Image description

সচিবালয়ের সাধারণ কর্মচারীদের কল্যাণের জন্য গঠিত হয়েছে বাংলাদেশ সচিবালয় বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেড। সাধারণ কর্মচারীরা এই সমিতির মালিক বা শেয়ার হোল্ডারও বটে। সরকারের কাছ থেকে রেশনিং মূল্যে মালামাল নিয়ে কর্মচারীদের কাছে সরবরাহ, ক্যান্টিন পরিচালনাসহ বিভিন্ন সেবামূলক কার্যক্রম এই সমিতির অধীনে পরিচালিত হয়ে থাকে। সমবায় অধিদপ্তরের অধীনে থেকে সদস্যদের সঞ্চয় বৃদ্ধি এবং ন্যায্য মূল্যে সেবাপ্রদান নিশ্চিত করা-ই এর উদ্দেশ্য। কিন্তু বিগত সময়ে দেখা গেছে, সমিতির নেতৃত্বে যারা ছিলেন- কর্মচারীদের কল্যাণের পরিবর্তে নিজেদের আখের গুছিয়ে নেওয়ার কাজে ব্যস্ত থেকেছেন। কেনাকাটায় অনিয়ম, ওএমএস এবং নতুন সদস্যের চাঁদাবাবদ প্রদানকৃত অর্থের আত্মসাত প্রভৃতির মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দাখিল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে সমবায় অধিদপ্তর থেকে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। তদন্তে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণও পাওয়া যায়। গত বছরের জুনে সচিবালয় সমবায় সমিতির পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দেয়া হয়। কিন্তু পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দিলেও দুর্নীতিবাজ ও অর্থ আত্মসাতকারী সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় বা সমবায় অধিদপ্তর এ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনোই ব্যবস্থা নেয়নি। এইসব কর্মচারী নেতারা এখন পর্যন্ত রয়ে গেছেন ধরা-ছোঁয়ার বাইরে।

জানা গেছে, ৩ জুন, ২০২৫ সচিবালয় সমবায় সমিতির পরিচালনা পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন এডহক কমিটি গঠন করা হয়। কিন্তু সেই এডহক কমিটি গঠনের বিরোধিতা করে হাইকোর্টে রিট মামলা দায়ের করেন সমিতির দুর্নীতিবাজ নেতারা। হাইকোর্ট নতুন কমিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবে নতুন কমিটির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়ে হাইকোর্টের কোনো বাধা নেই। তারপরও সমবায় অধিদপ্তর বা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় এই দুর্নীতিবাজ কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কোনোই ব্যবস্থা নিচ্ছে না। সর্বশেষ গত ২৬ জানুয়ারি বাংলাদেশ বহুমুখী সমবায় সমিতি লি. এর ম্যানেজার মো. রুহুল আমিন পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগে তিনি সমিতির সাবেক নেতাদের দুর্নীতির তথ্য তুলে ধরেছেন।

অভিযোগপত্রে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সচিবালয় বহুমুখী সমবায় সমিতি লি. বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভ্যন্তরে একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান। সমবায় অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিলুপ্তকৃত ব্যবস্থাপনা কমিটির সম্পাদক মো. মজিবুর রহমানসহ সকলে মিলে বিভিন্ন ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাত করেছেন। নতুন শেয়ার হোল্ডারগণের নিকট হতে ১,১০০/- (এক হাজার একশত) টাকা করে আদায়ের পর প্রায় ২৭,০০,০০০/- (সাতাশ লক্ষ) টাকা সমিতির হিসাবে জমা না করে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া গত ০৪/০৬/২০২৫ইং তারিখ কর্মচারীদের মে/২০২৫ইং মাসের বেতন ও ঈদুল আযহার উৎসব ভাতা দিতে সমিতির ক্যাশে কোন টাকা না থাকায় সম্পাদক আমাকে ঋণ করে বেতন ভাতা দিতে বলেন। সেই অনুযায়ী আমি ৩,০০,০০০/-(তিন লাখ) টাকা ঋণ করে কর্মচারীদের বেতন প্রদান করি। কিন্তু আমার ৩,০০,০০০/-টাকা এখন পর্যন্ত পরিশোধ করেননি। আমার ৯ মাসের বেতন ও ঈদুল আযহার উৎসব ভাতা পরিশোধ করেননি। বর্তমানে আমি কিডনি, লিভার ও ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা করতে পারছি না। এছাড়া বেতন-ভাতাদি না পেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খুব কষ্টে দিনাতিপাত করছি।

উল্লেখ্য, সহ-সভাপতি আব্দুস সালাম গত ২৮/০১/২০২৫ইং ও ২৯/০১/২০২৫ইং সমিতির ক্যাশ হতে ২,৩০,০০০/-(দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার) টাকা নিয়ে পরিশোধ করেননি। আরও উল্লেখ্য যে, অনিয়মতান্ত্রিকভাবে বাজার করে অতিরিক্ত বিল ভাউচার করে লাখ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এ রকমের প্রায় এক কোটি টাকার বিল-ভাউচার সম্পাদক অনুমোদন করেননি। সম্পাদক সমিতির নির্বাহী, সেই অনুযায়ী সম্পাদকের অনুমোদন না থাকলে বিল-ভাউচার অবৈধ। গত ১৫/০৬/২০২৫ইং জনতা ব্যাংক, আব্দুল গনি রোড শাখা হতে ১,০০,০০০/-(এক লাখ) টাকা উত্তোলন করেছেন, কিন্তু উক্ত টাকা সমিতির ক্যাশে জমা দেননি। এছাড়া গত ২৪/০৬/২০২৫ইং তেজগাঁও সিএসডি গোডাউন হতে ৪ মেঃ টন আটা ও ৪ মেঃ টন চাল উত্তোলন করার পর সচিবালয়ে একটি অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার পর সমবায়ের সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সেই আটা ইঁদুরে কেটে, পঁচে পোকা হওয়ার পর মাছের খাদ্য হিসেবে এবং চালে পোকা ধরা ও ইঁদুরে খাওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তা মুরগির খাবার হিসেবে ব্যবহার করা হয়।”

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ম্যানেজার মো. রুহুল আমিনের অভিযোগের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ। তবে জানা গেছে, সমবায় সমিতির নতুন শেয়ারহোল্ডার বাবদ অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ এনেছেন রুহুল আমিন, প্রকৃত ঘটনা এর চেয়েও বড়। সমিতির প্রভাবশালী নেতারা বিগত ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে বাংলাদেশ সচিবালয়ের অন্ততঃ দশ হাজার কর্মচারীর কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন সমবায় সমিতির শেয়ারহোল্ডার করার কথা বলে। কিন্তু শেয়ারহোল্ডার করেছেন মাত্র ২৯০০ জনকে। বাকি টাকা মেরে দিয়েছেন নেতারা। যেহেতু এই নেতারা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তাই সাধারণ কর্মচারীরা তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাননি। যেসব কর্মচারী আওয়ামী লীগ সমর্থক বলে পরিচিত ছিলেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারাই নতুন সদস্য বা শেয়ারহোল্ডার পদ পেয়েছেন। যাদের শেয়ারহোল্ডার পদ দেওয়া হয়েছে তাদের টাকাও সমিতির ফান্ডে জমা না দিয়ে আত্মসাত করা হয়েছে। বলা যায়, সমবায় সমিতিকে কেন্দ্র করে বড় রকমের নৈরাজ্য চলেছে বিগত আওয়ামী লীগ আমলে। এসব নিয়ে সাধারণ শেয়ারহোল্ডার বা কর্মচারীদের প্রশ্ন করারও সাহস ছিল না।

এইসব লুটপাট, অনিয়ম যখন হয় ওই সময় সমিতির সভাপতি পদে ছিলেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা (বর্তমানে ব্যক্তিগত কর্মকর্তার দায়িত্বে) মইনুল ইসলাম, সম্পাদক পদে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব রক্ষণ কর্মকর্তা মজিবুর রহমান, সহসভাপতি পদে লেজিলেটিভ ও ড্রাফটিং বিভাগের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা আব্দুস সালাম এবং কোষাধ্যক্ষ পদে স্থানীয় সরকার বিভাগের সাঁট মুদ্রাক্ষরিক কাম কম্পিউটার অপারেটর (সম্প্রতি ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদে পদোন্নতিপ্রাপ্ত) ওসমান গনি। সমিতির পরিচালক পদে ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের ক্রয় কর্মকর্তা শাহ আলম সরকার, গণপূর্ত অধিদপ্তরের কার্পেন্টার আবদুল হক ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এমএলএসএস মহিবুল আলম সরদার। এরা সবাই কমবেশি সমিতির অর্থ আত্মসাত ও দুর্নীতি-অপকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। তবে সবচেয়ে বেশি অর্থ হাতিয়েছেন সম্পাদক মজিবুল হক। মজিবুল হক মাঝে অনেকদিন অসুস্থ্য থাকায় কেনাকাটার বিল-ভাউচারে ভাগ বসাতে পারেননি। পরবর্তীতে এই ভাগাভাগি নিয়েই নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। জমে যায় কোটি টাকার বিল-ভাউচার।

জানা গেছে, কেনাকাটায় অনিয়ম, শেয়ারহোল্ডারদের সদস্য ফরমের অর্থ আত্মসাত, তহবিল থেকে নগদ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ছাড়াও ওএমএস বাণিজ্যেরও বড় রকমের অভিযোগ রয়েছে সমবায় সমিতির এই নেতাদের বিরুদ্ধে। ওএমএস’র মালামাল গোপনে বাইরে বিক্রি করে এই কর্মচারী নেতারা প্রতিদিন বড় রকমের অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন।

শীর্ষনিউজ