ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের ২৮, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ নং ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত ঢাকা-১৩ আসনটিতে সাংগঠনিকভাবে মজবুত ভিত্তি রয়েছে বিএনপির। ঐতিহাসিকভাবে ঢাকা-১৩ (তৎকালীন ঢাকা-৯) আসন থেকেই নির্বাচিত হয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। এছাড়াও অঞ্চলটি থেকেই বাংলাদেশ বিএনপির আরেক প্রথিতযশা রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জমির উদ্দিন সরকারও প্রতিনিধিত্ব করেন। দলটির এই দুর্গে প্রার্থীদের অবস্থা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে আরটিএনএন।
আসনটিতে মনোনয়ন বৈধতা পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থী সোহেল রানা, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক, বিএনপি জোট থেকে এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুরাদ হোসেন, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির মো. শাহাবুদ্দিন ও ইনসানিয়াত বিপ্লবের ফাতেমা আক্তার মুনিয়া। তবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন মামুনুল হক ও ববি হাজ্জাজ।
দীর্ঘ জেল-জুলুম ও নির্যাতনে বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের জনপ্রিয় মুখ হয়ে উঠেন মামুনুল হক। তার পিতা আজিজুল হক ছিলেন দেশের প্রখ্যাত ইসলামী পণ্ডিত ও হাদিস বিশারদ। এছাড়াও অঞ্চলটিতে মাদরাসা পরিচালনা করছেন তিনি; এতে জনভিত্তি হয়েছে আরও মজবুত।
অন্যদিকে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে (এনডিএম) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, যিনি কিছুদিন পূর্বে এনডিএম থেকে পদত্যাগ করে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী হয়েছেন। যদিও এই ‘পদত্যাগ’ পর্বটিকে নির্বাচনী কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা; কেননা বর্তমান নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী এক দলের প্রার্থী অন্য কোনো দলের প্রার্থী হতে পারেন না। সব মিলিয়ে অলিখিতভাবেই এনডিএম-এর চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন সাবেক এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ।
ববি হাজ্জাজের জনপ্রিয়তার উৎস মূলত তার পিতা, বাংলাদেশের আলোচিত ধনী ব্যক্তি মুসা বিন শমসের। যিনি ফরিদপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
সব বিষয় নিয়ে আলাপ হয় মোহাম্মদপুর থানার ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের ইলেকট্রনিকস ব্যবসায়ী জয়নাল হোসেনের সাথে। তিনি বলেন, মামুনুল হক এই অঞ্চলের বাসিন্দা, তার মাদরাসা আছে। কিন্তু ববি হাজ্জাজের পূর্ব ঠিকানা ফরিদপুর, ভোটাররা এসব বিবেচনা করবেন। আর মামুনুল হক ববি হাজ্জাজের তুলনায় জনপ্রিয়, নির্বাচনের মাঠেও এগিয়ে।
তবে উল্টো বক্তব্য শোনা যায় বিএনপি সমর্থক মো. রনির কাছে। তিনি বলেন, এই এলাকা বিএনপির ঘাঁটি, এখানে কেন্দ্র থেকে যাকেই দিবে, সে-ই জিতবে। আর ববি হাজ্জাজ ভাই আমাদের সাথে আছেন, আমরাও তাকে পূর্ণ সহযোগিতা করছি।
মামুনুল হকের জনপ্রিয়তা নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে মো. রনি আরও বলেন, মামুনুল হক ব্যক্তি হিসেবে ভালো ও জনপ্রিয়, কিন্তু জামায়াত জোটে গিয়ে তিনি ভুল করেছেন। বিএনপি জোটে আসলে অথবা স্বতন্ত্র নির্বাচন করলে তিনি ভালো লড়াই করতে পারতেন।
আড়ংয়ের মোড়ে বিরিয়ানি বিক্রি করেন মো. আসাদ। নির্বাচন নিয়ে খবর রাখেন সবসময়। তিনি বলেন, বিএনপি ঘাঁটি হলেও ববি হাজ্জাজ সরাসরি বিএনপির কোনো নেতা না হওয়ায় অনেক ভোট হারাবেন। আর মামুনুল হক ইসলামী আলেম এবং মোহাম্মদপুর অঞ্চল বিভিন্ন কারণে ইসলামপন্থীদের পক্ষে ইতিপূর্বে ছিলেন, বর্তমানেও আছেন। এসব বিবেচনা করলে মামুনুল হকেরই মাঠ ভালো।
লালমাটিয়ায় কথা হয় রিকশাচালক মো. তরিকুল ইসলামের সাথে, যিনি ঢাকা-১৩ আসনের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় ২৫ বছর ধরে রিকশা চালাচ্ছেন। তিনি আগে বিএনপিকে ভোট দিলেও এইবার পরিবারসহ সবার ভোট ইসলামপন্থীদের দেবেন বলে জানান। আসনটিতে মামুনুল হক জিততে পারেন বলে মনে করেন তিনি। তবে মামুনুল হকের পূর্বের বেশ কিছু সমালোচনা কাটিয়ে উঠতে হবে বলেও মত দেন।
এ ছাড়া ভিন্ন গল্প শোনা যায় ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার আহমেদ শফিকের কাছে। যিনি একটি কলেজের অধ্যক্ষ এবং উচ্চমধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্ত সমাজে চলাচল করেন। তিনি মনে করেন, এই আসনটি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ আসন। এখানে শিক্ষিত ও এলিটদের বসবাসের হার উল্লেখযোগ্য, আর এই শিক্ষিত ও এলিট সমাজ ববি হাজ্জাজকেই গ্রহণ করছে। ববি হাজ্জাজ উচ্চশিক্ষিত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার যোগাযোগ রয়েছে। অন্যদিকে মামুনুল হক দেশীয় শিক্ষা নিয়েছেন; এলিট সমাজের সাথে খুব একটা সম্পর্ক স্থাপন করতে পারেননি। এসব কারণে বরাবরের মতো এবারও বিএনপিই আসনটিতে জয়ী হবে বলে মনে করেন তিনি।
একই সুরে কথা বলেন আরেকজন, মো. নজরুল ইসলাম, যিনি আসনটির ৩২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা। তিনি বলেন, এই আসনে একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই আসনের জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতা ববি হাজ্জাজ। তিনি এনার্জেটিক, তিনি ইয়াং। তার কার্যক্রম চোখে পড়ার মতো। এই বয়সে তিনি ব্যাপক সামাজিক কার্যক্রম করছেন। আমি তাকেই ভোট দেবো। তবে মামুনুল হক মসজিদে মসজিদে প্রোগ্রামের বাইরে আর কিছুই করতে পারেননি। মসজিদে যায় না এমন ভোটার সংখ্যাও অনেক, তাদের সাথে সংযোগ স্থাপনও জরুরি।
সবকিছু মিলিয়ে আরটিএনএনের পর্যবেক্ষণে পাওয়া গেছে- আসনটিতে শ্রেণিভেদে মানুষের পছন্দ আলাদা। যারা অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল এবং সমাজে ভালো অবস্থানে রয়েছেন, তারা দেশের আলোচিত ব্যবসায়ী মুসা বিন শমসেরের পুত্রকেই বেছে নেবেন। এ ছাড়া নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্তদের পছন্দের শীর্ষে রয়েছেন মামুনুল হক।
এ বিষয়ে মামুনুল হকের সাথে কথা হলে তিনি জানান, আমার যে কোয়ালিফিকেশন, তা অনেকেই জানেন না। কিন্তু উচ্চবিত্তরা বা তুলনামূলকভাবে যারা সমাজে একটু এগিয়ে আছেন, তারা যখন আমার যোগ্যতা সম্পর্কে জানেন, তারা মুগ্ধ হয়ে যান। আমি মাদরাসা বোর্ড থেকে ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে পাস করেছি, অন্যদিকে আমি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইকোনমিকসে অনার্স-মাস্টার্স করেছি।
তিনি বলেন, আমি একদিকে মাদরাসায় বুখারি শরিফ পড়াই, অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকোনমিকসের শিক্ষক। মোহাম্মদপুর আমাদের জন্য উর্বর এলাকা। সব স্তরেই আমার শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকায় খুব সহজেই আমাকে সব শ্রেণির জনগণ গ্রহণ করছেন। আমি ফলাফল নিয়ে আশাবাদী।
তবে সার্বিক অবস্থা নিয়ে এনডিএম-এর সাবেক চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজের বক্তব্য নেওয়া যায়নি।
ইতোমধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করে প্রতীক বরাদ্দ করেছেন। এরপর প্রচারণা শুরু হয় ২২ তারিখ সকাল থেকে। যা ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে। প্রচারণা শেষে বদলে যেতে পারে সমীকরণ।
ধানের শীষ নাকি রিকশা মার্কা? বিএনপির এই ভোটদুর্গ ভেদ করে কি রিকশা আসবে ঐতিহাসিক বিজয় নিয়ে? নাকি জয়ের ধারা বজায় রাখবে বিএনপি। দুদলের দুই প্রধান নেতার এই আসনটিতে লড়াই উপভোগ করার জন্য অপেক্ষায় ভোটারটা। এখন দেখা যাক- কার মুখে ফোটে বিজয়ের হাসি।