একটি অগণতান্ত্রিক ও দমনমূলক সরকারের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং তার পর টানা ১৮ মাস দুর্বল শাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অভিজ্ঞতার পর, বাংলাদেশ অবশেষে ১২ই ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। একই দিনে জাতীয় গণভোট দেবেন নাগরিকরা। গণভোটে তারা পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জবাব দেবেন। কেননা এর মধ্যেই নিহিত রয়েছে সংবিধান সংস্কারের চাবিকাঠি, যা তরুণদের আন্দোলনের প্রধান দাবি। চব্বিশের আগস্ট থেকে দেশজুড়ে নানা ‘ফাটলরেখা’ স্পষ্ট হয়েছে, নতুন করে সামনে এসেছে পরিচয়ের প্রশ্ন। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে জাতীয়তাবাদ জোরালোভাবে প্রকাশ পাচ্ছে। আশা করা যায়, বাংলাদেশে বহুল কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে নির্বাচিত সরকার।
আসনে তারা এখনো এগিয়ে। কৌশলগতভাবে, সংখ্যালঘু নির্যাতন নিয়ে বাড়তি উদ্বেগকে কাজে লাগাতে জামায়াত হিন্দু প্রার্থীও দিয়েছে। কিন্তু সংখ্যালঘুরা আদৌ এই আহ্বানে সাড়া দেবে কি না, তা প্রশ্নসাপেক্ষ। বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ রাজনীতিকদের হাতে চাপ ও প্রভাব খাটানোর পথ এখনো খোলা রয়েছে।
গত কয়েক মাস বিএনপি’র জন্যও খুব গৌরবজনক ছিল না। স্থানীয় পর্যায়ে চাঁদাবাজি ও ঘুষের অভিযোগ সময়ে সময়ে সামনে এসেছে। পাশাপাশি, দীর্ঘদিনের ত্যাগী নেতাদের বাদ দিয়ে নতুন মুখদের অগ্রাধিকার দেয়া নিয়ে দলটির ভেতরে অসন্তোষ রয়েছে। বিএনপি’র নির্বাচনী আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা লাগতে পারে। কারণ বহিষ্কৃত বিএনপি প্রার্থীদের একটি বড় অংশ ৭২টি আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন এবং অনেকেই যথেষ্ট শক্ত অবস্থানে আছেন। একাধিক প্রতিবেদনে ইঙ্গিত মিলেছে, বেশ কয়েকটি আসনে বিএনপি ও সাবেক বিএনপি প্রার্থীদের মধ্যে সরাসরি লড়াই হবে। ধারণা করা হচ্ছে, এবার দলীয় প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তিগত প্রার্থীর ওপর ভিত্তি করেই ভোট পড়বে।
যুব ও প্রথমবারের ভোটার মিলিয়ে তারা মোট ভোটারের প্রায় ৩৫ শতাংশ। নতুন প্রজন্ম এবার পুরোপুরি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশি তরুণরা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সক্রিয় হলেও, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের অভিজ্ঞতা এবং জবাবদিহি ও সুশাসনের আকাঙ্ক্ষার প্রেক্ষিতে তাদের ভোটের পছন্দ এখনো অনিশ্চিত। জাতীয় পার্টি বরাবরই সীমিত সংখ্যার মাধ্যমে বিজয়ী জোটকে সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। এবার ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (এনডিএফ) নামে একটি নতুন জোট গঠিত হয়েছে, যেখানে জাতীয় পার্টির দু’টি অংশ রয়েছে। তবে জিএম কাদেরের নেতৃত্বাধীন একটি অংশ এই জোটের বাইরে থাকায় নির্বাচনী অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো কয়েক লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য ডাকযোগে ব্যালট চালু করেছে। এবারে ভোট হবে কাগুজে ব্যালটে, ইভিএমে নয়।
সব মিলিয়ে, এই নির্বাচন কেবল অভ্যন্তরীণভাবে নয়, সামপ্রতিক বছরগুলোতে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও অংশীদারিত্বের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনশীল প্রভাব ফেলবে। ভারতের জন্য বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক পছন্দ বেশ জটিল। শেষবার বিএনপি শাসনের সময় নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়ে যাওয়ার স্মৃতি ভারতের মনে রয়েছে। আর জামায়াতের প্রকাশ্য ভারতবিরোধী অবস্থানও পরিচিত। তবে সামপ্রতিক মাসগুলোতে বহু বাংলাদেশি রাজনীতিক ভারতের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তবু ভারতের নীতিতে অসন্তুষ্ট কিছু শক্তির উপস্থিতি নির্বাচিত সরকারকে কৌশলে সামাল দিতে হবে। আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসন এবং গত ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা মিলিয়ে ভারতবিরোধী মনোভাব বেড়েছে। স্পষ্টতই, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত এই ‘অন্তর্ভুক্তিহীন’ নির্বাচন নিয়ে ভারত সন্তুষ্ট নয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দিল্লিকে খুশি করেনি। গত মাসে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও অবনতি ঘটেছে। যদিও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর খালেদা জিয়ার জানাজায় উপস্থিতি প্রশংসিত হয়। তিনি একমাত্র নেতা ছিলেন যিনি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি। এরপর ক্রিকেট সংক্রান্ত বিতর্ক সম্পর্ককে আরও খারাপ করে। তবে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ- ভারতের আওয়ামী লীগের সাবেক নেতাদের সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়া। এমনকি একটি অনুষ্ঠানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অনলাইনে যুক্ত হন। সময়টি ছিল অত্যন্ত অনভিপ্রেত, যা স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশের একটি বড় অংশকে হতাশ করেছে।
আশা করা যায়, বাংলাদেশের নির্বাচন শেষে দিল্লি ও ঢাকা তাদের সম্পর্ক নতুনভাবে সাজানোর পথ খুঁজে নেবে। নিঃসন্দেহে, ২০২৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন সবার জন্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
(লেখক হরিয়ানার ও.পি. জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির জিন্দাল স্কুল অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক। তার এই লেখাটি অনলাইন ডেকান হেরাল্ড থেকে অনূদিত)