সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ২০১১ সালে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়। ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর আদালত সেই ধারাটি বাতিল ঘোষণা করে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন। তবে আদালতের রায়ে গণভোটের বিধানটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হওয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেননা জেনারেল ক্লজ অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ৬ ধারা অনুযায়ী কোনো আইনকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে তা সংসদে পাস করানোর প্রয়োজন হবে। অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ‘গণভোট’ অধ্যায়ে এ বিষয়গুলো সরাসরি উল্লেখ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ‘গণভোটের বিধানটি আগামী সংসদে উপস্থাপন করে পাস করানোর সুপারিশ’ যুক্ত করা আছে।
এ বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে আইনজ্ঞ ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা একই মত প্রকাশ করে বলেন, আদালত একটি আইনকে বাতিল বা বেআইনি ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু কোনো আইনকে পুনরুজ্জীবিত বা কার্যকরভাবে ফিরিয়ে আনতে তা জাতীয় সংসদে পাস করাতে হয়। তাই আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের মাধ্যমে গণভোটের বিধানটি পাস করিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হবে। তাই তারা মনে করেন, গণভোটের রায় যেমনই হোক নির্বাচিত জাতীয় সংসদেরই সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রায়ের মাধ্যমে কোনো পুরনো আইনকে পুনর্বহাল করা যায় না। এটা খুব টেকনিক্যাল বিষয়। আইনের তথ্যগত দিক থেকে সুপ্রিম কোর্ট একটি আইনকে বাতিল বা বেআইনি ঘোষণা করতে পারেন। কিন্তু একটি আইনকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেন না।’
বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণভোটের কোনো বিধান ছিল না। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের সময় পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে এ বিধান যুক্ত হয়। তখন সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে নতুন উপধারা (১ক) যোগ করা হয়। এতে বলা হয়, সংবিধানের প্রস্তাব এবং ৮, ৪৮, ৫৬, ৫৮, ৮০ ও ৯০ক অনুচ্ছেদ সংশোধনের বিল সংসদে পাস হওয়ার পর তা রাষ্ট্রপতির কাছে গেলে তিনি বিষয়টি গণভোটে দেয়ার ব্যবস্থা করবেন। একই সঙ্গে ১৪২ অনুচ্ছেদে গণভোটসংক্রান্ত আরো কয়েকটি উপধারা—(১খ), (১গ) ও (১ঘ)—যোগ করা হয়।পরে ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সময় দ্বাদশ সংশোধনী আনা হয়। তখন ১৪২ অনুচ্ছেদের (১ক) দফায় পরিবর্তন আনা হয়। ফলে ৫৮, ৮০ ও ৯০ক অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক রাখা হয়নি। অর্থাৎ গণভোটের বিধান আরো সীমিত করা হয়। তখন শুধু সংবিধানের প্রস্তাব এবং ৮, ৪৮ ও ৫৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোটের বাধ্যবাধকতা রাখা হয়।
এরপর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১১ সালের ৩০ জুন পঞ্চদশ সংশোধনী পাস হয়। এ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৪২ অনুচ্ছেদ প্রতিস্থাপন করা হয় এবং গণভোটের বিধান পুরোপুরি বাতিল করা হয়। ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর পঞ্চদশ সংশোধনীসংক্রান্ত মামলার রায়ে আদালত ১৪২ অনুচ্ছেদের ওই পরিবর্তন বাতিল ঘোষণা করে গণভোটের বিধান ফিরিয়ে আনেন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে গণভোটের বিধান স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুনর্বহাল হবে কিনা তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। কারণ জেনারেল ক্লজ অ্যাক্ট, ১৮৯৭-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, কোনো আইনকে আবার পুনরুজ্জীবিত করতে হলে সংসদে আইনটি পাস করানোর দরকার হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে এ বিষয়ের অবতারণা করে ‘গণভোটের বিধানটি আগামী সংসদে উপস্থাপন করে পাস করানোর সুপারিশ’ করা হয়েছে।
জানতে চাইলে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার কার্যক্রমের মুখ্য সমন্বয়ক) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এত রক্তপাত এবং প্রাণের বিনিময়ে প্রতিষ্ঠিত অন্তর্বর্তী সরকার, যার প্রথম এবং প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে সংস্কার করা, সেই সংস্কারের আওতায় জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়েছে এবং সেগুলোর ব্যাপারে সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে এ বিষয়ে একটি গণভোট হবে। আইনি জায়গা থেকেই সব রাজনৈতিক দল একমত হয়েছে যে গণভোট করবে।’
উল্লেখ্য, রাজধানীতে ২৮ জানুয়ারি ‘শান্তিপূর্ণ নির্বাচন ও সহিংসতা প্রতিরোধ: মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার আলোকে’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, ‘নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম দিন থেকেই সংসদ স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে—সরকার গঠন, রাষ্ট্র পরিচালনা ও বাজেট প্রণয়ন করবে। তবে সংবিধানকে ফ্যাসিবাদের পথ থেকে সরাতে মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। সে জন্য নির্বাচিত সদস্যরা আলাদা শপথ নিয়ে ১৮০ দিনের মধ্যে সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন।’ তার এ বক্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। এ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে মত প্রকাশ করেন যে গণভোটের ফল ‘হ্যাঁ’ হলে অন্তর্বর্তী সরকার ছয় মাস পর ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। পরবর্তী সময়ে বৃহস্পতিবার রাতে ‘সিএ প্রেস উইং ফ্যাক্টস’ থেকে এ বিষয়ে একটি পাল্টা পোস্ট দেয় প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং। এ পোস্টে দাবি করা হয়েছে, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ১৮০ দিন গণপরিষদ হিসেবে কাজ করবে—এমন কথা বলেননি অধ্যাপক আলী রীয়াজ। বরং নির্বাচিত সংসদ সদস্যরাই এ দায়িত্ব পালন করবেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
সংবিধান, নির্বাচন, বিচার ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গঠিত সংস্কার কমিশনের দেয়া প্রস্তাব নিয়ে গত বছর দীর্ঘ সময় রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ৭৪ দফা বৈঠক করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন। জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫-এ রাজনৈতিক দল ও অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাক্ষরের পর এটি বাস্তবায়নে অবিলম্বে সরকারি আদেশ জারি করে একটি গণভোট আয়োজনের সুপারিশ করে ঐকমত্য কমিশন।
বাংলাদেশে স্বাধীনতার পর এখন পর্যন্ত তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে—১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৯১ সালে। প্রথম গণভোট হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে। তখন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তার অনুসৃত নীতি ও কর্মসূচির প্রতি জনগণের সমর্থন আছে কিনা, তা জানার জন্য এ গণভোটের আয়োজন করেন। দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ। সে সময় রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তার নীতি ও কর্মপন্থার প্রতি জনগণের আস্থা যাচাই করতে এবং স্থগিত সংবিধানের অধীনে নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি পদে থাকার বিষয়ে জনগণের সম্মতি নিতে গণভোট দেন।
তৃতীয় গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর। এটি অনুষ্ঠিত হয় সংবিধানের ১৪২(১ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী। গণভোটে জনগণের সামনে প্রশ্ন ছিল— ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান (দ্বাদশ সংশোধন) বিল, ১৯৯১-এ রাষ্ট্রপতির সম্মতি দেয়া উচিত কিনা?’ এ প্রশ্নের মাধ্যমে আসলে দেশে ভবিষ্যতে কোন ধরনের শাসন ব্যবস্থা থাকবে—রাষ্ট্রপতি শাসিত না সংসদীয়—সেই সিদ্ধান্ত জনগণের হাতে তুলে দেয়া হয়। সে সময় দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালায়। শুধু ফ্রিডম পার্টি এর বিরোধিতা করেছিল। এ গণভোট পরিচালনার জন্য প্রণয়ন করা হয় গণভোট আইন, ১৯৯১ এবং গণভোট বিধিমালা, ১৯৯১।
সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘গণভোটে জনগণ যদি প্রস্তাবগুলোর পক্ষে রায় দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুধু আইনপ্রণেতা হিসেবেই নয়, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও কাজ করবেন। গণভোটে পাস হওয়া বিষয়গুলো সংসদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না, এগুলো বাস্তবায়নের বিষয়ে তারা অঙ্গীকারবদ্ধ থাকবেন। এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি নীতিগত অবস্থান স্পষ্ট হয়—সংসদ সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী নয়, বরং সার্বভৌমত্ব জনগণের। তবে বাস্তব প্রশ্ন হচ্ছে সংসদ যদি কোনো কারণে এ অঙ্গীকার বাস্তবায়ন না করে, তাহলে কার্যকর আইনি প্রতিকার কী হবে—এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বাধ্যবাধকতার উল্লেখ নেই। অর্থাৎ বাস্তবায়নের বিষয়টি মূলত রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও গণরায়ের নৈতিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল।’
তবে বদিউল আলম মজুমদারের এ মতামত সমর্থন করেন না অনেক আইনজীবী। তারা নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের ‘গণভোট’ অংশে উল্লেখ করা বিষয়গুলো ও সুপারিশকে যথার্থ মনে করেন। অর্থাৎ আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে গঠিত সংসদের মাধ্যমে গণভোটের বিধানটি পাস করিয়ে নেয়ার প্রয়োজন হবে।
এ প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পুরো বিষয়টা দোদুল্যমান এবং ধোঁয়াশার মধ্যে আছে। কারণ যেহেতু গণভোট অধ্যাদেশটাই সংসদে পাস হবে এবং গণভোট থাকবে কি থাকবে না সেই ভাগ্য নির্ধারণ করার ব্যাপার। যার জন্য এটি নির্বাচিত সংসদের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল।’