Image description
সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল

সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩ বাতিল হলেও ওই আইনের ভয় দেখিয়ে ভুক্তভোগী এবং মামলার আসামিদের হয়রানি করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, চূড়ান্তভাবে মামলা থেকে রেহায় পেতে হলে অর্থ খরচ করতে হবে। ঘুসের রেট ২৫ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। না দিলে জামিন বাতিলসহ কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। আর প্রতারণমূলক এসব কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েছেন একশ্রেণির আইনজীবী এবং আদালতসংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মচারী। যুগান্তরের কাছে এরকম একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নজরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, ‘এ ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে আমি অবগত নই। তবে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে যদি কোনো বিচারপ্রার্থীর সঙ্গে আইনজীবীর প্রতারণার সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আদালতসংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল হওয়ার পর এ ধরনের বক্তব্য আইনগতভাবে ভিত্তিহীন এবং ভীতি সৃষ্টি করে প্রতারণা করার শামিল, যা আইনের দৃষ্টিতে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘মামলা ক্লোজ’, ‘চার্জ থেকে মুক্ত’ কিংবা ‘পুলিশি ঝামেলা এড়াতে’ কমপক্ষে ২০-২৫ হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা দাবি করা হচ্ছে। কোনো কোনো আইনজীবী হঠাৎ ফোন করে আসামিকে বলছেন, আজকের মধ্যে দুই লাখ টাকা দিলে মামলা থেকে একেবারে খালাস করে দেওয়া সম্ভব হবে। এরপর টাকা নিয়ে দরকষাকষি হয়। টাকা দিতে দেরি হলে পরের কোর্টে নির্ঘাত জামিন বাতিল করে জেলে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে ভয়ও দেখানো হচ্ছে। অপরদিকে আদালতসংশ্লিষ্ট কিছু অসাধু কর্মচারীও প্রতারণামূলক এই কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছেন। তারা প্রথমে সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে বলে দেনদরবার শুরু করেন। কেউ কেউ টাকা বিকাশে দেওয়ার প্রস্তাব দিচ্ছেন। কেউ আবার বলছেন, বিকাশে নেবেন না, সরাসরি অফিসে এসে দিতে হবে।

সূত্র জানায়, এ ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে গ্রাম থেকে আসা সাধারণ লোকজনকে। অথচ যেসব মামলার কথা বলে এই ভয় দেখানো হচ্ছে, সেগুলোর বড় অংশই আইনের বলে ইতোমধ্যে বাতিল হয়ে গেছে। আর যেগুলো বাকি আছে, সেগুলো ধাপে ধাপে বাতিল হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বা আসামিকে আদালতে উপস্থিত হতে হবে-এমন কোনো আদেশও নেই।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা সাইবার ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ সহকারী জুয়েল মিয়া যুগান্তরকে বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল হওয়ার ফলে ২০২৫ সালের সংশোধনী আইনের ৫০ ও ৬০ ধারা অনুযায়ী ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় দায়ের হওয়া মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। এসব মামলার ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বা আসামিদের আলাদাভাবে কোনো আবেদন করার প্রয়োজন নেই এবং আদালতে হাজির হওয়ার বাধ্যবাধকতাও নেই। আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মামলাগুলো আদালত থেকে খারিজ বা নিষ্পত্তি হিসাবে গণ্য হবে।

জানা যায়, বর্তমানে একটি চক্র এ বিষয়ে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মূল ধারার ওপর নির্ভরশীল ৩৫ ধারার কথা বলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। ডিজিটাল নিরাপত্ত আইন, ২০১৮-এর ৩৫ ধারায় বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেন, তাহলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।’

এ ধারা সম্পর্কে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে যেসব নির্দিষ্ট ধারা বাতিল করেছে, সেসব ধারার অধীনে দায়ের হওয়া মামলাগুলো আইন কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে মামলার আইনগত মৃত্যু হিসাবে গণ্য হবে। যেহেতু মূল ধারাগুলোই বাতিল হয়ে গেছে, সেহেতু সেগুলোর ওপর নির্ভরশীল ৩৫ ধারার প্রয়োগেরও কোনো আইনগত ভিত্তি থাকে না। বিষয়টি এমন-যদি গাছই না থাকে, তাহলে তার পাতা থাকার প্রশ্নও আসে না। ফলে এসব মামলায় ৩৫ ধারা প্রযোজ্য হবে না এবং কোনো ধরনের আইনগত কার্যক্রম চলমান থাকার সুযোগও নেই।

এর আগে ২০২৫ সালের ২১ মে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন বাতিল করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। অধ্যাদেশের সংশোধনীর একটি ধারায় বলা হয়েছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর ২১, ২৪, ২৫, ২৬, ২৭, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারায় এবং এসব ধারায় বর্ণিত অপরাধ সংঘটনে সহায়তার অভিযোগে কোনো আদালত বা ট্রাইব্যুনালে নিষ্পন্নাধীন মামলা কিংবা পুলিশ বা অন্য কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তাধীন সব কার্যক্রম বাতিল বলে গণ্য হবে। একই সঙ্গে এসব ধারার অধীনে প্রদত্ত দণ্ড ও জরিমানাও বাতিল বলে গণ্য হবে এবং এ বিষয়ে আর কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কিছু আইনজীবী ও আদালতসংশ্লিষ্ট কর্মচারী ভুক্তভোগীদের বলেছেন, আইন বাতিল হলেও আদালতে অব্যাহতির আবেদন না করলে মামলার ফাইল সক্রিয় থাকবে এবং গ্রেফতারের ঝুঁকি থাকবে। এই বক্তব্যের ভিত্তিতেই তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দাবি করা হচ্ছে।

এমন একজন ভুক্তভোগী যুগান্তরকে জানান, তাকে বলা হয়েছে দুই লাখ টাকা দিলে মামলা থেকে পুরোপুরি রেহাই পাওয়া যাবে। না হলে পরে জেলে যেতে হতে পারে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশের মামলার আসামি, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং জেলা পর্যায়ের সাধারণ নাগরিকরা এই ভীতি ও প্রতারণার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছেন। আইনের ভাষা ও প্রক্রিয়া না বুঝে অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে ভয়ে অর্থ দিতে বাধ্য হচ্ছেন।

আইনসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাইবার আইন বাতিলের পরও যদি এই ধরনের ‘আইনি ভয় বাণিজ্য’ চলতে থাকে, তাহলে তা শুধু ভুক্তভোগীদের হয়রানিই নয়, বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থার জন্যও হুমকি। এ অবস্থায় বার কাউন্সিল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সক্রিয় নজরদারি প্রয়োজন। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের সরকারি পিপি অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী যুগান্তরকে বলেন, সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে যে সংশোধন এনেছে, তাতে যেসব ধারা বাতিল করা হয়েছে, সেই ধারাগুলোর অধীনে দায়ের করা সব মামলা সংশোধনী নির্ধারিত কার্যকর তারিখ থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। এসব মামলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আসামিদের আদালতে হাজির হওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।

প্রতারণার বিষয়ে ফারুকী বলেন, প্রতারণার কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা অভিযোগ আমার জানা নেই। তবে কেউ যদি আইন সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে বা মামলা নিষ্পত্তির আশ্বাস দিয়ে কোনো আসামিকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, সেটি আইনসিদ্ধ নয়। যদি কোনো আইনজীবী বা ব্যক্তি এ ধরনের আচরণ করে থাকেন, তাহলে ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট আইনজীবী সমিতি এবং বাংলাদেশ বার কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করতে পারেন। তিনি বলেন, আইন অনুযায়ী যেসব মামলা সংশোধিত আইনের আওতায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্পত্তিযোগ্য; সেগুলো নিয়ে কোনো প্রকার আর্থিক লেনদেন বা প্রলোভন দেখানোর সুযোগ নেই।