Image description
বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি অধ্যাদেশ

রাজধানী ঢাকাসহ বিভাগীয় শহরে ভবন নির্মাণ, তদারকি ও উন্নয়নের জন্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ রয়েছে। দেশের পৌরসভাগুলোতে রয়েছে পৌর কর্তৃপক্ষ। এরপরও নাগরিকরা তাদের কাছে আশানুরূপ সেবা পাচ্ছেন না। এমন বাস্তবতায় সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বাইরের এলাকায় ভবন সংক্রান্ত কাজ তদারকির জন্য ১৯৯৬ সালে জাতীয় ভবন কোড নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয় কাজ শুরুর ১০ বছর পর অর্থাৎ ২০০৬ সালে।

তবে কোন প্রতিষ্ঠান কোড বাস্তবায়ন করবে সে বিষয়ে গেজেটে কিছু বলা ছিল না। ফলে তা আর কার্যকর হয়নি। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালে সংশোধিত বিল্ডিং কোড গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। সুপারিশ করা হয় স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠনের। তারও আইনি ভিত্তি ছিল না। অবশেষে অন্তর্বর্তী সরকার সেই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করল। দেশের সর্বত্র নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব গ্রিন ভবন নির্মাণ, জনবান্ধব গণপরিসর এবং ঐতিহাসিক ভবন ও স্থাপনা সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষ অধ্যাদেশ, ২০২৬ জারি করেছে সরকার। এ অধ্যাদেশের ক্ষমতাবলে স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠিত হবে। এই কর্তৃপক্ষ জাতীয় ভবন কোড অনুসরণ করে ভবন তৈরি নিশ্চিতে কাজ করবে।

সম্প্রতি প্রকাশিত এ সংক্রান্ত গেজেটে বলা হয়েছে-গঠিত কর্তৃপক্ষের ফোকাস এলাকা থাকবে দেশের উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাইরের এলাকা। তবে জাতীয় ভবন কোড বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষ যে কোনো এলাকায় ভূমিকা রাখতে পারবে। নির্দেশনা দিতে পারবে। এ-সংক্রান্ত কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের সব কার্যক্রম তদারকি করবে এই কর্তৃপক্ষ। জাতীয় ভবন নির্মাণ কোডের বিষয়ে ব্যাখ্যা প্রদান করবে এই কর্তৃপক্ষ। প্রতিষ্ঠানটির সংক্ষিপ্ত নাম হবে-বিবিআরএ বা বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অর্থরিটি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান যুগান্তরকে বলেন, ভবন নির্মাণে অন্য দেশগুলো ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে। বাংলাদেশে এ কাজটি শুরু করতে দেরি হয়ে গেল।

ড. আদিল মুহাম্মদ খান জানান, ২০০৬ সালে বিল্ডিং কোড বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে বিগত দুই দশকে যেভাবে অনিরাপদ, মানহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মিত হয়েছে; সেগুলো তৈরি হওয়ার সুযোগ পেত না। দেরিতে হলেও বর্তমান সরকার বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, এটিকে ইতিবাচক হিসাবে ধরা যেতে পারে। এখানে থেমে না গিয়ে দ্রুততম সময়ে স্বতন্ত্র কর্তৃপক্ষ গঠন করে, দেশব্যাপী কার্যক্রম নিতে হবে।

যেসব কাজ করবে কর্তৃপক্ষ : মানসম্মত ও স্বীকৃত কাঠামোর ভবনের নকশা প্রণয়নের আলোকে ভবনের কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে নিয়ন্ত্রণ কাঠামো তৈরি করবে এই কর্তৃপক্ষ। নির্ধারিত পরিকল্পনায় ভবনের নকশা প্রণয়ন ও নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করতে উপযুক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ধারিত পদ্ধতিতে তালিকাভুক্ত করতে পারবে। শর্ত ভাঙলে তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে। আধুনিক নির্মাণসামগ্রী, নির্মাণ কৌশল, প্রযুক্তি ও গবেষণার আলোকে কর্তৃপক্ষ কোড হালনাগাদ করবে এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিল্ডিং কোডের ব্যাখ্যা দেবে। ভবনের নির্মাণ অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকল্পে প্রযুক্তিভিত্তিক একটি স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির প্রবর্তন করবে। কোড ও নিরাপত্তার বিধি লঙ্ঘনের জন্য নির্মাণকারী বা নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিসি কমিটি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও অন্যান্য সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় সুপারিশ করতে পারবে। এই কর্তৃপক্ষ ভবন নির্মাণবিষয়ক প্রয়োজনীয় নীতিমালা প্রণয়ন করবে এবং সরকারি বিভিন্ন বিধি ও নীতিমালার মধ্যে সমন্বয় সাধন করে নির্মাণ বাস্তবায়নসংক্রান্ত প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দিতে পারবে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিসি কমিটি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও অন্যান্য সংস্থার বিল্ডিং অফিশিয়ালের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অধিক্ষেত্র নির্ধারণ করতে পারবে। এছাড়া এই অধ্যাদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে কর্তৃপক্ষ কর্তৃক যথাযথ বিবেচিত হলে যে কোনো প্রয়োজনীয় কাজ সম্পাদন করা এবং সরকারের অন্য যে কোনো দায়িত্ব ও কার‌্যাবলি সম্পাদনে কাজ করবে।

পরিচালনা বোর্ডে থাকবেন কারা : বিল্ডিং রেগুলেটরি কর্তৃপক্ষের পরিচালনা ও প্রশাসন এর পরিচালনা বোর্ডের ওপর ন্যস্ত থাকবে। কর্তৃপক্ষ যেসব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্য সম্পাদন করবে, পরিচালনা বোর্ডও সেসব ক্ষমতা প্রয়োগ ও কার্য সম্পাদন করবে। ৫ সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত হবে পরিচালনা বোর্ড। এদের মধ্য থেকে একজন হবেন চেয়ারম্যান। বোর্ডের সদস্যরা হবেন স্ব স্ব ক্ষেত্রের ২৫ বছরের অভিজ্ঞ। তাদের মধ্যে থাকবেন-প্রকৌশলী, পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, সাবেক বিচারপতি, আইনজ্ঞ এবং বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের সাবেক কর্মকর্তা।

কর্তৃপক্ষের কার্যক্রম : কর্তৃপক্ষ প্রতিমাসে কমপক্ষে একটি সভার আয়োজন করবে। উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন, পৌরসভার আওতাভুক্ত এলাকার বাইরের ভবনের নকশা অনুমোদন ও নিরাপদ নির্মাণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সরকার, সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে বিল্ডিং কন্সট্রাকশন (বিসি) কমিটি গঠন এবং তার কার্যপরিধি নির্ধারণ করবে। ভবনের নকশা অনুমোদন ও কোডের প্রতিপালনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সব উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিসি কমিটি, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার কার্যক্রমের ওপর কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি সংস্থা হিসাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এই কর্তৃপক্ষ কোনো অর্থবছর শুরু হওয়ার ১২০ দিন আগে অথবা সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য আয়-ব্যয়সহ পরবর্তী অর্থবছরের বার্ষিক বাজেট বিবরণী সরকারের কাছে পেশ করবে।