Image description

সোশ্যাল মিডিয়ার জন্ম তখনো হয়নি। মুম্বাইয়ের হিন্দি সিনেমা মুক্তির আগে দর্শক টানতে নায়িকারা পরিকল্পিতভাবে নিজেরাই নিজেদের স্ক্যান্ডাল ছড়াতেন। গণমাধ্যমে সে স্ক্যান্ডাল নিয়ে হইচই পড়ত এবং দর্শকরা হলমুখী হতেন। এখন সোশ্যাল মিডিয়ার যুগ। মুম্বাই নায়িকাদের আর ছবির দর্শক টানতে স্ক্যান্ডাল ছড়াতে হয় না। এখন ডিজিটাল যুগে বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপির কিছু প্রার্থী সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হচ্ছেন। কেউ পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করে ভাইরাল হচ্ছেন; কেউ নারীদের নিয়ে অশ্লীল বক্তব্য দিয়ে ভাইরাল হচ্ছেন। আর তাদের এসব বক্তব্যের নেপথে রয়েছে নির্বাচনের পরিবেশ বিঘিœত করার অপচেষ্টা। অবশ্য সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, নির্বাচন বানচালের যতই চেষ্টা হোক, নির্বাচন যথাসময়ে অনুষ্ঠিত হবে। পলাতক শেখ হাসিনার নির্বাচন বানচালের হুমকিতে যেমন কাজ হবে না, তেমনি পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করেও নির্বাচনের পরিবেশ ঘোলাটে করা যাবে না।

সম্ভবত কয়েক বছর আগে নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছিল হিরো আলম। অখ্যাত এবং লেখাপড়া না জানা ডিশ ব্যবসায়ী হিরো আলম ভাইরাল হওয়ায় সারাদেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পায়। এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন প্রার্থী হিরো আলম এবং মুম্বাই নায়িকাদের মতো কেউ স্ক্যান্ডাল ছড়িয়ে, কেউ বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে মাঠ গরম করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছেন। সংসদ সদস্যের মতো মর্যাদাপূর্ণ পদে নির্বাচন করে হিরো আলম মার্কা পরিচিতি পেতে ভাইরাল হয়ে একদিকে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করছেন; অন্যদিকে নির্বাচনে ‘শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নেই’ এমন ক্ষেত্র তৈরি চেষ্টা করছেন।

দিল্লিতে পলাতক শেখ হাসিনা নির্বাচন বানচালের হুমকি দিচ্ছে। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে দেশের কোনো নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না দাবি করছে। নির্বাচন বানচালের সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মাফিয়াতন্ত্রের নেত্রী শেখ হাসিনা। পাচার করা অর্থ ব্যয়ে বাংলাদেশে বর্তমানে নির্বাচনের পরিবেশ নেইÑ এমন অভিযোগ বিদেশে প্রচার করছে। আবার দেশের ভেতরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা জামায়াত ও এনসিপির কিছু প্রার্থী নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে বিঘিœত করছে। প্রতিপক্ষের পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করে নির্বাচনী পরিবেশে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছে পরিকল্পিতভাবেই। মানুষ যখন ভোট দেয়ার জন্য মুখিয়ে এবং খাদের কিনারে নিপতিত অর্থনীতিকে টেনে তুলতে নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার গঠন অপরিহার্য; তখন পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তোলার পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। জামায়াত ও এনসিপির কয়েকজন প্রার্থী এমন বিকৃত কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছেন তাতে তারা মুম্বাই নায়িকাদের মতো আলোচনায় আসছেন; পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তোলার ক্ষেত্র তৈরি করছেন। বিএনপি নেতারা বলছেন, জামায়াত পরিকল্পিতভাবে নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্র করছে। সাংবাদিক এম এ আজিজ বলেছেন, জামায়াত যে আওয়াজ তুলেছিল তা এখন চুপসে গেছে। দলটি বুঝে গেছে, নির্বাচন হলে পরাজয় নিশ্চিত। আর এনসিপি একটিও আসন পাবে না। শুধু তাই নয়, জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেয়া দলটির নেতা ভোটের পর পালাতে বাধ্য হবেন। সে কারণে হয়তো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হচ্ছে।

গতকালও রাজশাহীর নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান অভিযোগ করে বলেছেন, একটি মহল ভেতরে ভেতরে ষড়যন্ত্র করছে; কীভাবে এ নির্বাচনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা যায়, কীভাবে বাধাগ্রস্ত করা যায়, সে চেষ্টা করছে। দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ১২ তারিখের নির্বাচন যাতে কেউ বানচাল করতে না পারে, সেজন্য সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে, সবাইকে সজাগ থাকতে হবে।

দেশের অতীতের নির্বাচনগুলোর চিত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, নির্বাচন মানেই যেন হানাহানি, মারামারি। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের একে অপরের বিরুদ্ধে বিয়োগকার এবং কর্মী সমর্থকদের মধ্যে সঙ্ঘাত সংঘর্ষ স্বাভাবিক চিত্র। এবার পরিস্থিতি ব্যতিক্রম। নির্বাচনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করছেন শালীনভাবে। দুই দলের সিনিয়র নেতা তথা প্রার্থীরাও নির্বাচনী মাঠে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শব্দ চয়নে সতর্ক। কিন্তু এনসিপি ও জামায়াতের কয়েকজন প্রার্থীর কেউ গায়ে পড়ে ঝগড়া বাঁধানোর চেষ্টা করছে। আবার বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে ভাইরাল হওয়ার চেষ্টা করছে।

প্রতীক বরাদ্দের পর গত ২২ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়। অতীতের নির্বাচনগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এই আট দিনে কয়েক শ’ এলাকায় প্রতিপক্ষে প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ ঘটত। এবার সে দৃশ নেই। নির্বাচন প্রচার-প্রচারণ কিংবা আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, শরীয়তপুর, সিরাজগঞ্জ, শেরপুরসহ অন্তত ১০ জেলায় বিভিন্ন দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। জানা যায়, এসব সঙ্ঘাতের বেশির ভাগই ঘটেছে বিএনপি এবং জামায়াত-এনসিপি জোট সমর্থকদের মধ্যে।

নির্বাচনী প্রচারণায় সঙ্ঘাত-সংঘর্র্ষ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক প্রফেসর আসিফ মোহাম্মদ সাহান বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের কিছু ঘটনা ঘটলেও নির্বাচনের আগে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আক্রমণাত্মক যে সমস্ত প্রচার-প্রচারণ চলছে, সেটি যদি চলতে থাকে এবং ছোটখাটো যে ঘটনাগুলো ঘটছে সেগুলোতে যদি সরকার কোনো ধরনের উদাহরণ সৃষ্টি করতে না পারে, যদি মনে হয়, এ ধরনের ঘটনা ঘটলে আপনি সহজে পার পেয়ে যাবেন, তাহলে পরিস্থিতি সামনের দিকে অনেক বেশি ভয়াবহ হবে।

নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশে অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিতে বরগুনা জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মো. শামীম আহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) মাদকের আড্ডাখানা ও বেশ্যাখানা ছিল বলে মন্তব্য করেন। ২৪ জানুয়ারি বরগুনা-২ আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ডা. সুলতান আহমেদের বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কাকচিড়া ইউনিয়নের কাটাখালী এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি বলেছেন, ‘আমরা দেখছি, ডাকসু নির্বাচনের পর যে ডাকসু মাদকের আড্ডা ছিল, যে ডাকসু বেশ্যাখানা ছিল, সেটি ইসলামী ছাত্রশিবির পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে।’ তার এ বক্তব্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে গেলে মুহূর্তেই প্রতিবাদের ঝড় উঠে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা এ মন্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস গরম করার চেষ্টা করেন।

জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১০ দলীয় জোটের ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী ‘ক্যাচাল নাসির’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ায় তাকে ‘ডার্বি নাসির’ ডিস থেরাপি নাসির হিসেবে ট্রল করা হচ্ছে। জামায়াত সমর্থিত এই প্রার্থীর নির্বাচনী প্রচারণা এবং উঠান বৈঠক করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি। বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে এবং আবোলতাবোল বলে ভাইরাল হয়ে প্রতিপক্ষের প্রার্থী মির্জা আব্বাসকে ঘায়েলের চেষ্টা করছেন। ২৩ জানুয়ারি সন্ধ্যায় রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী রোড সংলগ্ন মৌচাক
এলাকায় গণসংযোগ ও পথসমাবেশে অংশ নেন নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী। এ সময় হঠাৎ পাশের একটি ভবন থেকে তার দিকে লক্ষ করে ডিম ছুড়ে মারা হয়। ডিম নিক্ষেপের পর উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শরীরে পচা ডিম নিয়েই নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে ভাইরাল হয়ে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার চেষ্টা করছেন।

জামায়াতের নারী কর্মীরা ঢাকা-৪ আসনের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণাকালে ঘরে ঘরে গিয়ে ‘দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে বেহেশত পাওয়া যাবে’ সরলমতি নারীদের এমন বোঝানোর প্রতিবাদ করে বিএনপির কয়েকজন নেতা। কিন্তু জামায়াত নেত্রীরা নিজেদের অবস্থানে অটল হলে কাজী মারিয়া ইসলাম বেবি নামের এক কর্মী গণপিটুনির মুখে পড়ে। এ ঘটনাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে হত্যার উদ্দেশে যুবদলের সন্ত্রাসীরা রামদা দিয়ে কুপিয়ে জখম করেছে প্রচারণা চালায়।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মধ্যে সবার আগে প্রার্থী ঘোষণা দিয়েছে জামায়াত। দলটি দীর্ঘ ছয় মাস ধরে নির্বাচনী প্রচারণা এবং গণসংযোগ করছে। তারপরও চলতি মাসের প্রথম দিকে জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের বৈঠকের পর বলা হয়Ñ দেশে সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। দলের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে অভিমত প্রকাশ করা হয়, দেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি।

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের দিকে সারাবিশ্বের দৃষ্টি। ঢাকায় কর্মরত বিদেশি রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরা নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠক করে নির্বাচন নিজেদের পর্যবেক্ষণের কথা জানাচ্ছেন। বিদেশি শক্তিগুলো যখন বাংলাদেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছে; তখন নির্বাচনের পরিবেশ নেইÑ এমন প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

অবশ্য নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে মন্তব্য করে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেছেন, বিগত বছরগুলোর চেয়ে এ বছর এখনো নির্বাচনের পরিবেশ ভালো। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর এখন পর্যন্ত চারজনের প্রাণহানি হয়েছে। এসব ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত হলেও নির্বাচনের পরিবেশ বিগত সরকারের আমলের চেয়ে ভালো। ২০১৪ সালের আগে নির্বাচনে সহিংসতায় ১১৫ জন নিহত হয়েছেন। সেই হিসেবে নির্বাচনী পরিবেশ ভালো। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যথেষ্ট সহিষ্ণুতা রয়েছে।