Image description

সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে অবস্থানরত ১৭ হাজার ৩৯৪ জন রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি মেশিন রিডেবল পাসপোর্ট দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এ ছাড়া আরও ৫১ হাজার ৬৯৮ জনকে পাসপোর্ট দেয়ার প্রক্রিয়া চলমান আছে। এদের মধ্যে ২০ হাজার ৯৯০ জনের পাসপোর্ট ইতিমধ্যে প্রিন্টে রয়েছে। এখন পর্যন্ত বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হয়েছে আরও ২১ হাজার ৬৪৮ জনের। অন্যদিকে ফি বাকি থাকায় ১৪১ জনের পাসপোর্ট প্রিন্ট প্রক্রিয়া আটকে আছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। সরকারের একটি সূত্র বলছে, মূলত সৌদি সরকারের কূটনৈতিক চাপে আওয়ামী লীগের সময়ই রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

তবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে প্রক্রিয়াটি থমকে যায়। পরে শেখ হাসিনা সরকার পতনের পর সৌদি দূতাবাস ইস্যুটি নিয়ে ফের সক্রিয় হয়। সৌদি সরকারের তরফ থেকে অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর চাপ বাড়াতে থাকে। পরে অনেকটা বাধ্য ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে পাসপোর্ট দেয়ার প্রাথমিক প্রক্রিয়া শুরু করে সরকার। প্রথম দফায় পর্যায়ক্রমে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের ১২ই জানুয়ারি পর্যন্ত ১৮ হাজার রোহিঙ্গার হাতে পাসপোর্ট হ্যান্ডওভার করা হয়। ইতিমধ্যে হ্যান্ডওভার হওয়া পাসপোর্টের সব তথ্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সরবরাহ করেছে সরকার। 

সূত্র বলছে, রোহিঙ্গারা একটি বিশেষ ক্যাটাগরির পাসপোর্ট পেয়েছেন। তবে সেটা কি ধরনের পাসপোর্ট তা ওই সূত্র নিশ্চিত করতে পারেনি। পাসপোর্টের সঙ্গে প্রত্যেকে একটি করে ট্রাভেল ডকুমেন্ট দেয়া হয়। তা দিয়ে সৌদি আরব থেকে তারা অন্য দেশেও ভ্রমণ করতে পারবেন।

এদিকে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেছেন, সৌদি সরকারের অনুরোধে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেয়া হলেও তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে না। উপদেষ্টার এই বক্তব্যে ধোঁয়াশা দেখা দিয়েছে। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, নাগরিকত্ব ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়ার কোনো সুযোগ আছে কিনা? জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম সনদ ছাড়া কোন প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেয়া হলো- এ নিয়ে কৌতূহল রয়েছে। কি ডকুমেন্টের ভিত্তিতে রোহিঙ্গারা পাসপোর্ট পেলো সরকারের তরফ থেকে তাও খোলাসা করা হয়নি। 

এমন অবস্থায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দিলে তাদের বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে নেয়া হবে। বাংলাদেশে স্পেশাল পাসপোর্ট নামে আলাদা কোনো ক্যাটাগরি নেই। আর এটা কোনো ম্যাজিক পাসপোর্ট না, যেটা নাগরিকত্ব ছাড়া পাওয়া যায়। আর জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্ম সনদ ছাড়া কারও বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার ন্যূনতম কোনো সুযোগ নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পাসপোর্ট ও ইমিগ্রেশন নিয়ে কাজ করা একজন বলেন, সরাসরি পাসপোর্ট না দিয়ে রোহিঙ্গাদের ট্রাভেল পারমিট অথবা আইডেন্টিটি সার্টিফিকেট দেয়া যেতো। যেটা কোনো পাসপোর্ট নয়। কিন্তু পাসপোর্টের মতো কাজ করে। এটা শরণার্থীদের দেয়া হয়। এটার মাধ্যমে তাদের সরাসরি নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করা এড়ানো যেতো। অনেক দেশ এটা দিয়ে থাকে। 

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশের পরিচয় ব্যবহার করে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে যান। সেখানে গিয়ে অনেকে পাসপোর্ট ফেলে দিয়ে অনিয়মিত হয়ে যান। কেউ কেউ আবার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আর নতুন পাসপোর্ট সংগ্রহ করতে পারেননি। অনেকে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে হাতে লেখা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে সৌদি আবর যান। পরে বাংলাদেশ থেকে পাওয়া পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হওয়ায় পরও তা আর নবায়ন করতে পারেননি। অবৈধ হয়ে অনেকে সৌদিতে নানা অপরাধে জড়িয়ে পড়েন। অনেকে সৌদি পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। সৌদিতে রোহিঙ্গাদের নিয়মিত অপরাধ বাড়তে থাকায় ক্ষুব্ধ হয় সৌদি সরকার। এতে চাপ বাড়ে বাংলাদেশের ওপর। সৌদি আরব জানায়, রোহিঙ্গাদের দ্রুত সময়ে পাসপোর্ট দেয়া না হলে দেশটিতে বৈধভাবে কর্মরত বাংলাদেশি নাগরিকদেরও ফেরত পাঠানো হবে। এ নিয়ে ঢাকাকে একটি কূটনৈতিক নোট পাঠায় সৌদি সরকার। এরপরই নড়েচড়ে বসে বাংলাদেশ সরকার। সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয় সরকার। এরপর থেকে পাসপোর্ট দেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। চাপের কথা স্বীকার করে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন বলেন, বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে যেসব রোহিঙ্গা সৌদি আরবে গিয়েছিলেন- তাদের পাসপোর্ট নবায়নে চাপ দেয় রিয়াদ। দেশের স্বার্থে ৬৯ হাজার রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশি পাসপোর্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে পাসপোর্ট দেয়া মানেই এই না, যে তারা বাংলাদেশের নাগরিক। 
এ বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক এটিএম আবু আসাদ মানবজমিনকে বলেন, রোহিঙ্গাদের পাসপোর্ট দেয়ার সিদ্ধান্ত নতুন নয়। এটা অনেক আগে থেকেই প্রক্রিয়াধীন ছিল। আর বিষয়টি স্পর্শকাতর, তাই ফোনে এসব বিষয়ে মন্তব্য করা ঠিক নয়।