলভার ও ৭৩ রাউন্ড তাজা কার্তুজসহ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়। গত ২৬ অক্টোবর ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রেলওয়ে স্টেশনে আটটি বিদেশি পিস্তল ও বিস্ফোরক জব্দ করে সেনাবাহিনী। ৩০ অক্টোবর চট্টগ্রামের রাউজানে অভিযান চালিয়ে ১০টি বন্দুক, একটি এয়ারগান, ১১টি কার্তুজ, চারটি কার্তুজের খোসাসহ বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার এবং দুজনকে গ্রেফতার করে র্যাব। একই দিন রাতে ঢাকার আশুলিয়ায় অভিযান চালিয়ে একটি বিদেশি পিস্তল, দুটি ম্যাগাজিন, ৩৩ রাউন্ড শটগান ও পিস্তলের কার্তুজ উদ্ধার করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা।
গত সোমবার মধ্যরাতে মৌলভীবাজারের বড়লেখা সীমান্ত এলাকায় বিজিবি বিশেষ অভিযান চালিয়ে ব্যাপক পরিমাণ উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করে। উদ্ধারকৃত বিস্ফোরক ও অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে ২৪টি পাওয়ারজেল নাইনটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন (ভারতের এসবিএল এনার্জি লিমিটেড, নাগপুরে প্রস্তুতকৃত) বিস্ফোরক, ২৩টি ডেটোনেটর, ১৫ মিটার ডেটোনেটর কর্ড এবং ৩টি পাইপ গান।
জানতে চাইলে সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুম যুগান্তরকে বলেন, ‘যাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র আছে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। ইতোমধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে। অবৈধ অস্ত্র দিয়ে দুষ্কৃতকারীরা যে কোনো সময় নাশকতা ঘটাতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব ইউনিটকে আরও জোরালো অভিযান চালাতে হবে। এ ক্ষেত্রে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। না হলে সুযোগ সন্ধানী মহল ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করবেই।’