Image description

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় জমে উঠেছে প্রচারণা। প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার চালাচ্ছেন। ভোটারদের কাছে  চাইছেন ভোট। প্রচারণা চালাতে গিয়ে কখনো কখনো প্রার্থীরা জড়িয়ে যাচ্ছেন বাগযুদ্ধেও। এ ছাড়া বিচ্ছিন্নভাবে ছোটখাটো সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে গত কয়েকদিনে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের প্রচার শুরু হয় ২২শে জানুয়ারি। সাতদিনে দেশব্যাপী যত অভিযোগ এসেছে তার মধ্যে মোটাদাগে আচরণবিধি ভঙ্গের বিষয়টি সামনে এসেছে। অবশ্য এসব অভিযোগ দ্রুততার সঙ্গে নিষ্পত্তি করার চেষ্টা করছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

ইসি সূত্রে জানা গেছে, গত সাতদিনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে লিখিতভাবে  ৮০টির বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে।  সারা দেশের রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং বিচারকদের নেতৃত্বে গঠিত নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বাস্তবায়ন কমিটিতে জমা হয় এসব অভিযোগ।

নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার জানান, সোমবার পর্যন্ত প্রায় ২০ দিনে আচরণবিধি ভঙ্গের মোট অভিযোগ এসেছে ১৪৪টি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৯৪টি মামলায় ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। সারা দেশের ১২৮টি নির্বাচনী এলাকা থেকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের এসব অভিযোগ এসেছে।  গত সাতদিনে  ২৭ জেলায় অন্তত ৭৩ জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে আছেন বিএনপি’র ৩৫ জন, জামায়াতে ইসলামীর ১৮, এনসিপি’র ৪ ও ইসলামী আন্দোলনের ৩ জন। এ ছাড়া জাতীয় পার্টির ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের দু’জন; গণঅধিকার পরিষদ, খেলাফতে মজলিস, এবি পার্টি ও লেবার পার্টির একজন করে আছেন। আর স্বতন্ত্র প্রার্থী আছেন পাঁচজন। অনেক ক্ষেত্রে অভিযুক্ত প্রার্থীদের সতর্ক করা হয়েছে। কোথাও কোথাও জরিমানা ও মামলা হয়েছে। তবে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে এখন পর্যন্ত কারও কারাদণ্ড হয়নি বলে ইসি ও রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অপরাধভেদে সর্বনিম্ন ৫০০ থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হয়েছে।

আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেন, আমাদের মাঠ পর্যায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি ও বিচারক কমিটি প্রত্যেকটা আসনে রয়েছে। আমাদের জয়েন্ট ডিস্ট্রিক্ট জাজ পর্যায়ের বিচারকরা রয়েছেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো আমলে নিচ্ছেন। তাদের বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মোবাইল কোর্ট প্রতিদিনই তারা পরিচালনা করছেন এবং প্রতিদিনই আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি যে মিনিমাম ৫০-৬০টি কেস রুজু হচ্ছে। কোথাও জরিমানা হচ্ছে, কোথাও সাজা হচ্ছে। মানে কার্যক্রম জোরেশোরে চলছে।

এই নির্বাচন কমিশনার আরও বলেন, প্রতিনিয়তই রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ভাই আমাদের সঙ্গে আসতেছেন। উনাদের পরামর্শ, অবজারভেশন, পর্যবেক্ষণ আমাদেরকে দিচ্ছেন। সে অনুযায়ী আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। এ ছাড়াও আমাদের সাংবাদিক ভাইদের মাধ্যমে আমাদের ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে যেই বিষয়গুলো আসতেছে, তাৎক্ষণিকভাবে আমরা রিটার্নিং অফিসারদের নজরে নিয়ে আসতেছি। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় যারা নিয়োজিত রয়েছেন, তাদেরকে এগুলো নিবারণসহ প্রতিরোধ এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইনের আওতায় আনার জন্য আমরা ত্বরিত ব্যবস্থা নিচ্ছি।

এবার আচরণবিধি প্রতিপালনে ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি’র নাম পরিবর্তন করে ‘নির্বাচনী অনুসন্ধান ও বাস্তবায়ন কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যার নেতৃত্বে আছেন ৩০০ জন বিচারক। তারা আচরণবিধিমালা ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে তিনদিনের মধ্যে ইসিতে প্রতিবেদন জমা দেবেন। তাদের বিচারিক ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে। ফলে আচরণবিধি লঙ্ঘনের জন্য এই কমিটি তাৎক্ষণিক বিচার ও শাস্তি দিতে পারবে। ইসি’র আচরণবিধিমালা অনুযায়ী রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।

যত অভিযোগ: আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর পরদিন শুক্রবার আচরণবিধি ভেঙে ঢাকা-১১ আসনে বিএনপি’র প্রার্থী ড. এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে পোস্টার লাগানোর অভিযোগ উঠেছে। ওই দিন বিকালে রাজধানীর পূর্ব রামপুরার মারকাযুত তাকওয়া বাংলাদেশ মাদ্রাসার সামনে ও আশপাশের বিভিন্ন গলির মধ্যে তার নির্বাচনী পোস্টার সাঁটানো দেখা গেছে। 

এখন পর্যন্ত ঢাকা বিভাগীয় কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তার পক্ষ থেকে তিনজনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। তারা হলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম, মুখ্য সমন্বয়ক ও ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এবং ঝালকাঠি-১ আসনের প্রার্থী ও বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মুস্তাফিজুর রহমান ইরান। নাহিদ ও পাটওয়ারীর বিরুদ্ধে বড় আকারের রঙিন ছবিসহ ‘দেশ সংস্কারের গণভোট, হ্যাঁ-এর পক্ষে থাকুন’ স্লোগানসংবলিত বিলবোর্ড টানানোয় তাদের শোকজ করা হয়। পরে তারা শোকজের জবাব দেন। আর ইরান ইতিমধ্যে তার প্রার্থিতা প্রত্যাহার করেছেন।

ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে সোমবার ঢাকা-৬ আসনের বিএনপি প্রার্থী ইশরাক হোসেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আব্দুল মান্নানের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের তিনটি পৃথক অভিযোগ দায়ের করেছেন। জামায়াতের প্রার্থী এ আসনের বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে জনগণের মধ্যে বিরিয়ানি বিতরণ করে আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন বলে ইশরাকের অভিযোগ। ইসি সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা এবং ঢাকা-১৩ ও ঢাকা-১৫ আসনের রিটার্নিং কমকর্তা ছাড়াও বাকি পাঁচ আসনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অন্তত ৯টি অভিযোগ জমা পড়েছে।